আমার ছেলের ‘কুশিক্ষার’ দায় কার?

ফজলে এলাহী আরিফ
 | প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৮, ১০:৩৭

‘আমার জীবনটা রীতিমত অস্বস্তিতে ভরে গেছে’- গতরাতে এই কথা বলতে বলতে আমার ছেলে আমাদের চারপাশে ঘুরাফেরা করছে। ছোট মুখে এত বড় কথা শুনে আমি যেন কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে গেলাম। কিন্তু পরক্ষণেই স্তম্ভিত ফিরে পেয়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাবা, তোমার কি হয়েছে? এই কথা বলছ কেন?’

সে বলল, ‘এত পড়ার চাপ আমার ভাল লাগে না। এত পড়ে কী হবে?’

খানিক পরে সে আবার বিড়বিড় করে বলছে, ‘আমি একজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলব। আমি ব্যবসা করব। আর এত কষ্ট করে পড়াশুনা করব না।’

আমি তাকে বললাম, ‘তুমি তো পঞ্চম শ্রেণির পড়াশুনা দিয়ে বড়জোর সবজির ব্যবসা বা ছোটখাট মনোহারির ব্যবসা করতে পারবে। তারচেয়ে উত্তম অন্য কোন ব্যবসা করতে পারবে না।’

ছেলেটি বলল, ‘এখন ছোট ব্যবসা করব। তারপর আস্তে আস্তে ব্যবসা বড় করব। তারপর আমি তোমাদেরকে বেশি বেশি টাকা দিতে পারব।’

বললাম, ‘তারপর?’

সে যা বলল তা শুনে আমার জ্ঞান হারাবার অবস্থা। বলল, ‘তারপর ব্যাংক থেকে অনেক টাকা নিয়ে আর ফেরত দেব না।’

আমি একজন কর্মজীবী পিতা। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে অফিসে যাই; আবার সূর্যাস্তের আগে আগে বাসায় ফিরে আসি। এই সময়ের মধ্যে কখনোই সূর্য দেখার জন্য আকাশের দিকে তাকানো হয় না। মাসের নির্ধারিত বাধ্যতামূলক খরচগুলো মিটিয়ে বহু কষ্টে একটু একটু সঞ্চয় করে নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।

অফিস ছুটি থাকলেই এখানে সেখানে এলোমেলো ঘুরে বেড়াই, আড্ডা দেই। এই তো আমার জীবন। কিন্তু আমার প্রায় এগারো বছরের ছেলে টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেটের বদৌলতে অনেক হালনাগাদ আছে। আমার ছেলে শেয়ার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি, ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি সম্পর্কে শুনেছে। এগুলো তো নতুন কিছু নয়।

অকালে খেয়েছি কচু, মনে রেখেছি কিছু কিছু! এরশাদ সরকারের আমল থেকে শুরু করে খালেদা জিয়ার সরকারের আমল হয়ে বর্তমানেও চলছে নানাভাবে অর্থ ও ঋণ কেলেঙ্কারি। আমার ছেলে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের কথা জানতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কোটার কথা জানতে চায়; সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটার কথা জানতে চায়।

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আমাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। আমার ছেলে বা তার সমসাময়িক ছেলেরাও নিশ্চয়ই আরো নতুন নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু তারা কি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা মেরে দিয়ে নতুন নতুন স্যাটেলাইটের স্বপ্ন দেখতে চাইবে?

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে বর্তমান সরকারের অনেক গৌরবময় অর্জন আছে। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ, নারী নির্যাতন ও গণহত্যার বিচার হয়েছে; অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; অনেক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে; অনেক ফ্লাইওভার ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক প্রশস্তকরণসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে।

ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ পদ্মাসেতুর কাজ এগিয়ে চলছে; রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে দেশের প্রথম মেট্রো রেল নির্মাণ প্রকল্প ও প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এর কর্মোৎসব চলছে; জঙ্গিবাদ দমন করেছে; উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এসেছে; সর্বশেষ দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সাফল্যজনকভাবে উৎক্ষেপণ করেছে।

এতসব উন্নয়নের পেছনে মাঝে মাঝেই রডের বদলে বাঁশের ব্যবহার ও লুটপাট যেমন হচ্ছে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব তেমন থাকছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগসাজশের মাধ্যমে লাগামহীন জালিয়াতি, দুর্নীতি ও ঋণ খেলাপির দৌরাত্ম্যে ব্যাংকিং খাত অস্থির হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সুশাসনের অভাব রয়েছে। নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য্ আইনের শাসন ও সুশাসন অপরিহার্য। আর গণতন্ত্রের বিকল্প কখনোই উন্নয়ন হতে পারে না।

গণতন্ত্রই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে, উন্নয়নের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রকে জালিয়াতির শিকারে পরিণত করা কখনোই দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারও গণতন্ত্রকে জালিয়াতের শিকারে পরিণত করেছিল, যার বিভীষিকাময় পরিণতি জাতি প্রায় দুই বছরব্যাপী দেখেছে।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর হয়ে গেছে; ইতোমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে এসেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় এখন এক হাজার ৭৫২ ডলার। কিন্তু এরশাদের পতনের সাড়ে ২৭ বছরেও কেন সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি? কেন সকল দল ও মতের ভিত্তিতে একটি আদর্শ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না?

সাড়ে ২৭ বছরে একটি আদর্শ ও স্থায়ী গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ না করতে পারার দায় কি সকল রাজনৈতিক দলের নয়? নির্বাচন এলেই জাতি দেখতে পারে ‘চোরের সাক্ষী গাঁট কাটা, শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল’।

আমার ছেলের বয়স ১০ বছর ৯ মাস ১৫ দিন! দেখতে বেশ বড়সর হয়েছে। চিন্তা-চেতনায় বেশ পরিপক্ক বটে! আজ সকালে গোসল শেষে খালি গায়ে আমাদের সামনে ঘুরাফেরা করছে। আমি তাকে মৃদু ধমকের স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার কি একটুও লজ্জা শরম নাই?’ সে আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত সাবলীলভাবে বলল- ‘বাবা, তোমরা গায়ের দিকে তাকিয়ে আছো কেন?’

আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে- আমার ছেলে শৈশব থেকেই কুশিক্ষা নিয়ে বড় হচ্ছে। অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের শিশু সন্তানেরা কুশিক্ষার পথ বেছে নিতে চাইবে। কিন্তু আমার ছেলের মত লাখো ছেলের কুশিক্ষার দায় কার? আমার ছেলে তার খালি গা না দেখার জন্য প্রকারান্তরে আমাকে ‘অন্ধ’ হতে বলল। সাড়ে ২৭ বছর যাবত দেখছি- জাতির অধিকাংশ ও জাতির বিবেক বুদ্ধিজীবীরা অন্ধ হয়ে গেছে। সবাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যার যার পক্ষে সবাই অকাট্য যুক্তি দেখায়। বুদ্ধিজীবীরা যখন অন্ধ হয়, বিবেক তখন পথরুদ্ধ হয়। একজন নাগরিক হিসেবে রক্ত দিয়ে কেনা দেশের জন্য আমি কখনোই কড়ি দিয়ে কানা গরু কিনতে চাই না।

লেখক: আয়কর উপদেষ্টা

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত