গাইবান্ধায় গ্রাম পুলিশদের মানবেতর জীবন

জাভেদ হোসেন, গাইবান্ধা
 | প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৮, ১৯:৫৮

বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ একটি অবহেলিত সংস্থার নাম। যাদের কার্যক্রম শুধু ইউনিয়নভিত্তিক হয়ে থাকে। ইউনিয়নের যখন যেখানে যে কোন সমস্যায় ছুটে যেতে হয় তাদের। গ্রামের এই খাটি মাটির মানুষরা এ পেশার জড়িয়ে আছেন বহুদিন ধরে।

গ্রাম পুলিশ ২৪ ঘণ্টা গ্রামের জনপদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা ও সরকারের উন্নয়নে অবদান রাখলেও ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি তাদের। কেননা কাজ হিসেবে পর্যাপ্ত বেতন ভাতাদিসহ অন্যান্য কোন সুযোগ-সুবিধা এখন পর্যন্ত পাচ্ছেন না তারা। ফলে স্বল্প বেতনে গ্রামের এই বাহিনীটি পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন আছে, কিন্তু টাকার অভাবে নেই সেখানেও কোন কার্যক্রম।

গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, ঈদ ও পূজায় বোনাস ছাড়া চাকরিকালে এর বাইরে আর কোন অর্থ বা কোন সহযোগিতাই পায় না গ্রাম পুলিশরা। ফলে এই সামান্য বেতনে কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে জেলার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশকে।

সূত্রটি আরও জানা যায়, গত বছরের শেষের দিক থেকে অবসরপ্রাপ্ত দফাদাররা এককালীন ৬০ হাজার টাকা ও মহল্লাদাররা ৫০ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ তসলিম উদ্দিন বলেন, আমার তিন ছেলে, এক মেয়ে। সম্প্রতি মেয়ের বিয়ে দিয়েছি অতি কষ্টে। বর্তমানে আমার তিন ছেলের পড়ালেখার খরচ যোগাতে গিয়ে আমাদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। শুধু ঈদ ও পূজা ছাড়া আমাদের আর কোন বোনাস দেয় না সরকার। ফলে স্ত্রী-সন্তানদের অনেক আশাই অপূর্ণ থেকে যায় আমাদের।

সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ রফিকুল ইসলাম রবি বলেন, আমরা যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে আমাদের সংসারই চলে না। কিন্তু সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের আমরা অংশীদার। তথাপি এই গ্রাম পুলিশ নিয়ে সরকারের কোন পরিকল্পনা আমরা লক্ষ্য করি না।

বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমাদের গ্রাম পুলিশ কর্মচারি ইউনিয়ন থাকলেও কোন অফিস নেই এ জেলায়। ফলে কেন্দ্র থেকে কোন কর্মসূচি ঘোষণা দিলে আমাদের পাবলিক লাইব্রেরি বা অন্য কোন সংস্থার হলরুম ভাড়া নিয়ে তা পালন করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম পুলিশ থাকেন ১০ জন করে। এদের মধ্যে দফাদার পদে থাকেন একজন ও নয়জন থাকেন মহল্লাদার। বর্তমানে দফাদাররা মাসিক তিন হাজার ৪০০  টাকা ও মহল্লাদাররা তিন হাজার টাকা করে বেতন পাচ্ছেন। এই বেতনের অর্ধেক দিচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ ও অর্ধেক দিচ্ছে সরকার।

তিনি বলেন, তথ্য সংগ্রহ করে প্রদান করাসহ গ্রামে গ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অবদান রাখলেও আমাদের দিকে দেখার কেউ নেই। আজকের দিনে এই তিন হাজার টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। কোথায় কখন কি ঘটে এটা ভেবে আমরা বাড়ি ফিরেও শান্তিতে ঘুমাতে পারি না। কোথাও কোন সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গেই ছুটতে হয়। বলা চলে ২৪ ঘণ্টাই আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতো সেবা দেয়ার পরও আমাদের বেতন অতি সামান্য। তাই আমাদের পরিবার-পরিজনের কথা চিন্তা করে সরকারি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সমস্কেল প্রদান, রেশন ব্যবস্থা চালু ও চাকরিকালে কেউ মারা গেলে তার পরিবারকেও একাকালীন টাকা দেয়ার দাবি জানান এই গ্রাম পুলিশ নেতা।

বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন গাইবান্ধা জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল সাত্তার সরকার ঢাকাটাইমসকে জানান, ইউপি সচিবকে জন্ম-মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে প্রদান করা, ইউপি ভবন ও বিভিন্ন সড়কে রাত্রিকালীন ডিউটি, গ্রাম আদালত, গ্রামে কোন সংস্থার কর্মসূচি চলাকালীন ও সড়ক দুর্ঘটনার স্থানে তাৎক্ষণিক দায়িত্ব পালন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বাল্যবিয়ে আয়োজনের তথ্য প্রদান, কোন অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর সংবাদ থানায় জানানো, মাদকদ্রব্য ও জুয়া প্রতিরোধে অভিযান চালনা, ট্রেন ও যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন সময়ে রেললাইন ও সড়ক পাহারা দেয়া, নির্বাচনকালীন, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও  ছিনতাইপ্রবন এলাকায় দায়িত্ব পালন এবং মানুষদের মধ্যে সংঘর্ষ রোধে ভূমিকা রাখাসহ আরও অনেক কাজে আমরা গ্রাম পুলিশরা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকি। কিন্তু আমাদের পরিবারের দায়িত্ব আজও কেউ নিল না। 

তিনি অভিযোগ করেন, দুঃখজনক বিষয় আমরা প্রতি মাসে যে বেতন পেয়ে থাকি তাও নিয়মিত পাই না। কোন মাসে ২০ বা ২৫ তারিখ, আবার কোন কোন মাসের বেতন তো এক বা দুই মাসেও মেলে না। অন্তত প্রতি মাসে ৫-৬ তারিখের মধ্যে আমাদের বেতন যেন পরিশোধ করা হয়, এমন দাবি তুলে ধরেন গ্রাম পুলিশের এই নেতা।

(ঢাকাটাইমস/১৬মে/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত