রোজা: তাৎপর্য ও বিধান

মাওলানা ইউসুফ নূর
| আপডেট : ১৬ মে ২০১৮, ২২:৩৪ | প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৮, ২১:২৭

করুণাময় আল্লাহ্’র এক বিশেষ উপহার মাহে রমজান। পবিত্র রমজান অত্যন্ত মহিমান্বিত, কল্যাণময়, বরকতপূর্ণ ও ঘটনাবহুল মাস। রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম রোকন বা মৌলস্তম্ভ। রোজা ও রমজানের ফাজায়েল-মাসায়েল এবং তাৎপর্য বিষয়ক জ্ঞানার্জন করা সব মুসলিম নর-নারীর কর্তব্য।

সুবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলে। তবে রোজার বিভিন্ন দাবি আছে, সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে।

রোজার ফজিলত

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত- রাসুল সা. বলেন, আল্লাহ বলেছেন- রোজা ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য; কিন্তু রোজা আমার জন্য। তাই আমিই এর প্রতিদান দেব। রোজা ঢালস্বরূপ। রোজা রাখার দিন তোমাদের কেউ যেন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয়। এবং যাতে ঝগড়া বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করে তাহলে সে যেন বলে আমি রোজাদার। যাঁর হাতে মুহাম্মদের জীবন তার শপথ! অবশ্যই (অনাহারের দরুণ সৃষ্ট) রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ্’র নিকট মিশকের চাইতেও সুগন্ধিময়। রোজাদারের জন্য রয়েছে দু’টি আনন্দের সময়: একটি হলো ইফতারের সময় আর অপরটি (কেয়ামতের দিন) তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারি, মুসলিম)

সাহল বিন সা’দ রা. থেকে বর্ণিত- রাসুল সা. বলেনঃ জান্নাতে রাইয়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কেয়ামতের দিন শুধুমাত্র রোজাদাররা প্রবেশ করবেন। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিযে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত- নবী করিম সা. বলেন, রোজা ও কুরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। (আহমাদ)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত- রাসুল সা. বলেন, রমজানের আগমনে জান্নাতের  দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়। (বুখারি)

 আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত- রাসূল (স.) বলেন,  এ মাসে এক আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, কল্যাণ অন্বেষণকারী, এগিয়ে এসো, হে অনিষ্টান্বেষী বিরত হও। আল্লাহ এ মাসে বহু লোককে জাহান্নাম থেকে নাজাত দেন। আর তা প্রত্যেক রজনীতেই হয়ে থাকে। (তিরমিজি)

রোজার উদ্দেশ্য
পানাহার ও যৌনাচার হতে বিরত থেকে প্রবৃত্তি দমন ও সংযম সাধনার মাধ্যমে তাকওয়াভিত্তিক জীবন গঠনই রোজার উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হল যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। ( আল বাকারা: ১৮৩)

মনীষী আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়ুম রহ. বলেন, সিয়ামের উদ্দেশ্য হলো, পাশবিক ই্চ্ছা ও জৈবিক চাহিদাসমূহের মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। চিরন্তন জীবনের অনন্ত সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করে। ক্ষুধা ও পিপাসার কারণে জৈবিক ও পাশবিক ইচ্ছায় ভাটা পড়ে। পশুত্ব নিস্তেজ হয়ে যায়। মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয় এবং দারিদ্র্য পীড়িত অগণিত আদম সন্তানের অনাহারক্লিষ্ট মুখ তখন তার অন্তরে সহানুভূতির উদ্রেক করে। ক্ষান্ত ও বিগলিত হয় মহান আল্লাহ্’র কৃতজ্ঞতায়। (যাদুল মা’আদ)

দার্শনিক ইমাম গাজালি রহ. এর ভাষায়: আখলাকে ইলাহি তথা ঐশ্বরিক গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই হলো রোজার উদ্দেশ্য। (ইহ্য়াউল ‘উলুম)

রোজার উপকারিতা
রোজার দ্বারা একদিকে মানুষের আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও চিন্তার প্রখরতা বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও রোজার উপকারিতা স্বীকৃত। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে অতি ভোজন রোগের মূল আর রোজা এর অনন্য প্রতিষেধক। রোজা পালনের ফলে দেহে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের ক্ষমতা ফিরে আসে, তাতে লিভার সুস্থ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পাকস্থলি অধিক চাপ থেকে রক্ষা পাওয়ায় পেটের পীড়ার উপশম হয়। গ্যাস্ট্রিক আলসারের ক্ষত শুষ্করূপ পরিগ্রহ করে। দেহে নতুন শক্তি ফিরে আসে। এমনকি ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে এক বিশেষ সমতা সৃষ্টি করে। নেশার মোহ কেটে যায়। 

ডাক্তার সলোমন তাঁর ‘গার্হস্থ্য স্বাস্থ্যবিধি’ গ্রন্থে মানব দেহকে ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করে বলেন, ইঞ্জিন রক্ষাকল্পে মাঝে মধ্যে ডকে নিয়ে চুল্লি হতে ছাই ও অঙ্গার সম্পূর্ণরূপে নিষ্কাষিত করা। যেমনটা আবশ্যক- উপবাস দ্বারা মাঝে মাঝে পাকস্থলি হতে অজীর্ণ খাদ্যটি নিষ্কাষিত করাও তেমনটা দরকার। (মিশকাত শরিফ বঙ্গানুবাদ)। এক কথায় রোজার আধ্যাত্মিক ও শারীরিক উপকারিতা অপরিসীম।

রোজার বিধান
রমজানের রোজা ফরজ। আল্লাহ ইরশাদ করেন: তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান পাবে সে অবশ্যই এ মাসের রোজা রাখবে। (আল বাকারা ১৮৫)
এ রোজা ইসলামের বড় এক রুকন তথা মৌলস্তম্ভ। রাসুল সা. বলেছেন- ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত- ১. এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহ্’র বান্দা ও রাসুল ২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা ৩. জাকাত আদায় করা ৪. রমজানের রোজা রাখা ৫. হজ করা। (বুখারি, মুসলিম)

কুরআন সুন্নাহ্ ও ইজমা’য়ে উম্মত দ্বারা এ রোজা ফরজ প্রমাণিত হওয়ায় এর অস্বীকারকারী  কাফের। আর যে রোজা ফরজ হওয়া বিশ্বাস করে কিন্তু তা পালন করে না। তবে সে কবিরা গুনাহগার; বে-ঈমান নয়।

উল্লেখ্য, পাগল ও নাবালক ছাড়া সকল মুসলিম নর-নারীরর ওপর রমজানের রোজা ফরজ। দশ বছরের নাবালক ছেলেমেয়েদেরকে রোজার অভ্যাস করানো উচিত।

রমজানের চাঁদ
রমজান মাসের চাঁদ দেখা মাত্রই রোজা রাখা ফরজ। রাসুল সা. বলেন, তোমরা রমজানের চাঁদ দেখে রোজা রাখবে এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখে রোজা ছাড়বে। (বুখারি, মুসলিম)

রোজার নিয়ত
নিয়ত অর্থ অন্তরের সংকল্প; মুখে তা উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। রোজার নিয়ত শর্ত। নিয়ত ছাড়া সারাদিন উপবাস থাকলেও রোজা আদায় হবে না। রমজানের রোজার নিয়ত রাতেই করে নেয়া উত্তম। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী দুপুরের পূর্ব পর্যন্তও করা যায়। তবে ক্বাযা রোজার নিয়ত রাতেই করতে হবে। রাতে রোজার নিয়ত করার পরও সুবহে সাদেক পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি হালাল। এসব কারণে রোজার নিয়ত ভঙ্গ হয় না।

রোজা ভঙ্গ হওয়ার কারণসমূহ
#    কানে বা নাকে ঔষধ দেওয়া।
#   ইচ্ছা করে মুখ ভরে বমি করা।
#   কুলি করার সময় অসতর্কতা বশতঃ গলায় পানি চলে যাওয়া।
#    এমন কিছু গিলে ফেলা যা মানুষ খায় না বা ঔষধ হিসাবেও সেবন করে না। যেমন- কঙ্কর, পয়সা ও কাঠ ইত্যাদি।
#    ডবড়ি সিগারেট বা হক্কার ধোঁয়া সেবন করা।
#  লোবান ও আগরবাতি জ্বালিয়ে তার ধোঁয়া গ্রহণ করা যাবে না।
# নাকে নস্য টানা, কানে তেল ঢালা ও পায়খানার জন্য ঢুস নেওয়া।
# ভুলে পানাহার অথবা স্ত্রী সহবাস করার পর রোজা ভঙ্গ হয়েছে মনে করে আবার এসব করা।
#   রাত বাকি আছে ভেবে ফজরের পর পানাহার করা কিংবা ইফতারের সময় হয়েছে মনে করে সূর্যাস্তের পূর্বে ইফতার করা।
#    দাঁত থেকে নির্গত রক্ত গিলে ফেলা ( যদি তা থুথুর বেশি হয়)। 
#   হস্তমৈথুনে বীর্যপাত হওয়া।
#    প্রশ্রাবের রাস্তায় ঔষধ প্রবেশ করানো।
#  মুখে পান ইত্যাদি রেখে ফজরের পর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা প্রভৃতি।
এসর কারণে রোজা ভঙ্গ হয় এবং পরে শুধু কাজা করতে হয়; কাফফারা দিতে হয় না। মনে রাখা উচিত, ভুল করে  পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোজা ভঙ্গের অন্যান্য কারণ পাওয়া গেলেও রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই বিরত হতে হবে।

রোজার কাফফারা
ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ও যৌন সঙ্গমের ফলে রোজা ভঙ্গ হয় এবং ক্বাযা ও কাফফারা উভয়টি দিতে হয়। কাফফারা আদায়ের জন্য দু’মাস একাধারে রোজা রাখতে হবে। মাঝে কোনো কারণবশত বাদ পড়ে গেলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। তবে মাঝখানে হয়েজ হলে তা ধর্তব্য। কিন্তু পবিত্র হবার পরদিন থেকেই বাকিগুলো রেখে পূরণ করতে হবে।  নেফাস, রোগ কিংবা রমজানের কারণে মাঝখানে রোজা রাখতে না পারলে তা মাফ হবে না।  আবার নতুন করে দুই মাস রোজা রাখা ওয়াজিব। যদি কাফ্ফারা রোজা রাখার শক্তি না থাকে তাহলে ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মিসকিনকে দু’বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে। মনে রাখা দরকার, এক রমজানে একাধিক রোজা ভেঙে থাকলে একটি মাত্র কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে। তবে যে কয়টি ভেঙেছে তার পুরো কাজা করতে হবে।

জরুরি মাসআলা
এক দেশে রোজা শুরু করার পর অন্য দেশে চলে গেলে সেখানে আগে ঈদ হয়ে গেলে প্রথম দেশের হিসেবে যে কয়টি রোজা বাদ পড়েছে তার ক্বাযা করতে হবে। আর দ্বিতীয় দেশে গিয়ে রোজা দু’একটা বেড়ে গেলে তা রাখতে হবে।

রোজাদারের জন্য মাকরূহ
#  দরকার ছাড়া কোনো খাদ্য-দ্রব্য চিবানো বা তার স্বাদ গ্রহণ করা।
#  রক্ত দান করা বা সিঙ্গা দ্বারা রক্ত বের করা।
# বেশি পরিমাণে নাকে পানি দেয়া বা কুলি করা।
#  ফরজ গোসল ইচ্ছা করে সুবহে সাদিকের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা।
# গীবত করা, মিথ্যা বলা, বাদানুবাদ করা বা গালি দেয়া ইত্যাদি।
এসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না; তবে মাকরূহ হয়। রোজার সুফল লাভ করার জন্য এসব কু-অভ্যাস বর্জন করা জরুরি। রাসুল সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি রোজা রেখেও মিথ্যা বলা ও খারাপ কাজ ছাড়ে না তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহ্’র কোনো প্রয়োজন নেই।

যা মাকরূহ নয়
#    মিসওয়াক করা
# দাড়ি-গোঁফ, মাথা ও শরীরে তেল মালিশ করা।
# চোখে ঔষধ বা সুরমা ব্যবহার করা।
#  গরম বা পিপাসার তীব্রতা কমানোর জন্য গোসল করা।
# যেকেো প্রকারের ইনজেকশন বা টিকা নেয়া।
# অনিচ্ছাকৃতভাবে মশা মাছি বা ধোঁয়া গলার ভিতরে প্রবেশ করা।
# নিজের থুথু জমা না করে গিলে ফেলা।
# স্বপ্নদোষ হওয়া।
# দাঁতের রক্ত পড়া (যদি গলার ভিতরে না যায়)।
যেসব কারণে রোজা না রাখার বা ভেঙে ফেলার অবকাশ আছে
#    অভিজ্ঞ ধর্মপ্রাণ ডাক্তারের মতে রোজার কারণে রোগ বেড়ে যাওয়ার কিংবা নতুন রোগ দেখা দেয়ার অথবা রোগমুক্তি বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকা।
# শরিয়তসম্মত সফরে থাকা।
#    গর্ভবতী বা দুগ্ধদায়িনী মহিলার রোজার কারণে নিজের বা সন্তানের জীবনের আশঙ্কা বোধ করা।
#  হায়েজ নেফাস শুরু হওয়া।
#  অত্যাধিক ক্ষুধা বা পিপাসায় প্রাণের আশঙ্কা দেখা দেয়া।
#  অজ্ঞান কিংবা উন্মাদ হয়ে যাওয়া।
এসব অবস্থায় ছেড়ে দেয়া রোজাগুলো পরে কাজা করতে হবে।

রোজার ফিদয়াহ্ বা ক্ষতিপূরণ
অতি বৃদ্ধ হওয়ার কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগ হলে এবং সুস্থ হওয়ার কোনো আশা না থাকলে এমন ব্যক্তির জন্য প্রত্যেক রোজার পরিবর্তে ফিদয়াহ্ আদায় করা জায়েজ আছে। প্রত্যেকটি রোজার পরিবর্তে ফিতরা পরিমাণ পণ্য বা তার মূল্য দান করাই হল এক রোজার ফিদয়াহ্। কোনো ব্যক্তি রোজার ক্বাযা আদায় না  করে মৃত্যুবরণ করলে ওয়ারিশগণ তার রোজার ফিদয়াহ্ আদায় করবে। মৃতব্যক্তির ওয়ারিশত থাকলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে এই ফিদ্য়াহ্ আদায় করা হবে। আর ওয়ারিশত না করে থাকলেও তার ওয়ারিশগণ স্বেচ্ছায় আদায় করলে  তা কবুল হওয়ার আশা করা যায়।

সেহেরি
সেহেরি খাওয়া সুন্নাত। রাসুল সা. বলেছেন, তোমরা সেহেরি খাও। কেননা সেহেরির মধ্যে রয়েছে বরকত। (বুখারি, মুসলিম)
সুবহে সাদিক উদয়ের আশঙ্কা না হওয়া পর্যন্ত দেরি করে সেহেরি খাওয়া মুস্তাহাব। দুঃখের বিষয়, অনেকে বর্তমানে মধ্যরাতে সেহেরি খেয়ে শুয়ে পড়ে এবং ফজরের নামাজ  না পড়ে সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে । এটা কবিরা গুনাহ। ফরজ নামাজ সময়মমত আদায় না করে রোজা ও সেহেরির বরকত তালাশ করা বোকামি মাত্র।

ইফতার
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মুস্তাহাব। রাসুল সা. বলেছেন, মানুষ যতদিন অবিলম্বে ইফতার করবে ততদিন তারা কল্যাণে থাকবে। (বুখারি, মুসলিম)
ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। রাসুল সা. বলেছেন, রোজাদারদের ইফতারের সময়ে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না। (ইবনু মাজাহ্)

রমজানের কতিপয় আমল
রমজান আমলের মাস। নেক আমলের মাধ্যমে এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করা উচিত। রমজানে কতিপয় আমলের সবিশেষ গুরুত্ব, মর্যাদা ও অশেষ সওয়াব রয়েছে। সেগুলো হলো:
#  তারাবীহ্ ও তাহাজ্জুতের নামাজ: রাসূল (স.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় নফল নামাজ আদায় করবে তার পূর্বেকার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারি, মুসলিম)

#  কুরআন তেলাওয়াত: আল্লাহ ইরশাদ করেন, রমজান সে মাস, যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (আল বাক্বারা, ১৮৫)। হাদিস শরিফে আছে, রমজান মাসে জিবরাঈল আ. রাসুলে পাক সা. এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং পরস্পর কুরআন শোনাতেন। সাহাবা ও বুযুর্গানে দ্বীন এ মাসে কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। হযরত উসমান রা. রমজানে প্রত্যেক দিন কুরআন খতম দিতেন। ইমাম শাফেয়ি রহ.  রমজানে ৬০ বার কুরআন খতম করতেন। ক্বাতাদাহ রা. প্রত্যেক সপ্তাহে এক খতম করতেন। অতএব, পবিত্র রমজানে কুরআনের তেলাওয়াত ও অধ্যায়নে মনোনিবেশ করতে হবে। আর যারা সহিহ্ভাবে কুরআন পড়তে জানে না এ মাসে কুরআন শেখার ব্যাপারে তাদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। কুরআন নাজিলের মাসে কুরআনের নিবিড় সান্নিধ্যে আসার ব্যাকুলতা সকলের মাঝে সৃষ্টি হওয়া দরকার।

# উমরাহ: রাসুল সা. বলেছেন, রমজানে উমরাহ করা হজের সমতুল্য। (বুখারি)

# ইতিকাফ: হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সা. মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশদিনে ই’তিকাফ করতেন। (বুখারি, মুসলিম)
#   দান খায়রাত: ইবনু আব্বাস রা. বলেন, রাসুল সা. সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল মানব ছিলেন। বিশেষ  করে রমজানে তাঁর দানশীলতা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেত। (বুখারি, মুসলিম)
অতএব, রাসূলের আদর্শ অনুসরণে এ মাসে গরিব আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত প্রতিবেশী, দুঃস্থ মানবতা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে মুক্ত হস্তে দান করা উচিত।

রমজানের শেষ দশ দিন
রমজানের শেষ দশ দিন অত্যন্ত মর্যাদা ওঅনন্য ফজিলতের অধিকারী। মুক্তিকামী সকল নর-নারীর এ দিনগুলোতে ইবাদতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ যত্নবান থাকা চাই। নবীজীবন আমাদের এ শিক্ষাই দেয়। হযরত আয়েশা রা. বলেন, রমজানের শেষ দশদিনে রাসল সা. ইবাদতের জন্য যে পরিশ্রম করতেন অন্য সময়ে তা করতেন না। (মুসলিম)

রমজানে ও বছরের সবচেয়ে মর্যাদাবান রজনী হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর। কুরআনে এ রাতের  মর্যাদা ও মহাত্ম্য বর্ণনা করে একটি স্বতন্ত্র সুরা নাজিল হয়েছে। আল্লাহ বলেন, লাইলাতুল ক্বদার হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (আল কদর: ৩)।

রাসুল সা. বলেছেন, লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের প্রত্যাশায় যে ব্যক্তি ইবাদত করবে তার পূর্বের পাপরাশি মার্জনা করে দেওয়া হবে। (বুখারি, মুসলিম)। তবে কুদরতের অপার রহস্য এ রাতটি অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। হাদিসে এ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়ে রাসুল সা. বলেন, তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বদরের সন্ধান করো। (বুখারি)

লেখক: কাতার প্রবাসী দাঈ

সংবাদটি শেয়ার করুন

ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত