ক্যাম্পে দিনে ‘৬০ রোহিঙ্গা শিশুর’ জন্ম

দিদার মালেকী, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৭ মে ২০১৮, ১৪:১২ | প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৮, ১৪:০৪

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের দ্বারা ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া হাজারো রোহিঙ্গা নারী জন্ম দিতে শুরু করেছেন ‘অপ্রত্যাশিত শিশু’।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে ৬০টি রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ।

বাংলাদেশের দিকে বড় আকারে রোহিঙ্গা ঢল নামার ৯ মাস পার হতে চলছে। ফলে সে সময় রাখাইনে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের গর্ভের সন্তান জন্ম নেয়াও শুরু করেছে। এমন সন্তানসম্ভবা রোহিঙ্গা নারীর অধিকাংশেরই বয়স আঠারোর নিচে। আগামী কয়েক মাসে সন্তান প্রসবের এই হার আরও বাড়বে বলে জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা।

এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ বলেছে, নয় মাস আগে রোহিঙ্গা সঙ্কট শুরুর পর থেকে ১৬ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এদের মধ্যে মাত্র তিন হাজার শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে মায়েরা স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা পেয়েছে।

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি অ্যাডওয়ার্ড বেইগ্যাদার বলেন, ‘ধর্ষণ, নির্যাতন, গৃহহারা ও আতঙ্কগ্রস্ত এইসব শিশুদের পরিবার তাদের ঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারছে না।’

ইউনিসেফের তথ্য মতে, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণের কারণে কতটি শিশুর জন্ম হয়েছে বা হবে তার প্রকৃত সংখ্যা খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।

গত এপ্রিলে সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছিল, চলতি মাস থেকে আগামী কয়েক মাসে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের পরিত্যক্ত সন্তানের সংখ্যা বেড়ে যাবে। হাজারো রোহিঙ্গা নারীর সন্তান প্রসবের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা রাখাইনে তারা যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলেও জানায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা।

বাংলাদেশের একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৩০০ অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীকে তারা শনাক্ত করেছেন। তবে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীর প্রকৃত সংখ্যা ২৫ হাজারের মতো হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে যে অভিযান চালাচ্ছে, তার গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ একটি অংশ রোহিঙ্গা নারীদের ব্যাপক হারে ধর্ষণ। যদিও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করে আসছে, সৈন্যরা রাখাইনে কোনও হত্যা, ধর্ষণ করেনি।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনা করছে ফ্রান্সভিত্তিক চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)। সংস্থাটি সন্তানসম্ভবা রোহিঙ্গা হাজারো নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব মায়েদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। রাখাইনে ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভধারণের ফলে সামাজিক কলঙ্কের চিন্তা তাদের মানসিক পীড়ন অবর্ণনীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো বলছে, ধর্ষণের ফলাফল হিসেবে জন্ম নেওয়া এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। প্রথমত এসব শিশুরা রোহিঙ্গা নারীদের লোমহর্ষক নির্যাতনের দিনগুলো মনে করিয়ে দেবে। পাশাপাশি এসব শিশুরা পরিচয় সংকটের কারণে বেড়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়বে। এরইমধ্যে অনেক ধর্ষণের শিকার অনেক রোহিঙ্গা নারী গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তান নষ্ট করেছেন।

গত এপ্রিলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা কক্সবাজারে এসে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিজেদের চোখেছেন। ক্যাম্প পরিদর্শন করে তারা রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে শুনেছেন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা।

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে জাতিসংঘের যৌন সহিংসতা বিষয়ক বিশেষ দূত প্রমিলা পাতেন জানিয়েছেন। তার মতে, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের সমূলে উৎপাটন করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।

জাতিসংঘ রাখাইনে গণহত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়ে আসছে। এমনকি সংস্থাটি যৌন সহিংসতা চালানোর দায়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে গত এপ্রিলে জাতিসংঘের কালো তালিকাভুক্ত করেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, রোহিঙ্গা নারীদের দুই তৃতীয়াংশ রাখাইনে যৌন সহিংসতার শিকার হলেও লজ্জা ও কলঙ্কের কথা ভেবে কর্তৃপক্ষ কিংবা দাতব্য সংস্থার কাছে তারা তা জানাননি।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে চার দশক ধরে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে কথিত হামলার অভিযোগ তুলে সেনা অভিযানের নামে নৃশংসতা শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এদের আশ্রয় হয়েছে কক্সবাজারে উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত খুঁজে পেয়েছে বলে জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা নিপীড়নকে জাতিগত নিধন বলে অভিহিত করেছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সমস্ত অভিযোগই বরাবরের মতো অস্বীকার করে আসছে।

(ঢাকাটাইমস/১৭মে/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত