বাংলাদেশে বিশ্বকাপ উন্মাদনা ও দেশীয় ফুটবল

নিয়ামুল আযীয সাদেক
 | প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৮, ১৪:৩৫

বিশ্ব মানচিত্রে খুব ছোট বাংলাদেশ। তবে ক্রিকেট পরাশক্তিগুলো এখন বাংলাদেশের নাম ভালো করেই জানে। জায়ান্ট আস্ট্রেলিয়, দক্ষিণ আফ্রিকা,ভারত, ইংল্যান্ডের কাছে জেতাটা এখন আর অঘটন বলেনা কেউ। বরং প্যাকেজ ট্যুরে রীতিমত ছড়ি ঘুরিয়ে যায় দেশে ও দেশের বাইরে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ যতটা সামনের পথে হাটছে, ফুটবলে ততটাই বিপরীতে। বাংলাদেশ ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার র‌্যাংকিয়ে ১৮৯তম। এতটা এদেশের ফুটবলের এতটা খারাপ অবস্থা এর আগে দেখেনি কেউ। প্রতিবেশী দেশ ভারত ১৩২ আর মালদ্বীপ ১৩৭তম।

একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের পর বাংলাদেশের ফুটবলে ২০০৩ সালের ‘সাফ চাম্পিয়নশিপ’ ও ২০১০ সালে ‘এসএ গেমস’ চ্যাম্পিয়ন ছাড়া আর তেমন কোনো সাফল্য নেই। অথচ প্রায় সতেরটি বছর কেটে গেল দেশের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাফুফের নতুন খেলোয়াড় তৈরিতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি উল্টো খেয়াল খুশিমতো একের পর এক কোচ বদল করেছে।

অথচ বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল পাগল। বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ছাড়াও স্পেন, জার্মানী, ইটালি, ইংল্যান্ডের সমর্থকদের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো। বাড়িতে বাড়ি প্রিয় দলের পতাকা, মাঠ ঘাটে জার্সি, প্রাইভেটকারে সব জায়গায় বিশ্বকাপ উত্তেজনা। রাত জেগে খেলা দেখা মুড়ি মুড়কির আয়োজন আরও কতকি। সমর্থকদের পাগলামির মাত্রাটা আরো বেশি। ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব, পুরো বাড়ি ঐসবের দেশের সমর্থনে রাঙানো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথার যুদ্ধ, যুক্তি পাল্টা যুক্তি কত কি।কিন্তু এসব কিছু হয়তো মেসি নেইমাররা তেমন জানেনই না।

জার্মানীর তৈরি হোমিও ঔষধ খেয়ে সুস্থ হওয়া কৃষক আমজাদ বাড়ি বিক্রি করেও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।মেজবান খাইয়েছেন আর্ন্তজাতিক খবরেরও অংশ হয়েছেন।

এরও আগের ঘটনা আর্জেন্টিনা সমর্থক এক ভক্ত প্রিয় দলের বিশ্বকাপ জেতার আগে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যে কথা সে কাজ। মা বাবা ভাই বোন সবার অনুরোধ স্বত্ত্বেও তার সিদ্ধান্তে অটল সে।

আমাদের এলাকার কথা বলি। কুমিল্লার এক চেয়ারম্যান ঘোষণা দিলেন ব্রাজিল জিতলে তিনি গরু খাওয়াবেন। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকোকে হারানোর পর এলাকার ছেলেপেলেদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে কোয়ার্টারের পরেই গরু জবাই করেন তিনি।

গ্রামের কথা। তখনো সাদা কালো টিভির যুগ। ৫টাকা করে চাঁদা তুলে সন্ধ্যায় নাটক অথবা খবর সাথে মুড়ি পেয়াজু ভাজা খেতো সবাই।মামা গ্রামের সব বাড়ি থেকে টাকা উঠিয়ে সাদাকালো ন্যাশনাল টিভি আনলো উঠানে। ছেলে মেয়েদের সে কি আনন্দ। প্রথা ভেঙ্গে সন্ধ্যার পর না ঘুমিয়ে প্রিয় দলের খেলা দেখে সবাই। ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ আর রাতের নিরবতা ভেঙ্গে হঠাৎ করেই হইচই চলে। এরই মধ্যে এন্টেনা নিয়ে বাঁধে বিপত্তি। রাতে বড় একটা বাঁশ এনে সে সমস্যাটা কাটায় মামা।

আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের সমর্থকদের দীর্ঘ পতাকা মিছিল রাজধানীর অন্যতম আকর্ষণ। অফিসে অফিসে খাবার দাবার বাজি ধরা ইত্যাদি নানান আয়োজন।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের সাথে নবাগত সেনেগালের খেলা। শুরুতেই হোচট খেল আয়োজক ফ্রান্স। ১-০ গোলে হারলো দলটির কাছে। বাংলাদেশের অনেকের কি যে আনন্দ। হয়তো নবীন দল বলেই এতটা সমর্থন পেল তারা। সেনেগালের পতাকা কেনার ধুম পাড়ায় মহল্লায়। ফেসবুকে তৈরি হলো সেনেগাল ফ্যান ক্লাব। তার প্রতিদানও দু'হাত ভরে দিয়েছে দেশটির ফুটবল খেলোয়াড়রা। সেমিফাইনাল পর্যন্ত দলকে টেনে নিয়েছিল সাদির মতো খেলোয়াড়রা।

এবার আবারও সেনেগাল ফিরেছে ১৬ বছর পর। মরক্কো, মিশর খেলছে। নতুন দল আর দেশের নানা বৈচিত্র ও ফুটবলের কারিশমার বিশ্বকাপে খেলা কথা চিন্তাও করতে পারেনা বাংলাদেশ। একসময়ে কাজী সালাহউদ্দিন, মামুন জোয়ার্দার, রজনীদের কথা এখনো ভোলেনি অনেক মানুষ। ছোটবেলায় আমাদের বাসাসহ এলাকায় এলাকায় আবাহনী মোহামেডানের পতাকা উড়তো। সাদা পতাকায় কালো দুটি দাগে এমএসসি আর আকাশী হলুদের আবাহনীর পতাকা। এখন যেসব দেয়ালে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার পতাকা আকা হয় সেখানে আবাহনী মোহামেডানের পতাকা আকা হতো। এলাকার মুরুব্বীরা সে টাকার স্পন্সর। দু'দলের খেলায় টান টান উত্তেজনা। রাস্তাঘাট ফাঁকা।

ক্রিকেটে একসময়ে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান আর ভারতের দ্বৈরথ খুব টানতো। এখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের অভূতপূর্ব উত্থানের পর বাংলাদেশ আর ভারতের খেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এমনকি টেলিভিশনগুলোতেও সে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে এ আশা করে এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুস্কর। এর পেছনে দায়ী কারা।বিদেশি খেলোয়াড়দের দিয়ে প্রিমিয়ার ডিভিশন আর নামকাওয়াস্তে কিছু টুর্নামেন্টই কাজ বাফুফের। বিদেশে ও দেশে তুর্কমেনিস্তান, ইজবেকিস্তান মালদ্বীপ আর ভারতের কাছে হারা এখনো নিয়মিত। এমনকি বলে কয়ে হারানো নেপালের কাছেও ধরাশায়ী আমরা। তাহলে ফুটবলের এত জৌলস আর ভালোবাসা কি হবে। কি হবে প্রতিবছর এত টাকা খরচ করে দেশে বিদেশে ফুটবল দলকে পাঠিয়ে?  

২০১৮ সাল রাশিয়ায় বিশ্বকাপ। ৩২টি দলের মধ্যে ৫টি এশিয়ার। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ নেই। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন ফিকে মনে হলেও অনুর্দ্ধ ১৬ নারী ফুটবলারদের নিয়ে আশার বীজ বুনছেন অনেকে। তাদের নজরকাড়া খেলা ড্রিবলিং পাসিং দর্শনীয় শট সব কিছুই অনেক কিছুই বলছে। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবলের স্বপ্ন যেন দিনের আলো ফুটলেই উবে যাওয়ার মতো। ফুটবল পাগল এদেশে ফুটবলের জোয়ার আনতে করণীয় ঠিক করতে  নতুন করে ভাবতে দোষ কোথায়?

লেখক: নিয়ামুল আযীয সাদেক, সাংবাদিক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

খেলাধুলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত