দুর্নীতি প্রতিরোধে সংসদের ভূমিকায় ব্যাপক ঘাটতি: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৮, ১৯:৫৬

সংসদ অধিবেশনে অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার ও কোরাম সংকট অব্যাহত থাকার বিষয়কে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সুশাসন ও জাবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সংসদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

বৃহস্পতিবার দশম জাতীয় সংসদের ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ইফতেখারুজ্জামান। রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে সংসদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ঘাটতির জন্য সরকারি ও বিরোধী উভয় দলই এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে যারা নিজেদের দাবি করেন বা যাদের উপস্থাপন করা হয় আত্মপরিচয় নিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্ট সংকট বর্তমান সংসদের মেয়াদের শেষ বছরে তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন।

সংসদকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিটিগুলোতে আলোচিত সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের সাথে কমিটিগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের স্বার্থ জড়িত থাকার কারণে কার্যকর ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সরকারকে জনগণের নিকট জবাবদিহি করার মৌলিক দায়িত্ব পালনে কমিটিগুলোর একাংশের কার্যকরতার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান প্রতিষ্ঠান সংসদ। মূল কাজ আইন প্রণয়ন হলেও প্রশংসা, নিন্দা ও কটূবাক্য ব্যবহারে এই সংসদের বেশিরভাগ সময় ব্যয়িত হচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে নিয়মিত উপস্থাপিত না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশ ও দেশের সকল সম্পদের মালিক জনগণ। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব জনগণ যাদের ওপর অর্পণ করেন তাদের উচিৎ সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করা। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সংসদে তা উপস্থাপন করে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ।’

 

প্রতিবেদনে সংসদকে অধিকতর কার্যকর করার মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে নবম সংসদে কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত ‘সংসদ সদস্য আচরণবিধি বিল প্রয়োজনীয় পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাপেক্ষে পুনরায় সংসদে উত্থাপন, চূড়ান্ত অনুমোদন ও আইন হিসেবে প্রণয়নের সুপারিশসহ মোট ১৪ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।

মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোর্শেদা আক্তার ও নিহার রঞ্জন রায় এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার অমিত সরকার। সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের অপর সদস্য টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি  এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে

অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার বন্ধে বিধি অনুযায়ী স্পিকারের আরো জোরালো ভূমিকা গ্রহণ; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন; রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ সংসদে উপস্থাপন; আইন প্রণয়নে বিরোধী দলের যৌক্তিক প্রস্তাবসমূহ সরকারি দলের বিবেচনায় নেওয়া; খসড়া আইনের ওপর জনমত গ্রহণের লক্ষ্যে অধিবেশনে উত্থাপিত বিলসমূহ সংসদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ; এবং বিধি অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নিয়মিত সভা অনুষ্ঠান, কমিটির কার্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত রাখা ও কমিটির নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংসদীয় উন্মুক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংসদীয় কর্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ। এছাড়াও সংরক্ষিত আসনসহ সকল নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের হলফনামা সংসদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদ করার সুপারিশ করে টিআইবি।

টিআইবি প্রতিবেদেনে যা বলা হয়েছে

দশম সংসদের পাঁচটি অধিবেশন সময়ে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে ৪৬টির সভা অনুষ্ঠিত হলেও ৪টি কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। বিধি অনুযায়ী প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি করে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪২টি কমিটির। এর মধ্যে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সর্বোচ্চ ৫২টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী আটটি কমিটিতে সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কিত সম্পৃক্ততা দেখা যায় যা কার্যপ্রণালী বিধির লঙ্ঘন। ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ১৬টি কমিটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ১১টি কমিটির সদস্যদের সার্বিক গড় উপস্থিতি ৫৬%, ৫টি কমিটির প্রতিবেদনে উপস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদনের ৪১% সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৪৬% বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

দশম সংসদের চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ অধিবেশনের প্রকৃত মোট কার্যকালের ১৩% কোরাম সংকটের কারণে ব্যয়িত হয়। দৈনিক গড়ে ৩০ মিনিট হিসেবে মোট কোরাম সংকট হয়েছে ৩৮ ঘন্টা তিন মিনিট যার প্রাক্কলিত অর্থমূল্য প্রায় ৩৭ কোটি ৩৬ লক্ষ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। আইন প্রণয়নে অধিবেশনের মোট সময়ের মাত্র ৯% ব্যয়িত হয়েছে। পাঁচটি অধিবেশনে পাস হওয়া ২৪টি সরকারি বিলের ২১টির ওপর জনমত যাচাইয়ের সকল প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। প্রতিটি বিল পাস হতে গড়ে সময় ব্যয় হয় মাত্র ৩৫ মিনিট। উল্লেখ্য, ভারতের লোকসভায় প্রতিটি বিল পাসের গড় সময় ২ ঘন্টা ২৩ মিনিট।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দশম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলের সভাপতিকে সরকারের বিভিন্ন কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করাসহ দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে দলীয় ফোরাম ও জনসভায় জোরালো বক্তব্য দিতে দেখা গেলেও সংসদীয় কার্যক্রমে এ সকল বিষয়ে তার অনুরূপ ভূমিকার ঘাটতি লক্ষণীয়।

বর্তমান সংসদের মোট ১৮টি অধিবেশনের ৩২৭ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি উপস্থিত ছিলেন ৭৯ কার্যদিবস (২৪%)। সরকারি প্রটোকল ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের জন্য বিশেষ ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাসহ প্রতি মাসে গড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা সরকারি ব্যয় হলেও দায়িত্ব পালনে তাঁর ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে ব্যক্তিগত সফর করলেও বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি।

(ঢাকাটাইমস/১৭মে/জেআর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত