আওয়ামী লীগের আগামী নেতৃত্ব

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
 | প্রকাশিত : ১৯ মে ২০১৮, ১১:০৮

বাংলাদেশের রাজনীতিটা আসলে এক আশ্চর্যজনক। এখানে গণতন্ত্রকে সামনে রেখে চলে সকল অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ। দেশের এক বিরাট দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বার বার আশার আলো দেখিয়ে করা হয় নিরাশা। বড় দুইটি রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে তাদের দলের ভেতরেই গণতন্ত্র আছে কি?

যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে পরিবারতন্ত্র রাজনীতি। এখন থেকে পরিত্রাণের কি কোনো পথ নেই?

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর গণতন্ত্রের নামে বাংলাদেশে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে তা আসলে কোনো গণতন্ত্রই ছিল না, ছিল সামরিকতন্ত্র। এই সময় কৌশলে রাজনীতিকে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। পাকিস্তান ফেরত বাঙালি অফিসার এবং মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব।

এ সব সুবিধাবাদী সামরিক কর্মকর্তাদের কার্যকলাপ দেশপ্রেমিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়াতে সামরিক বাহিনীতে ঘন ঘন ব্যর্থ অভ্যুত্থান হতে দেখা যায়l এসব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

প্রায় ১৪ বৎসর এই দুই জেনারেলের হাতে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল। দুঃখ হলেও সত্য যে এই সময়ের অভ্যুথানে কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়l এভাবেই ধীরে ধীরে পরোক্ষভাবে পাকিস্তান ফেরত সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের রাজনীতি চলে আসে। পরোক্ষভাবে ১৯৯১ যার পরিসমাপ্তি ঘটে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা সম্প্রতি নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে ৩৭ বছর হয়ে গেছে। এতগুলো বছর থাকাটা বোধ হয় সমীচীন নয়। আওয়ামী লীগকে ধীরে ধীরে চিন্তা করতে হবে নতুন নেতৃত্বের কথা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তনের পূর্ভাবাস দিয়েছেন তিনি। এখন প্রশ্ন হলো কে আনবে এই পরিবর্তন? কীভাবে আসবে এই পরিবর্তন? শেখ হাসিনার পরিবর্তে কে আসবেন দলের নেতৃত্বে?

আওয়ামী লীগ নেত্রী বললেই যে অন্যরা এই পথে আসবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই? বাংলাদেশের রাজনীতির পেছনে ফিরে তাকালে আমাদের বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরবর্তীর কথা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সময়মতো দেশে ফিরে এসে বিভক্ত হওয়া আওয়ামী লীগকে আবার শক্তিশালী করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, এইসময় তিনি দলকে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

দলের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার কারণে শেখ হাসিনা আর কারো উপর আস্থা রাখতে পারছিলেন না। ফলে তার অবর্তমানে নুতন নেতৃত্ব সৃষ্টি করা হয়নি।

৩৭ বৎসর অক্লান্ত পরিশ্রম করে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে ভবিষ্যতে যাতে আওয়ামী লীগ ১৫ আগস্টের পরবর্তী অবস্থার সম্মুখীন না হয় এজন্য দলের ভেতরে থাকা সুযোগ সন্ধানীরা দলে গণতন্ত্রিক কাঠামো সৃষ্টি না করে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার আওয়ামী লীগ এখন পরিবারতন্ত্র নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

অথচ আওয়ামী লীগের প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কখনো পরিবারতন্ত্র সৃষ্টি করেননি। তিনি তার অবর্তমানে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর তৈরি এই নেতৃত্বই তার অবর্তমানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু  চাইলে  তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল অথবা দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালকে  রাজনীতিতে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। শেখ কামাল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে শেখ জামাল রাজনীতির ধারে কাছে ছিলেন না।

যুগোস্লাভিয়া থেকে সামরিক শিক্ষা নিয়ে শেখ জামাল সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা সম্ভবত আগামী নির্বাচনের পর আর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে থাকতে আগ্রহী নন। বঙ্গবন্ধু কন্যা চাইলেই এখন পরিবারের বাহির থেকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারেন। কারণ দল এখন সম্পূর্ণভাবে তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত।

এভাবে কয়েক টার্ম নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে পারলে আওয়ামী লীগ খুব সহজেই পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে। দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলে নতুন নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। দলের ভেতরে ফিরে আসবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গণতন্ত্র।

সুতরাং চাটুকার আর সুবিধাবাদীরা যতই ভিন্ন মত পোষণ করুক না কেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।

লেখক: জুরি, স্টকহল্ম কোর্ট অফ এপিল, সুইডেন

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
Close