ঘর ছাড়া রাজশাহীর মাদক বিক্রেতারা

রিমন রহমান, রাজশাহী
| আপডেট : ২০ মে ২০১৮, ১৪:৫৮ | প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৮, ১৩:৩৫
ফাইল ছবি

মাদক নির্মুলে র‌্যাবকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া কড়া নির্দেশে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে রাজশাহী র‌্যাব। তাদের অভিযানে প্রতিনিয়তই বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছেন শীর্ষ মাদক বিক্রেতারা। আহত হচ্ছেন মাদক বিক্রেতাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরাও। গত তিন দিনে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর এবং চট্টগ্রামে এভাবে শীর্ষ সাত মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মাদক বিক্রেতারা।

গত ৩ মে ঢাকায় র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে বাহিনীটিকে নির্দেশ দেন। পরদিন থেকেই অভিযানে নামে র‌্যাব। আর ১৪ মে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে মাদক বিক্রেতা ও মাদক ব্যবহারকারীদের সতর্ক করেন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেজনীর আহমেদ। এরই অংশ হিসেবে কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করে রাজশাহী র‌্যাব।

দেশে হেরোইন, ফেনসিডিল ও ইয়াবা ঢোকার প্রধান রুট সীমান্তের জেলাগুলো। এসব এলাকায় বড় বড় মাদক মাফিয়াদের বাস। সেখানে র‌্যাবের এমন কঠোর অভিযান রীতিমতো আতঙ্কিত করে তুলেছে মাদক বিক্রেতাদের। বিশেষ করে রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার অনেক মাদক বিক্রেতা এরই মধ্যে আত্মগোপনে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর সবচেয়ে বেশি মাদকপ্রবণ এলাকার একটি পবা উপজেলার সোনাইকান্দী গ্রাম। এ এলাকার প্রায় শতাধিক মাদক বিক্রেতা ভারত থেকে হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিল পাচার করে দেশে আনেন। তাদেরই একজন ছিলেন আবুল হাসান ওরফে হাসান ঘাটিয়াল। গত বুধবার তিনি র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলা ছিল ১৬টি। হাসান নিহত হওয়ার পর থেকে ওই এলাকার মাদক বিক্রেতারা  আতঙ্কে রয়েছেন।

গত বছরের ৪ মার্চ পবা উপজেলার হরিপুর, সোনাইকান্দী, কসবা, মুরারিপুরসহ আশপাশের এলাকার ১১৯ জন মাদক বিক্রেতা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তারা মাদক বিক্রি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অঙ্গীকার করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। কিন্তু মাদক বিক্রি ছেড়ে দেয়ার অঙ্গীকার করা ওই ১১৯ জনও কথা রাখেননি। নানা কায়দায় তারা চালিয়ে যাচ্ছেন মাদক বিক্রি। তবে র‌্যাবের এমন অভিযানের পর তাদের অনেকেই এখন আত্মগোপনে।

এদের মধ্যে আছেন মুরারিপুর এলাকার জাহাঙ্গীর আলম। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১৬টি। পলাতক রয়েছেন হরিপুর সেন্টু মিয়া। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তিনটি। হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সেলিম রেজার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা রয়েছে চারটি। তাকেও দেখা যাচ্ছে না এলাকায়। পবায় মাদক বিক্রিতে আলোচিত গডফাদার হিসেবে প্রথমেই জাঙ্গালপাড়া এলাকার মাসুম ওরফে পা ফাটা মাসুমের নাম উঠে আসে। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১২টি। সোনাইকান্দি এলাকার আরেক মাসুমের নামেও মামলা আছে ১১টি। তারা এখন লাপাত্তা।

এছাড়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মাদক বিক্রেতাদের গডফাদার হিসেবে পরিচিত সোনাইকান্দি এলাকার বাচ্চু ঘোষকে। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৯টি। একই এলাকার রাজনের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে ১২টি। আর পুরো পবায় মাদকের বিশাল নেটওয়ার্কের গডফাদার হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত নাম কসবা এলাকার মিলন ওরফে ভকা মিলনও এখন আত্মগোপনে। মিলনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১০টি। এদের সবার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও তারা জামিনে বেরিয়ে অবৈধ এ কারবারের সঙ্গেই জড়িত থাকেন।

র‌্যাব-৫ এর উপ-অধিনায়ক মেজর এএম আশরাফুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের মাদক বিক্রেতাদের একাধিক বাড়ি থাকে। কারও কারও একটি বাড়ি আছে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামে, একটি নদীর এপারের গ্রামে এবং আরও একটি বাড়ি আছে শহরে। তারা কখন কোথায় থাকেন তা নিশ্চিত হওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কাছে মাদক না থাকলে তাকে গ্রেপ্তারও করা যাবে না। অনেক সময় দেখা যায়, যে বাড়িতে মাদক বিক্রেতা যখন অবস্থান করেন না, তখন সে বাড়িতে মাদক মজুত রাখা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ধরনের মাদক বিক্রেতাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি গোদাগাড়ী উপজেলায়। এদের মধ্যে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শরিফুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। দিয়াড় মানিকচকে তার বাড়ি রয়েছে। পদ্মার এপারে মহিষালবাড়িতেও তার আরেকটি বাড়ি আছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত মাদক বিক্রেতো মাহবুব ও মংলারও এই দুই স্থানে দুটি করে বাড়ি আছে। তবে তাদের এখন কোনো বাড়িতেই দেখা যাচ্ছে না বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে গত শুক্রবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হওয়ার পর থেকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না গোদাগাড়ীর সীমান্ত লাগোয়া চর কোদালকাটির মাদক বিক্রেতা সেন্টু, মন্টু, রুহুল, মহিষালবাড়ির লোকমান, ইলিয়াস, বারুইপাড়ার দেলোয়ার, মাদারপুরের বড় শাহাদত, আঁচুয়ার মালেক, উজানপাড়ার জাহাঙ্গীর, বাইপাসের বাবু, সুলতানগঞ্জের রুহুল, গাড্ডু, আশরাফুল, পোয়া বাবু, সারেংপুরের মনি এবং গড়ের মাঠের হযরত, আনারুল, আনিকুল ও হায়দারসহ আরও অনেক মাদক বিক্রেতাকে। অথচ এরাই গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কেজির কেজি হেরোইন পাচার করে এনে চালান করেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সবার বিরুদ্ধেই আছে মাদকের মামলা।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, রাজশাহী অঞ্চলের মাদক বিক্রেতাদের ব্যাপারে গত ছয় মাসে অন্তত ৬০০ অভিযোগ জমা পড়েছে র‌্যাব-৫ এর কার্যালয়ে। আর গত দুই সপ্তাহে মাদকের অন্তত ৮০০ খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন আমদানিকারক, মজুতকারক, সরবরাহকারী, পাইকারি বিক্রেতা ও সেবনকারীদের আলাদা আলাদা ভাগ করে সবাইকে আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করছে র‌্যাব। এতে অভিযান জোরদার হয়েছে। আর এ কারণেই বড় মাদক বিক্রেতারা অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে মারা পড়ছে।

র‌্যাব-৫ এর কর্মকর্তা মেজর আশরাফুল ইসলাম জানান, র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য র‌্যাবকে নির্দেশ দেন। চারঘাটের সারদায় পুলিশ অ্যাকাডেমির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েও প্রধানমন্ত্রী একই নির্দেশনা দেন। তাই মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঢাকা থেকে নির্দেশনা আসে। সে মোতাবেক তারা কাজ শুরু করেছেন তারা।

তবে প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার হলেও উদ্ধারের সময় গ্রেপ্তারকৃতরা ঘুষ দিয়ে বেরিয়ে আসছেন। গোদাগাড়ী থেকে প্রায়ই কেজি পরিমান হেরোইনসহ মাদক বিক্রেতা ও বহনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর সেই হেরোইনের রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে। এছাড়া মহাখালীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতেও নমুনা পাঠানো হয়। কিন্তু সেখান থেকে অনেক মাদকই মাদক নয় বলে প্রতিবেদন আসে। গোদাগাড়ীর কয়েকজন ব্যক্তি ওই দুটি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মোটা টাকার বিনিময়ে এমন প্রতিবেদন করিয়ে আনেন। সম্প্রতি র‌্যাবের জব্দ করা সাড়ে পাঁচ কেজি হেরোইনের একটি নমুনার ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে এ ধরনের প্রতিবেদন এসেছে।

র‌্যাব-৫ এর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের একটি দল গত বছরের ৮ অক্টোবর রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভার সারাংপুর নতুনপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাজেমান আলী নামে এক মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে হেরোইনগুলো জব্দ করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি দুই পরীক্ষাগারের ফলাফলেই নমুনায় হেরোইন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোদাগাড়ী থানার পরিদর্শক আলতাফ হোসেন মামলার দুই আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে আদালত এই চুড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে রাজশাহীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মামলাটি পুনঃতদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, গোদাগাড়ীর সিঅ্যান্ডবি এলাকার এক শীর্ষ মাদক বিক্রেতা, একজন আইনজীবী ও গোদাগাড়ী পৌরসভার একজন কাউন্সিলর ঢাকায় পরীক্ষাগারের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে হেরোইনকে  আফিয়াম নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে পরীক্ষার প্রতিবেদন করিয়ে আনেন বলে তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। হেরোইনসহ যে ব্যক্তিই গ্রেপ্তার হন না কেন, এদের টাকা দিলেই তারা ঢাকা থেকে হেরোইনটি হেরোইন নয় এমন প্রতিবেদন এনে দেন। ফলে হেরোইন বিক্রেতা ও বহনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের দিকেও নজরদারি করছে র‌্যাব। বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর আশরাফুল ইসলাম বলেন, কঠোর অভিযানের কারণে মাদক বিক্রেতা ও তাদের সহায়তাকারীরা এখন আতঙ্কিত বলে আমরা শুনতে পাচ্ছি। এ অবস্থায় তারা ভালো হয়ে গেলে ভালো। তা না হলে আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

(ঢাকাটাইমস/২০মে/আরআর/ওআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত