ফরিদপুরে লিচুর ভালো ফলনে চাষির মুখে হাসি

মফিজুর রহমান শিপন, ফরিদপুর
 | প্রকাশিত : ২১ মে ২০১৮, ২০:৪৯

ফরিদপুরে এ বছর লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। দামও পাওয়া যাচ্ছে ভালো। সঠিক পরিচর্যা করায় পোকাও ধরেছে কম। ফলে লিচুর চাষি ও ব্যাপারীসহ এর সঙ্গে জড়িতদের মুখে ফুটেছে হাসি।

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নের জাহাপুর, দপ্তরদিয়া, টেংরাকন্দি, মনোহরদিয়া, চর মনোহরদিয়া, খাড়াকান্দি ও মির্জাকান্দি গ্রাম এবং পাশের বোয়ালমারী উপজেলার (অধূনা ফরিদপুর সদর উপজেলার) চাঁদপুর ইউনিয়নের চাঁদপুর ও চতরবাজার কান্দি গ্রামে লিচুর আবাদ বেশী হয়।

এলাকাবাসী জানান, মধুখালীর জাহাপুরে একজন জমিদার ছিলেন। ওই জমিদারী অন্তÍত চার শ বছরের পুরনো। জমিদার পরিবারের উদ্যোগে প্রায় তিন শ বছর আগে ভারতের মাদ্রাজ থেকে লিচুর গাছ এনে জাহাপুরে একটি লিচুর বাগান করা হয়। ১৯৩৬ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেলে কয়েকটি গাছ বাদে ওই বাগানের লিচু গাছগুলি কেটে ফেলা হয়। পরবর্তীতে জাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল সাত্তার শেখ (৭০) আজ থেকে ৫০ বছর আগে জাহাপুরে লিচুর বাগান করেন। ফরিদপুর জেলার মধ্যে তাঁর লিচুর বাগানই সবচেয়ে বড়। লিচু বিক্রি করে তিনি লাভবান হন।  তার দেখাদেখি পরবর্তীতে একই গ্রামের সুলতান আহমেদ, শাহজাহান মোল্লা, বজলু মল্লিক কৃষি জমি বাদ দিয়ে লিচুর চাষে আগ্রহী হয়ে বাগান করেন।

ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ হয়ে আসছে গত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে। তবে গত ১০/১২ বছরের মধ্যে লিচুর আবাদ অনেক বেড়েছে। এ ব্যাপারে লিচু বাগানের কয়েকজন মালিকের সঙ্গে ঢাকাটাইমস প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা বলেন, যে সময়ে লিচু হয় সে সময়ে বিভিন্ন ধরনের ডাল, গম, পাট ও ধানের চাষ করা হয়। শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং লিচু লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষের প্রতি চাষিরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে জাহাপুর গ্রামের একটি বাড়িও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে লিচুর একটি গাছও নেই। বাড়িতে এক শতাংশ বাড়তি জমি থাকলেই সেখানে রোপন করা হয় লিচুর গাছ।

লিচু চাষি আব্দুল সাত্তার শেখ জানান, আগে একজন শ্রমিককে সারা বছর বাড়িতে রেখে খাওয়া দাওয়া দিয়ে বছর শেষে দুই শ টাকা দিলেই তিনি খুশি হতেন। এখন বছর শেষে এক লাখ টাকা দিলেও শ্রমিক পাওয়া যায় না। শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় জমিগুলিতে লিচু বাগান করা হয়েছে।

ফরিদপুরে যেসব জাতের লিচুর আবাদ বেশি হয় তার মধ্যে মোজাফফরপুরী অন্যতম। এছাড়া বোম্বাই, বেদানা, ভেরি, চায়না থ্রি জাতের লিচুর আবাদ হয়। মোজাফফরপুরী লিচুকে ওই এলাকার বাসিন্দারা ‘দেশী জাতের’ লিচু হিসেবে অবহিত করে থাকেন। এ লিচু বড় হয়, বিচি মাঝারি আকারের, মাংসাল, মিষ্টি ও সুস্বাদু। ফলন কম হয় চায়না থ্রি জাতের লিচুর। একটি গাছে মাত্র কয়েক থোকা লিচু ধরে। এজন্য এ লিচুর ব্যাপারে গ্রামবাসীর উৎসাহ কম।

লিচু চাষিরা জানান, লিচু চাষে কষ্ট কম করতে হয় তা না। আশ্বিন-কার্তিক মাসেই লিচু গাছের পরিচর্যা শুরু করতে হয়। সার দিতে হয়। সার ঠিকমত মাটির সাথে মিশে যাওয়ার জন্য ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ দিতে হয়। কার্তিক থেকে শুরু করে বৈশাখের মাঝামাঝি লিচু পাকা পর্যন্ত অন্তত ছয়বার ওষুধ স্প্রে করতে হয় যাতে লিচুতে পোকা না ধরে। তাছাড়া লিচু পাকতে শুরু করলে কাঠ বিড়ালী, বাদুর, চামচিকার উপদ্রপও আছেই। লিচু পাড়তে ও থোকা বানাতে শ্রমিকের সহযোগিতার প্রয়োজন। তারপরও লাভজনক হওয়ায় লিচুর আবাদ বাড়ছে এ এলাকায়।

লিচু পাকতে শুরু করলে বেশি দিন গাছে রাখা যায় না। ১০ থেকে ১২দিনের মধ্যেই লিচু পেড়ে বিক্রি করে দিতে হয়। এজন্য সব সময় সর্তক থাকতে হয়।

গত দুই বছর এ এলাকার চাষিরা লিচু চাষে লাভের মুখ দেখতে পাননি। কোনো কোনো চাষি ক্ষতির সম্মুখীনও হয়েছেন।  বিশেষত শিলা বৃষ্টি ও ঝড় এবং অতি খরা লিচুর ক্ষতি করে। তবে এ বছর লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। লাভ দেখছে শুরু করছেন লিচুর বাগারে মালিক, ব্যাপারীসহ লিচুর বিপণনের সাথে জড়িতরা। এজন্য লিচু চাষিদের চোখে-মুখে ফুটেছে হাসি।

এ হাসিই দেখা গেল জাহাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের লিচু বাগান ঘুরে ঘুরে।

তবে ফরিদপুরে উৎপন্ন লিচু শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। এখন চলছে লিচু পাড়া, লিচুর থোকা বাঁধা এবং বিক্রির জন্য ব্যাপারী বা খুচরো বিক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়ার কাজ। একাজে গ্রামের পুরুষদের পাশে পাশে স্ত্রী ও মেয়েদেরও উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে।

জাহাপুর গ্রামের লিচুর বাগানে সেতেরা বেগম, খোদেজা বেগম ও রেবা বেগমসহ এমনই কয়েকজনের সাথে কথা হলো।

তারা জানান, এ কাজ শ্রমিক দিয়েও করা যেতো। কিন্তু একজন শ্রমিক নিলে তাকে বেতন দিতে হয় চার শ/পাঁচ শ  টাকা। সে টাকা না দিয়ে ঘরের কাজ সেরে বাগানে এসে আমরা কাজ করছি। এতে টাকাও বাঁচছে আবার আমাদের অবসর সময়ও কাজে লাগাতে পারছি।

জাহাপুর এলাকায় কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা নাদীরা আক্তার। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, শুধুমাত্র জাহাপুর গ্রামেই ২২ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়। তিনি বলেন, আমি প্রতিনিয়ত লিচু চাষিদের সাথে যোগাযোগ রাখি এবং তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হই।

জাহাপুর ও চাঁদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠান ব্যাপারীরা। অন্তত এক শ ব্যাপারী ওই এলাকা থেকে লিচু সংগ্রহের কাজে নিয়েজিত।

তাদের একজন জাহাপুরের কাশেম মল্লিক। তিনি জানান, আমাদের এখানকার লিচু সুস্বাদু। চাহিদা আছে অনেক। ঢাকার বাদামতলী, দোহার, জয়পাড়া, মাদারীপুরের শিবচর, চন্দের চর, টেকেরহাট, মোস্তফাপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয় ফরিদপুরের জাহাপুর-চাঁদপুরের লিচু।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে ফরিদপুর জেলায় মোট ৮১৯ প্রকার ফল উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে লিচুর অবস্থান ১২তম।

ওই বিভাগের হিসেব মতে ফরিদপুরে মূলত বোয়ালামারী ও মধুখালীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিচুর চাষ হয়। গত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ফরিদপুরের এক হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। লিচু উৎপন্ন হয়েছে ১৮৬ মে. টন। লিচুর সাথে জড়িত রয়েছেন প্রায় সহ¯্রাধিক কৃষক।

জেলার লিচু উৎপাদনের হিসেবে টনে দিলেও আর্থিক ভাবে কোনো পরিসংখ্যান নেই ফরিপুর কৃৃষি বিভাগের কাছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্ত্তী জানান, এটি ফরিদপুরের ১২তম উৎপন্ন ফল। জেলার লিচুর আর্থিক গুরুত্ব কত আগামীতে সে বিষয়ে হিসেব রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে জেলায় লিচুর আর্থিক অবদান কৃষি বিভাগ দিতে না পরলেও একটি হিসেব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন লিচু ব্যাপারী কাশেম মল্লিক। তিনি বলেন, এবার লিচুর ফলন অন্যান্য বছরের চেয়ে কম হলেও দাম পাওয়া যাচ্ছে ভালো। প্রতি হাজার লিচু বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার আট শ টাকা থেকে তিন হাজার ছয় শ টাকা দরে। তিনি বলেন, তিনি একাই গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৬ লাখ টাকার লিচু সরবরাহ করেছেন। তার হিসেবে ফরিদপুরে শতাধিক লিচুর ব্যাপারী আছেন। তার ধারণা এ বছর ফরিদপুরের লিচু থেকে আয় আসবে সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা।

ঢাকাটাইমস/২০মে/প্রতিনিধি/ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত