‘বন্দুকযুদ্ধ’ চলছেই, নিহত আরও দশ ‘মাদক কারবারি’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৩ মে ২০১৮, ১৫:১১ | প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৮, ১২:০৬
রংপুর মেডিকেলে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত শাহিন মিয়ার মরদেহ

সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলছেই। অভিযানের অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত দেশের নয় জেলায় মাদকের কারবারে জড়িত দশজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কুষ্টিয়ায় দুইজন এবং জামালপুর, কুমিল্লা, ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গা, লালমনিরহাট ও রংপুরে একজন করে মোট আটজন নিহত হয়েছেন। আর গাইবান্ধা ও ফেনীতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন দুইজন।

নিহতরা সবাই মাদক চোরাকারবারে জড়িত ছিল। কারও কারও বিরুদ্ধে থানায় মাদক আইনে একাধিক মামলাও রয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

এই নিয়ে চলতি মাসের ৪ মে থেকে চলা মাদকবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪৩ জন মাদক বিক্রেতা নিহত হলেন। এর মধ্যে গত তিন দিনে নিহত হয়েছেন ২৯ জন।

প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের কাহিনি একই রকম। ‘মাদকের কারবারি’কে নিয়ে অভিযানে বের হলে গুলি করে তাদের সহযোগীরা। আর গোলাগুলির এক পর্যায়ে নিহত হন সন্দেহভাজন মাদকের কারবারি। কখনও কখনও পুলিশের এক-দুই জন সদস্য আহতও হন। ঢাকাটাইমসের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর।

কুষ্টিয়া

জেলার কুমারখালী ও ভেড়ামারা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত হয়েছেন। পৃথক দুটি বন্দুকযুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আট সদস্য আহত হয়েছেন। দুই ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গুলি ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে কুমারখালী উপজেলার লাহিনী পাড়ার গড়াই নদীর পাড় সংলগ্ন ব্রিজের নিচে ও ভেড়ামারা হাওয়াখালী ইটভাটার কাছে এসব ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটে।

কুমারখালী থানার ওসি আব্দুল খালেক জানান, গোপন খবর পেয়ে কুমারখালী থানা পুলিশের একটি টহল দল লাহিনী পাড়ার গড়াই নদীর পাড় সংলগ্ন ব্রিজ এলাকায় যান। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদক চোরাকারবারিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। জবাবে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এর একপর্যায়ে শীর্ষ মাদক চোরাকারবারি ও সন্ত্রাসী ফটিক ওরফে গাফফার গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

‘বন্দুকযুদ্ধের’ পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি, সাত শ পিস ইয়াবা ও ৫০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ফটিক কুমারখালী উপজলার এলেঙ্গীপাড়া গ্রামের ওসমান গনীর ছেলে।

ভেড়ামারা মডেল থানার ওসি আমিনুর রহমান জানান, রাতে উপজেলার হাওয়াখালী ইট ভাটার কাছে মাদক বেচাকেনার খবর পেয়ে পুলিশ গেল চোরাকারবারিদের সঙ্গে গোলাগুলি হয়। এতে মাদক ব্যবসায়ী লিটন শেখ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি এলজি, তিন রাউন্ড গুলি, ৫০০ পিস ইয়াবা ও দুই শ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করেছে। নিহত লিটন শেখ উপজেলার নওদাপাড়া এলাকার মৃত গোলবার শেখের ছেলে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক ও চোরাকারবারির মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

লালমনিরহাট  

লালমনিরহাট সদর থানা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নুর আলম এশার (৪০) নামে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন দুই পুলিশ সদস্য।

মঙ্গলবার রাত ৩টায় লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ধরলা সেতুর কাছে এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। আহত দুই পুলিশ সদস্য উপ-পরিদর্শক(এসআই) আশরাফ হোসেন (৪০) ও আবুল কালামকে (৩৫) লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

নিহত এশার আলী কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের দুই জেলার সীমান্তের এন্তাজ আলীর ছেলে। এসময় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ২০ কেজি গাঁজা, ৫০ বোতল ফেনসিডিল, ৬টি রাম দা  ও কিছু গুলির খোসা উদ্ধার করেছে।

পুলিশ জানায়, রাত ৩ টার দিকে কুলাঘাট ধরলা সেতুর কাছে মাদকের একটি চালান লালমনিরহাটে ঢুকছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে পুলিশ ওই এলাকায় পৌঁছালে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে তারা। এসময় পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই নুর আলম এশার মারা যায়। নিহত নুর আলম এশার  বিরুদ্ধে থানায় মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে।

লালমনিরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এন মাহফুজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

কুমিল্লা

কুমিল্লায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নুরুল ইসলাম ইছা নামে এক ‘মাদক বিক্রেতা’ নিহত হয়েছেন, যাকে মঙ্গলবার বিকালে গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটি। রাত সাড়ে ১২টার দিকে আদর্শ সদর উপজেলার টিক্কার চর ব্রিজ সংলগ্ন গোমতী বাঁধ এলাকায় এই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে।

নিহত ইছা একই উপজেলার গাজীপুর গ্রামের আবদুল জলিলের ছেলে। তিনি একজন চিহ্নিত ও তালিকাভূক্ত মাদক চোরাকারবারি ছিলেন বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশ জানিয়েছে, বিশেষ অভিযানে মঙ্গলবার বিকালে গ্রেপ্তার করা ইছাকে নিয়ে রাতে মাদক উদ্ধারে যায় পুলিশ। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভীর সালেহীন ইমনের নেতৃত্বে কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশের একটি দল শহরতলীর টিক্কারচর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় গেলে ইছার সহযোগিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়লে ইছা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

নিহত ইছার বিরুদ্ধে মাদক আইনে সাতটি মামলা রয়েছে বলেও জানান কোতয়ালি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ আবু ছালাম মিয়া।

ঠাকুরগাঁও

জেলার বালিয়াডাঙ্গী থানা পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযানের সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধে আপতাফুল  ইসলাম নামে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমানসহ দুই পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্যমতে, রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার পারুয়া গ্রাম থেকে ১০০ বোতল ফেন্সিডিলসহ গ্রেপ্তারের পর আপতাফুলকে নিয়ে পীরগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালাতে যায় বাহিনীটি। রাত সাড়ে তিনটার দিকে পীরগঞ্জ-ঠাকুরগাঁও সড়কের ভাতারমারী ফার্মে পৌঁছলে মাদক চোরাকারবারিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে আপতাফুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

নিহত ব্যক্তি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পারুয়া গ্রামের ভেলসা মোহাম্মদের ছেলে। তার বিরুদ্ধে ১৫টি মাদক মামলাসহ প্রায় ২০টি মামলা রয়েছে বলে বালিয়াডাঙ্গী থানার উপপরিদর্শক (এসআাই) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন।

চুয়াডাঙ্গা

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গাতেও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে একজন। তার নাম কামরুজ্জামান। নিহত কামরুজ্জামান সাদু শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বলে জানায় পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পিস্তল, গুলি ও ফেন্সিডিল।

জামালপুর

জামালপুরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মোশাররফ হোসেন বিদ্যুৎ নামে এক চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে শহরতলীর ছনকান্দার মাদ্রাসাঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এসময় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)নাসিমুল ইসলাম আহত হয়েছেন।  

বুধবার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন জানান, শেরপুর থেকে মাদকের চালান নিয়ে কয়েকজন মাদক চোরাকারবারি বিপুল পরিমান মাদক বিক্রির উদ্দেশ্যে জামালপুরে আসছে। এমন খবেরের ভিত্তিতে ওসি নাসিমুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ছনকান্দা মাদ্রাসাঘাট এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় মাদক বিক্রেতারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হন বিদ্যুৎ। অন্যরা সাতার কেটে নদী পাড় হয়ে পালিয়ে যান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বিদ্যুৎকে মৃত ঘোষণা করেন।

অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, ৩ রাউন্ড গুলি, ১ হাজার ইয়াবা ও ২০০ গ্রাম হিরোইন উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন।

তবে নিহতের স্ত্রী শিল্পী বেগমের দাবি, সদর থানার  ৩পুলিশ সোমবার রাতে বিদ্যুৎকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। মঙ্গলবার মধ্যরাতে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর পান তিনি।

রংপুর

নগরীর হাজিরহাট এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শাহিন মিয়া নামে পুলিশের তালিকাভূক্ত এক মাদক চোরাকারবারি নিহত হয়েছে। বুধবার ভোরে এই ঘটনা ঘটে।

কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোক্তারুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে একটি রিভলভার ও এক বস্তা ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।

ফেনী

ফেনীতে মঙ্গলবার রাতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আরও একজন নিহত হয়েছেন।

র‌্যাব-৭ ফেনী ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার শাফায়াত জামিল ফাহিম বলছেন, রাত ১২টার দিকে ফেনী শহরের দাউদপুর এলাকায় গোলাগুলির ওই ঘটনা ঘটে।

নিহত মোহাম্মদ ফারুক চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এলাকার অলি আহম্মেদের ছেলে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদক আইনের একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

শাফায়াত জামিল বলেন, চট্টগ্রাম থেকে মাদকের চালান ঢাকা যাওয়ার খবরে ফেনীর দাউদপুর কাঁচা বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে রাতে তল্লাশি করছিলেন র‌্যাব সদস্যরা।

‘এ সময় একটি প্রাইভেটকারকে থামার ইঙ্গিত দেয়া হলে সেখান থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা গুলি করে। র‌্যাবও আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালায়। তাতে মাদক ব্যবসায়ী ফারুক গুলিবিদ্ধ হয়।’ পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফারুককে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাস্থল থেকে একটি ওয়ান শুটার গান, পাঁচ রাউন্ড কার্তুজ ও ২২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে র‌্যাব। পাশাপাশি মাদক চোরাকারবারিদের ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়েছে।

গাইবান্ধা

জেলার পলাশবাড়ীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে জেলার শীর্ষ মাদক বিক্রেতা রাজু মিয়া নিহত হয়েছেন। তিনি পলাশবাড়ী উপজেলার বরিশাল ইউরিয়নের রায় গ্রামের মৃত জোব্বার মিয়ার ছেলে।

র‌্যাব-১৩ গাইবান্ধার ক্যাম্প জানায়, উপজেলার বিশ্রমগাতি এলাকায় মাদক কেনাবেচার খবর পেয়ে রাত তিনটার দিকে র‌্যাবের একটি দল সেখানে গেলে রাজু মিয়া ও তার সহযোগীরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবও পাল্টা গুলি ছুড়লে মাদক বিক্রেতা রাজু ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এ সময় দুই র‌্যাব সদস্য আহত হয়।

ঘটনাস্থল থেকে র‌্যাব একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি ও বিপুল গাজা উদ্ধার করেছে। নিহত রাজুর বিরুদ্ধে পলাশবাড়ী থানায় ২৯টি মাদকের মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।

ঢাকাটাইমস/২৩মে/প্রতিনিধি/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত