রোহিঙ্গা নিয়ে ভারতের মনোভাবে বিবর্তন এসেছে

তানিম আহমেদ
| আপডেট : ২৫ মে ২০১৮, ২১:১৮ | প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৮, ১৭:০৬

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ভারতের মনোভাবে একটা বিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত  মো. জমির। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় এ নিয়ে কিছু আলোচনা হতে পারে।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির ‘সম্পাদকীয়’ শিরোনামের  আলোচনায় (টকশো) অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আরও ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলকাতার বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে দুই দিনের সফরে শুক্রবার সকালে পশ্চিমবঙ্গ গেছেন। বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করতে কলকাতায় এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে শেখ হাসিনার।

তবে শেখ হাসিনার শান্তি নিকেতন সফরকে রাজনৈতিকীকরণ করা ভুল হবে বলে মনে করেন মো. জমির। বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে সন্মাননা এবং ডি-লিট ডিগ্রি পাবেন। বাংলাদেশ ভবনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এককালীন ১০ কোটি রুপির স্থায়ী তহবিল গঠন করা হচ্ছে। এ অর্থ থেকে প্রতিবছর ১০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি করতে পারবে। এটা দুই দেশের জন্যই হেল্পফুল, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে।’

বড় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন জমির। এ ব্যাপারে তিনি সম্প্রতি কমনওয়েলথ সভায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। জমির বলেন, ‘সেখানে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে কথা হয়েছে। এবারের বৈঠকেও হয়তো দুই দেশের বিরাজমান সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু আমি মনে করি না, এখানে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সম্ভাবনা আছে।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বলেন, ‘অনেকেই বলছেন নির্বাচন নিয়ে কথা হবে কি না। হবে না। এখানে নির্বাচন নিয়ে কথা বলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গা সমস্যার কথা। আমি মনে করি সেখানে এটা নিয়ে আলোচনা হবে। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ভারতের একটা বির্বতন ঘটেছে। সুষমা স্বরাজ (ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ও তাদের পররাষ্ট্রসচিব যখন এসেছিলেন, তখন আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল। ভারত এগোচ্ছে।’

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের মনোভাবের কথা বলতে গিয়ে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ভারত কিছু কিছু ক্ষেত্রে বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যে সম্পর্ক এগোচ্ছে তাতে তারা চিন্তিত। ভারত চিন্তা করছে এটা ঠিকই, কিন্তু আমরা যদি বিআইসিএমের কথা চিন্তা করি তাহলে সেখানে চীন একটা অগ্রাধিকার ভূমিকা পাবেই।’

প্রধানমন্ত্রীর পশ্চিমবঙ্গ সফরে কী কী আলোচনা হয়েছে সেটা না জানার আগে এ সফরের বিশেষ কোনো তাৎপর্য তারা দেখছেন না বলে জানান অনুষ্ঠানের আরেক আলোচক বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, ‘এ সফরের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের ছবি ও রবি ঠাকুরের ম্যুরাল উদ্বোধন হবে। আসামের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শিলচরে আমাদের বঙ্গভবনের আদলে একটা ভবন আছে। এটাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাসের বাস্তবতার নিরিখে এটা আমাদের অভিন্ন বাংলা সংস্কৃতির অংশ।’

আলাল বলেন, ‘চোখের ভিতর একটা পাপড়ি পড়লে আমাদের যেমন অস্বস্তি হয়, ঠিক তেমনি ভারতের সঙ্গে অনেকগুলো অস্বস্তির সম্পর্কে রয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পরীক্ষিত বন্ধু ভারত, এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু কালের পরিক্রমায় যৌথ পানি বণ্টন প্রক্রিয়া নিষ্ক্রিয়। সর্বোপরি গত ১০ বছর ধরে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যে আশার বাণী আমাদের শোনাচ্ছেন এর কোনো বাস্তবতা দেখলাম না আমরা।’

‘কূটনৈতিক বিষয়ে একটা ব্যাপারে আলোচনা করা উচিত’, বলেন আলাল, ‘ভারতসহ আন্তর্জতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে- আসামে ১ কোটির বেশি মুসলমানের তালিকা করা হয়েছে, যাদের বের করে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়টা কমনওয়েলথ সম্মেলনের সময় আমাদের প্রধানমন্ত্রী সাইডলাইনে এড্রেস করার কোনো খবর নেই। এবারও আলোচনা হবে কি না জানি না। তিস্তা নিয়ে যত নাটক হয়েছে, বিশেষ করে দীপু মনি সাহেব যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন গ্যারান্টি ক্লজ হয়ে গেছে, এলেই স্বাক্ষর হবে। কিন্তু হলো না। তারপরও বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে কিন্তু ফল হলো না কিছু।’

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। ‘রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত ভারত, চীন ও রাশিয়া। তিনটি দেশের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন একই সুরে প্রবাহিত হয়। কিন্তু সেই জায়গায় আমরা ভালোভাবে এড্রেস করতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রী যদি এখন কিছু ভালো ফলাফল নিয়ে আসতে পারেন তাহলে মনে করব শান্তির বারতা বইতে শুরু করেছে। নাহলে শান্তি নিকেতনের মধ্যে শান্তি আটকে থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রীর চলমান পশ্চিমবঙ্গ সফর সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে মনে করেন অন্য আলোচক জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। তিনি বলেন, ‘সেখানে “বাংলাদেশ ভবন” নামে একটা ভবন করা হয়েছে। এটা বন্ধুত্বের প্রতীক। এ সফরে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়া তিস্তার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনা যে হবে না সেটা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। যারা এটা নিয়ে আগ বাড়িয়ে বলছেন তারা বেশি বলছেন। বেশি বলার একটা অর্থ আছে- বেশি বলে তারা কোনো দাওয়াত পায় কি না কিংবা পরবর্তীতে কোনো সুবিধা পায় কি না। এটা নিয়ে বারবার বলে লাভ নাই।’

এ সময় কাজী ফিরোজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিং যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছিলেন তিস্তা চুক্তি হয়ে যাবে, মমতা ব্যানার্জি আসতেছেন। আমরা যখন ভিতরে ঢুকলাম তখন মনোমোহন সিং বললেন মমতা ব্যানার্জি আসছেন না।’

ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ভালো সম্পর্ক, আমরা তা বজায় রাখতে চাই। ভারতের সঙ্গে আমাদের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ইচ্ছা করলে তারা তা কমিয়ে আনতে পারে। আমরা যতই সীমান্ত চুক্তির কথা বলি না কেন, ভারতের  বিএসএফ সীমান্তে আমাদের মানুষকে পাখির মতো গুলি করে। শান্তি নিকেতনে শান্তি অশান্তি কোনোটাই হবে না। এখানে শুধু বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন হবে।’

এ সময় জাতীয় পার্টির নেতা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত, চীন ও রাশিয়ার অসহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত, চীন ও রাশিয়া আমাদের তেমন সহযোগিতা করেনি। আইপিও সম্মেলনে তারা আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তবে এ সফরে (প্রধানমন্ত্রীর পশ্চিমবঙ্গ সফর) আমাদের বড় অর্জন হলো বাংলাদেশ ভবন। ভারতের মতো স্বাধীন দেশে আমাদের একটা ভবন থাকবে, সেখানে বঙ্গবন্ধুর মূর‌্যাল থাকবে, আমরা গেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করব।’

(ঢাকাটাইমস/২৫মে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত