শেরপুর-১: আ.লীগে অস্থিরতা বিএনপিতে বিশৃঙ্খলা

শেরপুর প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৮, ০৮:৪২

আগামী নির্বাচন ও দলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগে বিরাজ করছে অস্থিরতা। ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে দলের ভেতর নেতাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা চলছে। ফলে বহু ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে দলটি। এখন কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নেতারা ভাগ হয়ে একই নামে দুটি অফিস খুলে সভা-সমাবেশ করে একে অন্যের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন।

অন্যদিকে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে পিছিয়ে আছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে ব্যর্থতার কারণে। সাংগঠনিক কার্যক্রমও চলছে ঢিমেতালে। এ কারণে দলটিতে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা।

আর মহাজোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখে নির্বাচনী মনোনয়ন নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতারা এক ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। বামপন্থী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা ও কর্মকা- সাধারণ মানুষের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হচ্ছে না।

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানাভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তাদের এ ধরনের তৎপরতায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের কদর বেড়ে গেছে। শেরপুরের তিনটি সংসদীয় আসনের সবই এখন আওয়ামী লীগের দখলে। আওয়ামী লীগ যেমন আসন ধরে রাখার চেষ্টা করবে, তেমনি বিএনপি চাইবে জয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করতে পারলে শেরপুরের তিনটি আসন আওয়ামী লীগের দখলেই থেকে যাবে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় পুরনো দ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেরপুর আওয়ামী লীগে সুবাতাস বইতে শুরু করে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলে কমিটি গঠন, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নসহ বিভিন্ন কারণে দলে বিরোধ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এর এক পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, শেরপুর সদর আসনের এমপি হুইপ আতিউর রহমান আতিক ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার পাল। অন্য পক্ষে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমান এবং সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানু।

জেলা আওয়ামী লীগের এ দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও। এখন কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নেতারা ভাগ হয়ে এলাকাভিত্তিক সভা-সমাবেশ করে পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটান। শহরের চকবাজারে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলেছেন হুইপ আতিক। একই নামে ছানু-রুমানের নেতৃত্বে খরমপুর মোড়ে খোলা হয় আরেকটি নতুন কার্যালয়।

এখন নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে দুই পক্ষের শহরময় মিছিল আর স্লোগানে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক পরিবেশ। দেওয়া হয় হরতালের মত কর্মসূচি। অনেক সময় দুই পক্ষকে সামাল দিতে গিয়ে শহরের মাঝখানে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টাও করছে। দুই পক্ষের  রেষারেষিতে ঘটছে সহিংসতার ঘটনা।

দুই পক্ষের প্রভাব বিস্তারের রেষারেষিতে পক্ষ ছাড়ার ঘটনাও ঘটছে। হুইপ আতিকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে তার পক্ষ ছেড়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার। তিনি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে এলাকার দুই শতাধিক নেতা-কর্মীকে নিয়ে যোগ দেন রুমান-ছানু বলয়ে।

হুইপ আতিকের বলয় ছাড়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে অ্যাডভোকেট রফিকুল স্লোগান তোলেন- ‘আতিক ছাড়া নৌকা চাই, ছানু-রুমান ছাড়া উপায় নাই’। সেই সঙ্গে তিনি ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতাদের স্থান নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে  জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানের দাবি জানান।

রুমান-ছানুর অনুসারীদের নানা অভিযোগ হুইপ আতিকের বিরুদ্ধে। সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য ছানোয়ার হোসেন ছানু বলেন, ‘আতিক সাহেব পেছন থেকে কলকাঠি নাড়েন, এলাকাভিত্তিক বিরোধ বাধানোর চেষ্টা করেন।’
জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রৌহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম মিজুর অভিযোগ, আতিক হুইপ হওয়ার পর তার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে জামাত-বিএনপির লোকদের বিভিন্ন কমিটিতে স্থান দিয়েছেন।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ সুজন ও একই বছরের ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ কর্মী ও জেলা পরিষদ সদস্য জাকারিয়া বিষু হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিপক্ষের হাত দেখছেন হুইপ আতিক। ছানোয়ার হোসেন ছানু ও রুমানকে শেরপুরে স্থান দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন হুইপ আতিক। তিনি আগামী দিনে শেরপুরের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে তার হাত শক্তিশালী করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।     

দুই পক্ষের জেদাজেদির এখনই লাগাম না টানলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হানাহানি বাড়ার পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন না করার ফলেই দলটি এখন দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছে।’

দলের ভেতরে কোন্দল থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে এখনো হুইপ আতিকই এগিয়ে ব্েযল মনে করেন অনেক সাধারণ মানুষ। শহরের নবীনগর এলাকার সমাজকর্মী সানজিদা আক্তার বলেন, ‘এমপি আতিক বেশির ভাগ সময় এলাকায় অবস্থান করেন। উন্নয়ন কর্মকা-েও তার সুনাম রয়েছে। তবে দলে তার সমালোচনাও আছে। এরপরও সদর আসনে ভোটের রাজনীতিতে তিনি এখনো হিরো।’
তবে এবার এ আসনে মাঠে নেমেছেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানু।

বিএনপি

এদিকে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি সাংগঠনিক দিক থেকে এক বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।  প্রায় দেড় বছর হলো ইউনিয়নগুলোর আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে। কোথাও ৭-৮ সদস্যের কমিটি, আবার  কোথাও আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক দিয়ে দল চলছে। শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা ও পৌরসভা বাদে একই অবস্থা অন্য তিন উপজেলা কমিটির ক্ষেত্রে।

প্রায় আট বছর পর ২০১৪ সালের মে মাসে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর পার হয়ে যায় তিন বছর। দলীয় কোন্দলের কারণে তখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যায়নি। গত বছরের জানুয়ারি মাসে জেলা বিএনপির সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যায়নি।

দলের এ অবস্থার প্রতিফলন রয়েছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে। জেলা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের আহ্বায়ক কমিটি ৯ বছর ধরে রয়েছে। জেলা যুবদল, ছাত্রদল, মহিলা দল এসব অঙ্গসংগঠনেরও আংশিক বা আহ্বায়ক কমিটি হয়ে আছে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে। কোনোটারই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি; অথচ সবই এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। উপজেলাগুলোতেও চলছে একই অবস্থা।

জেলা বিএনপির সম্মেলনে সাবেক এমপি মাহমুদুল হক রুবেল সভাপতি ও ব্যবসায়ী হযরত আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অনেক নেতাই বলেছেন, দলে নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। ফলে একধরনের সাংগঠনিক স্থবিরতা চলছে দলে। তাছাড়া মামলা-মোকদ্দমায় আদালতে হাজিরা দেওয়া, কর্মসূচি পালনে সরকারি বাধা এসব কারণেও কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পালন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না দলটির জন্য।

কিছুদিন আগেও জেলা বিএনপিতে দুটি পক্ষ সক্রিয় ছিল। এক পক্ষে ছিলেন বর্তমান সভাপতি মাহমুদুল হক রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী। অন্য পক্ষে জেলা বাস-কোচ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম স্বপন ও প্রয়াত সভাপতি সাইফুল ইসলাম কালামের ছেলে মামুনুর রশিদ পলাশ। কিন্তু এই বিভেদ এখন অনেকটাই প্রশমিত হয়ে এসেছে। তবে দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে ফায়দা হাসিলের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই বলেন, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেও ব্যবসায়ী হযরত আলী দলের সব ধরনের নেতাকর্মীকে এখনো আস্থায় আনতে পারেননি। তৃণমূল পর্যায়ে তার যোগাযোগ কম। তিনি টাকা দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করেন। ভোট পেতে হলে হযরত আলীকে জনসাধারণের কাতারে আসার আহ্বান জানান তিনি।  

বিএনপিতে এখন উদ্যোক্তা ও মেধার অভাব বলে মন্তব্য করেন জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মামুনুর রশিদ পলাশ। ৪৪ বছর ধরে শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষের কোনো প্রার্থী নেই। জোটের রাজনীতির কারণে এটি জামায়াতের কাছে ছাড় দিতে হয়েছে।

আরেক সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, দলে নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় একধরনের সাংগঠনিক স্থবিরতা বিরাজ করছে। ড্রয়িংরুমে বসে দল চালানোর চেষ্টা চলছে এমন মন্তব্য করে স্বপন বলেন, দলে এখন পদ-পদবি বিক্রি হচ্ছে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ‘শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীতে আমাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি রয়েছে।’ বিএনপিতে পদ-পদবি বেচাকেনার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যারা নির্বাচিত হতে পারেনি, তারা মনের ক্ষোভে এসব কথা বলতে পারে।’

এ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দলটির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী এগিয়ে আছেন। দলের অনেক নেতাই বলেছেন, হযরত আলী নেতাকর্মীদের নানাভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বিপদে-আপদে পাশে থেকে কাজ করছেন।

হযরত আলী বলেন, ‘দলের নেতৃবৃন্দ যদি আমাকে চান, তবে আমি নির্বাচনের মাঠে আছি, থাকব।’

এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন তৌহিদুর রহমান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। তবে জোটগত নির্বাচনের কারণে বারবার জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া হতো আসনটি। শোনা যাচ্ছে, জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি হওয়ায় তার ছেলে ইকবাল হাসান জামানকে এ আসনটি ছেড়ে দিতে পারে বিএনপি।

মামলা-মোকদ্দমা আর পুলিশের ধরপাকড়ে জেলায় জামায়াতের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। তারা সঙ্গোপনে তালিমের নামে হঠাৎ হঠাৎ কিছু করতে চেষ্টা করে। কখনো বা জামায়াতের কিছু আদর্শের অনুসারী সংগঠনের ব্যানারে তারা একত্র হওয়ার চেষ্টা করে।

(ঢাকাটাইমস/২৬মে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত