মাদকের ‘হোতা’ আমিন হুদার বিচার প্রচলিত আইনেই

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৭ মে ২০১৮, ১০:১৫ | প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৮, ০৮:৪৫

মাদকের মামলাগুলোর বিচার করা যাচ্ছে না, আর রায় হওয়া বেশিরভাগ মামলার আসামিরা যখন ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে, তখন প্রায় এক যুগ আগে গ্রেপ্তার হওয়া আমিন হুদার কারাদণ্ড হওয়া বলছে, প্রচলিত আইনে মাদক বিক্রেতাদের বিচার অসম্ভব নয়।

২০০৭ সালে গুলশানের একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তার হন আমিন হুদা। পাঁচ বছরে তার বিচার শেষ করে ৭৯ বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। দুই মামলায় অবশ্য তাকে ২৮ বছরের মতো কারাভোগ করতে হবে। যার মধ্যে ১১ বছর এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে ৭০ জনেরও বেশি প্রাণহানির ঘটনায় সামনে এসেছে মাদক মামলার বিচারের জটিলতার বিষয়টি। পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদকের মামলার বিচার খুবই কঠিন। কারণ বেসরকারি সাক্ষীরা হাজির হতে চান না। আবার তদন্ত কর্মকর্তারাও একেকজন অনেকগুলো মামলায় প্রতিবেদন দিয়েছেন। কিন্তু তাদের বদলির চাকরি। আদালতের সমনে তারাও সময় মতো হাজির হতে পারেন না।

মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে যারা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হচ্ছেন তারা সবাই বহু মামলার আসামি। তাদের কেউ ছিলেন পলাতক, কেউ জামিনে। কিন্তু তাদের বিচার শেষ করা যাচ্ছে না। আর পুলিশের রেকর্ড বলছে, কারাগারের বাইরে এলেই তারা আবার মাদকের কারবারে জড়িয়ে গেছেন।

তবে আমিন হুদার বিচারের উদাহরণ টেনে মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলছেন, তার মতো একজন বড় মাদকের কারবারির বিচার হলে অন্যদেরও হওয়া সম্ভব।

আমিন হুদাকে ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর গুলশানের একটি বাড়ি থেকে ৩০ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। সেদিন গ্রেপ্তার হন তার কর্মচারী আহসানুলও। পরে হুদার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গুলশানের আরেকটি বাসা থেকে ১৩৮ বোতল মদ, পাঁচ কেজি ইয়াবা বড়ি (সংখ্যায় ১ লাখ ৩০ হাজার) এবং ইয়াবা তৈরির যন্ত্র ও উপাদান উদ্ধার করা হয়।

সে সময় দেশে ইয়াবার বিস্তার কেবল শুরু হয়েছে, তার আসক্তির মধ্যে প্রথম সারিতে ছিল ফেনসিডিল। আর গত ১১ বছরে ফেসনিডিলের আসক্তির বদলে এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবার আসক্তি।

কাশের সিরাপ ফেনসিডিল আসত ভারত থেকে, আর ইয়াবার চালান প্রধানত আসে মিয়ানমার থেকে। অর্থাৎ আমিন হুদা এই কারবারে জড়িয়েছিলেন প্রথম থেকেই।

আমিন হুদা আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাগ্নে এবং এম বি মাল্টিকেয়ার টেকনোলজি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন।

গ্রেপ্তারের বছরেই পরে ২৬ অক্টোবর দুই আসামির বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা হয়। ওই বছরেরই ২৭ নভেম্বর র‌্যাবের উপ-পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

দুই মামলার একটিতে ২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি এবং ৩০ জানুয়ারি অন্যটিতে আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। ঢাকার আদালতে দুই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৩৮ জন সাক্ষ্য দেন।

দুটি মামলায় ২০১২ সালের ১৫ জুলাই আমিন হুদার মোট ৭৯ বছরের সশ্রম কারাদ- হয়। পাশাপাশি তিনি ও তার সহযোগীর সাত কোটি ৫৫ লাখ টাকা জরিমানাও করেন ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের বিচারক।

চলতি বছরের ৪ মে থেকে মাদক বিরোধী অভিযানে নামে র‌্যাব ও পুলিশ। শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৭০ জনেরও বেশি সন্দেভাজন মাদক বিক্রেতা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল ও বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে এই অভিযানের তীব্র নিন্দা করা হচ্ছে। তারা ‘বন্দুকযুদ্ধ’কে বিচার বহির্ভূত হত্যা দাবি করে প্রচলিত আইনে বিচার করার দাবি জানিয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মী মোহাম্মদ নূর খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তাদের (আইন শৃঙ্খলা বাহিনী) কাছে যদি মনে হয় যে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কেউ স্বাক্ষ্য দিতে আসে না, তারা জামিনে বেরিয়ে যায়, তাহলে বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করুক। এভাবে বিচারবর্হিভূত মানুষ হত্যা কোনভাবেই কাম্য নয়।’

ঢাকা জেলা জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবুও মানছেন জটিলতা থাকলেও প্রচলিত আইনে মাদকের কারবারিদের বিচার সম্ভব।

স্বাক্ষীরা স্বাক্ষ্য দিতে আসে না, এমন দাবির বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘স্বাক্ষীদের আদালতে হাজির করা পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ সেটি করবে। আর স্বাক্ষীরা একেবারে আসছে না, এটাও ঠিক না। স্বাক্ষ্য দিচ্ছে, বিচারও হচ্ছে, প্রতিদিন মামলার রায়ও ঘোষণা হচ্ছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাক্ষীদেরকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। কিছু ব্যতিক্রম তো থাকবেই।’ 

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম সিকদার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘কিছু সমস্যা তো রয়েছে। আমাদের দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ সালের। যে আইনে যে কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্যরা মাদক বিক্রেতাদেরকে মাদক ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে। তবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের সদস্যরা মাদক ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পাওে না। তবে এই আইনের কিছুটা সংশোধন হচ্ছে।’

অন্য এক প্রশ্নে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাদক বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করতে যান। সেখানে যা হয়, সেটা তারাই মোকাবেলা করেন। আর আইন তো এই সুযোগ দিয়েছে, আপনার উপরে কেউ আঘাত করলে আপনিও আত্মরক্ষা করতে পারবেন। এটাও ঠিক আবার প্রচালিত আইনেও মাদক ব্যবসায়ীদের সাজা হচ্ছে এই উদাহরণও আছে।’

তবে সরকার ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ অবশ্য স্বীকার করছে না। বলছে, তারা মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি করে তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আর গ্রেপ্তারে গেলে বা গ্রেপ্তার করে ফেরার পথে বা অভিযানে গেলে সশস্ত্র লোকজন হামলা করে। আর পাল্টা গুলিতে নিহত হচ্ছেন সন্দেহভাজন মাদকের কারবারিরা।

এই বর্ণনা পুলিশ বা র‌্যাব দিচ্ছে সেই ২০০৪ সাল থেকেই। বিএনপি সরকারের আমলে র‌্যাব গঠনের পর প্রথমে ক্রসফায়ার এবং পরে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের এমন দাবি এসেছে সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে। মানবাধিকার কর্মীরা অবশ্য এই বর্ণনায় কখনও আস্থা রাখেননি।

ঢাকাটাইমস/২৬মে/এএ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত