তবুও অরক্ষিত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক

রাইয়ান বিন আমিন, জাবি প্রতিনিধি
| আপডেট : ২৬ মে ২০১৮, ১৪:১৯ | প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৮, ১৩:২৩

আজ ২৬ মে। এক বছর আগে এদিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আরাফাত ও রানা নিহত হন। এতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এ দূর্ঘটনার বিচার, অরক্ষিত মহাসড়কের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাসহ সাতদফা দাবিতে সড়ক অবরোধ করে।

দাবিগুলো উপেক্ষা করে সেসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে। সেই হামলার কারণ জানতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে গেলে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সাথে কোনও কথা না বলে উল্টো তার বাসভবন ভাংচুর ও শিক্ষক লাঞ্চনার অভিযোগ এনে ৫৪ শিক্ষার্থীর নামে মামলা ঠুকে দিয়ে মধ্যরাতে ৪২ ছাত্র-ছাত্রীকে জেল-হাজতে পাঠান।

নানা সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন মামলা প্রত্যাহার করে নিলেও তার জন্য শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশনসহ চরম মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু যে মহাসড়কের নিরাপত্তার জন্য এতো মূল্য তার নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হয়েছে? প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাসেরই বা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে? সতর্কতা বেড়েছি কি শিক্ষার্থীদের মধ্যে? এক বছর পর এসব প্রশ্নের সমীকরণ মিলানোর চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।

সাইনবোর্ডেই ঝুলছে মহাসড়কের নিরাপত্তা:

‘বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।’ ‘গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কি. মি.।’ ‘রাস্তা পারাপারে ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার করুন।’ রানা ও আরাফাতের মৃত্যুর পর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সিএন্ডবি থেকে বিশমাইল পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে গাড়ী চালক ও শিক্ষার্থীদের সতর্কতা স্বরূপ এরকম বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা নির্দেশিকার সাইনবোর্ড লাগিয়েছিল বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এক বছর পার হলেও মহাসড়কের নিরাপত্তা এখনও সাইনবোর্ডেই ঝুলে আছে। প্রশাসন যেমন সাইনবোর্ড লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে তেমনি শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপত্তাটুকু দিব্যি ভূলে যাচ্ছেতাই ভাবে রাস্তায় চলাচল করছে।

বিশ^বিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেইট, ডেইরি গেইট ও মীর মশার্রফ হোসেন হল গেইটে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। প্রান্তিক গেইটের সেই ক্যামেরা অনেকটাই গাছের আড়ালে পড়ে রয়েছে। আর ডেইরি ও মীর মশার্রফ হোসেন হল গেইটে সিসি ক্যামেরা শুধু নামে মাত্র লাগানো হয়েছে।

মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রনের জন্য সিএন্ডবি এলাকায় পুলিশ বক্স বসিয়ে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রন করা হবে বলে আশ^াস দিয়েছিল প্রশাসন। যেখানে গাড়ীর সর্বোচ্চ গতিসীমা হওয়ার কথা ছিল ৩০ কি. মি. সেখানে সর্মনি¤œ গতিসীমা থাকছে ৩০ কি. মি.। এই গতি নিয়ন্ত্রনের জন্য ছিটেফোটা উদ্যোগও নেই প্রশাসনের। ফলে সব চলছে আগের অবস্থায়।

প্রশাসনের দায়ের করা সেই মামলার অন্যতম ভূক্তভোগী সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসাইন অনেকটা ক্ষোভের সাথে জানান, ‘প্রশাসন যদি আামদের ছাত্র মনে করত তাহলে আমাদের নিরাপত্তাটুকু নিশ্চিত করত। এক বছরেও তারা কোন কিছইু করেনি। অবস্থা এমন হয়েছে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার জন্যও কোন দাবি তোলা যাবে না।

তবে মামলা প্রত্যাহার হলেও এখনও প্রত্যাহারের কোনও কপি তারা হাতে পাননি বলে জানান ভূক্তভোগী এই শিক্ষার্থী।

তবে এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক কোনও কথা বলতে রাজি হননি।

অন্যদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটক (ডেইরী গেইট) সংলগ্ন মহাসড়কের ডিভাইডার ভেঙ্গে ফেলে। কিন্তু দেড় মাসেও এটি মেরামত করার কোনও উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ডিভাইডারটি ছাত্ররা ভেঙ্গেছে বলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম ও তার প্রশাসনের কোনও কিছু করার নেই। ফলে তারা সেটি মেরামতের কোন উদ্যোগ নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। সেই সঙ্গে বিষয়টি দেখবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফলে তাদের নজরে আনার জন্য বেশি বেশি ছবি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার পরামর্শ দেন এই প্রতিবেদককে।

তবে বিষয়টি তাদের নজরে আছে। দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলী মনসুরুল আজীজ।

টাকার অপেক্ষায় ফুটওভারব্রিজ:

বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি গেইটের মধ্যে ডেইরি গেইট ও প্রান্তিক গেইট দিয়েই শিক্ষার্থীদের চলাচল সবচাইতে বেশি। অধিকাংশ শিক্ষার্থী এ দুটি গেইট দিয়ে চলাচল করলেও প্রান্তিক গেইটে কোনও ফুটওভারব্রিজ নেই। শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। আন্দোলনের মুখে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের আশ্বাস দিলেও এখনো পর্যন্ত ব্রিজ নির্মাণের ছিটেফুটা উদ্যোগও চোখে পড়েনি। তবে সম্প্রতি এখানে ওভারব্রিজের জন্য টেন্ডার হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, টেন্ডার হয়ে গেছে। দুই কোটি ৭০ লাখ টাকার বাজেট বরাদ্দ হয়েছে। টাকা পেলে ঈদের পরই কাজ শুরু করা হবে। তবে এতো সময় লাগার কারণ হিসেবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্পকে দায়ী করেন এই কর্মকর্তা।

অন্যদিকে প্রান্তিক গেইটে রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা চাইলে সময় নিয়ে নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারেন। কিন্তু এখানে নিত্যদিন দেখা যায় একটি চিত্র। দ্রুতগতিতে পার হচ্ছে সবধরনের যান্ত্রিক যান, এর মধ্যেই কখনো একদল হয়ে আবার কখনো আলাদাভাবে পথচারী হাঁটা শুরু করবে। গাড়িও চলতে থাকবে, এর মধ্যেই পার হবে পথচারীর স্রোত।

হুঁশ ফিরবে কবে?

এটা নেই ওটা নেই বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের কোনও শেষ নেই। কিন্তু সংকট আর অনিয়মের সব দায় প্রশাসনের উপর চাপিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের দায়িত্বটুকু এড়িয়ে চলেন শিক্ষার্থীরা। ফলে তাদের হাতে অনেক সমস্যার প্রাথমিক সমাধান থাকলেও বদলায় না আচরণ বদলায় না মহাসড়কের চিত্র।

সম্প্রতি কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটকসংলগ্ন মহাসড়কের ডিভাইডার ভেঙ্গে ফেলায় একদল শিক্ষার্থীর বেশ সুবিধাই হয়েছে। তারা এখন উন্মুক্ত মহাসড়কে মাথার উপর ফুটওভারব্রিজ রেখে দ্রুতগামী গাড়ির দিকে হাত উঁচিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে পারছে। এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাই এখন সবচেয়ে বেশি। গত ১৬ মে দুপুর দেড়টার দিকে ডেইরী গেইটের পদচারী সেতুটির উপর ১০ মিনিট অবস্থান করে দেখা যায়, ওই সময়ের মধ্যে মাত্র ১৭ জন পথচারী সেতুটি ব্যবহার করেছেন। ঠিক একই সময়ে প্রায় অর্ধশত পথচারী নীচ দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়েছেন। ২১ মে বেলা ১২টার দিকে ওই পদচারী সেতুটিতে গেলে দেখা যায় একই চিত্র। ১২ মিনিটে সেতুটি ব্যবহার করেছেন মাত্র ১০ জন। আর নীচ দিয়ে পারাপার হয়েছেন প্রায় ৩০ জন।

একাধিক শিক্ষার্থীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ‘সময় স্বল্পতার’ বিষয়টি সামনে এনে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

রাস্তায় কোনও দূর্ঘটনা ঘটলে দাবি উঠে ওভারব্রিজের। ডেইরী গেইটে শোভা পায় ওভারব্রিজ। কিন্তু তা ব্যবহার হয় না বললেই চলে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, প্রান্তিক গেইটে ওভারব্রিজ করার পর তার সদ্বব্যবহার নিয়ে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মহাসড়কের যোগাযোগের জন্য প্রান্তিক গেইটটি প্রধান হওয়ায় সেখানে কোনও রোড ডিভাইডার নেই এবং দেওয়া সম্ভবও নয়। ফলে প্রশাসনকে তাকিয়ে থাকতে হবে শিক্ষার্থীদের সচেতনতার দিকে।

বিষয়টি নিয়ে অনেকটা হতাশ উপাচার্যও। বলেন, শিক্ষার্থীরা সচেতন না হওয়া পর্যন্ত আমরা যত উদ্যোগই নেই না কেন তা ভেস্তে যাবে। তারা সব বুঝার পরও যদি এভাবে চলাচল করে তাহলে দূর্ঘটনা ঘটবে সেটাই স্বাভাবিক। আর কোনও দূর্ঘটনা ঘটলে তার দায় আমাদের উপরই আসে। এজন্য তিনি সচেতনতার উপর জোর দেন।

আর শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনে করেন, শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো যেতে পারে। 

মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যতটা সোচ্চার, নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার কথায় তারা ঠিক ততটাই উদাসীন। ফলে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ না কেউ জীবন দিচ্ছেন। কিন্তু এর কোনও প্রতিকার হচ্ছে না। ফলে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আর যেন কোনো প্রাণ ঝরে না যায় সে ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরই করতে হবে।

(ঢাকাটাইমস/২৬মে/প্রতিনিধি/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত