সংবাদ-সাংবাদিকতা হোক মানবিক

দিদার মালেকী
| আপডেট : ২৮ মে ২০১৮, ১৭:০০ | প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৮, ১৯:২২

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আর সব কিছুর মতোই বদলে গেছে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা। বলা হয়ে থাকে— এ পেশা রাষ্ট্র মায় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একদা পেশাদার সাংবাদিকরা সুযোগ পেলেই সেটা স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলতেন না। এখন দিনকাল বদলে গেছে। ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এ পেশাটির সমস্ত নিয়ম-নীতিও বদলে যাচ্ছে ক্রমশ।

বৈদ্যুতিন মাধ্যমের (ইন্টারনেট) বদৌলতে সংবাদ এখন সহজলভ্য এবং ততোধিক সস্তা হয়েছে। আবার খবরের সংজ্ঞাও বদলে গেছে অবাক করার মতো। এটা এমন এক সময়— যখন বুঝে ওঠা মুশকিল কোনটা আসল খবর আর কোনটা ভুয়ো। সবকিছুতেই নির্ভর হয়ে পড়া জাতিকে আসল নকলের ফারাকটাই বা চেনানোর দায়িত্ব নেবে কে?

তার ওপর চটকদার শিরোনাম, ভুয়ো তথ্য, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং বিকৃত যৌনতার উপর তৈরি করা হচ্ছে সংবাদ। সহজলভ্য হওয়ায় সেসব সংবাদ গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে মানুষ। এই যে সাংবাদিকতার বিকৃতি, উত্তর-সত্য-নির্ভর রাজনীতি তার নেতিবাচক প্রভাবে বিগড়ে যাচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে বিকল হয়ে যাচ্ছে সমাজের অনেক সুস্থ রীতি-নীতিও। আর এই যে মানুষের কৃত সবচেয়ে মহৎ পেশাটির সংজ্ঞা বদল— কে রুখবে এই বাড়বাড়ন্ততা?

এই চিত্রটা বৈশ্বিক। এর বাইরে নেই বাংলাদেশও। ভুয়ো খবরের নিদারুণ থাবা আছর করেছে আমাদের অনেক জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমেও। তার বেশ কয়েকটি নজিরও ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি। ফলে পেশাদার সাংবাদিকদের ভাববার সময় এসেছে— কোনও ঘটনার ওপর শুধু সত্য পরিবেশন করতে হবে নাকি মালিকপক্ষের ফরমায়েসি সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। কিংবা নিছক চলতি জোয়ারে গা ভাসিয়ে চটক মেরে চমকে দিতে হবে।

তবে এখনও আশার আলো যে— বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় শ্রেণী বিভাজন ওই অর্থে ঘটেনি। যেটি পাশ্চাত্যে ঘটেছে অনেক আগে। উন্নত বিশ্বে ‘মিডিয়া’ বলতে এখন বুঝায় ‘কর্পোরেট হাতের মুঠো’। মূলত সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ট মিডিয়াহাউজ কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত।

উদাহারণত বলা যায়, ব্রিটেনে টাইমস, টেলিগ্রাফ, এক্সপ্রেস ধনী ও শাসকশ্রেণীর মুখপত্রের কাজ করে। কদাচিৎ তারা সাধারণ মানুষের কথা বললেও, সাধারণের স্বার্থ ও অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং সূক্ষ্মভাবে সেসবের বিরোধিতা করে।

অন্যদিকে ‘মিরর’ স্বল্পশিক্ষিত এবং কর্মজীবী সাধারণ মানুষের ট্যাবলয়েড পত্রিকা। আবার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর বামঘেঁষা মিররের প্রভাব  ঠেকাতে আছে অল্প দামের ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘সান’। রগরগে যৌনতা, সাসপেন্স এবং সত্য-অসত্য উত্তেজক ছবি ও খবর প্রকাশ করে এ কাগজটি শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে তাদের রুটি-রুজির আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়।

আবার সেই দেশটিতে শিক্ষিত ও উদারপন্থী মধ্যবিত্তের জন্য ‘গার্ডিয়ান’ আছে। এই কাগজটির প্রভাব রয়েছে মধ্যবিত্ত ব্রিটিশদের ওপর। ইংল্যান্ডে গণমাধ্যম নিয়ে প্রচলিত আছে নানাকথা। এমন একটা হলো— যারা দেশ শাসন করে তাদের মুখপত্র হল টাইমস, টেলিগ্রাফ। গার্ডিয়ান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট হলো দেশ শাসন করতে চাওয়াদের মুখপত্র। আর যারা কোনওদিন দেশ শাসনের সুযোগ পায় না, বরং শাসিত এবং নিপীড়িত, মিরর, মরনিং স্টার তাদের কাগজ।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে কেন্দ্র করে এ ধরণের অবস্থা এখনও দেখা যায়নি। দেশের সংবাদপত্র জগত ও সাংবাদিকতায় এমন বিভাজন তথা শ্রেণী-বিভক্তি হয়নি বলা চলে। যদিও এখানে অন্যরকম একটা বড় বিভাজন পরিলক্ষিত হয়। যেটি আবার বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়। আর সেটি হলো ‘সরকার-সমর্থক’ ও ‘সরকারবিরোধী’ গণমাধ্যম। যাদের দিকে আঙুল তোলা হয়, তার সবটাই মূলধারার। এর বাইরে সংবাদভিত্তিক আর যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের ভূমিকা ও কার্যক্রম উল্লেখ করার মতো নয়।

এবার বলি বদলে যওয়া গণমাধ্যমের কথা। এর মধ্যে প্রথমে আসবে অনলাইন গণমাধ্যম। বর্তমানে শত-শত অনলাইন নিউজ পোর্টাল। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে অন্যগুলোর নাম পাঠকরা জানেনই না। এগুলো আবার অধিকাংশই ফেসবুকসর্বস্ব। স্মার্টফোনের বদৌলতে এরা মানুষের কাছে মুহুর্তে সংবাদ পৌঁছে দিতে চায়। তবে সংবাদটা কীসের?

অনেকে নামের সঙ্গে ডটকম বসিয়ে দিয়ে অনলাইন পোর্টাল খুলছেন। সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকলেও এসব ডটকমের লোকেরা নানা জায়গায় সাংবাদিক পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর ফলে জনসমাজে আসল সাংবাদিকের জায়গাটি কলুষিত করছে এসব ভুয়া-সাংবাদিকের দল। ফলে কে সাংবাদিক আর কে সাংবাদিক নন বুঝতে বিভ্রান্তিতে পড়ছেন অপরাপর পেশাজীবীরা।

সাংবাদিকতা সম্পর্কে ন্যুনতম ধ্যান-ধারণা না থাকায় ভুলভাল আর মিথ্যা খবর পরিবেশন করে অনলাইনগুলো বোকা বানাচ্ছে সাধারণ পাঠককেও। এ ধরণের নিউজ পোর্টালকে নিবন্ধিত করে নীতিমালায় আনার কথা বলে আসছে সরকার। বাস্তবে এটার অগ্রগতিও থমকে আছে বলা যায়।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতার বিষয়টি ‘দেহে-প্রাণের’ মতো। সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের মান ধরে রাখতে এই বস্তুনিষ্ঠতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি। নয়তো একপক্ষের ‘বস্তুনিষ্ঠ’ সংবাদ অপরপক্ষের কাছে ‘নাশকতায় উসকানি’বলে প্রতিপন্ন হওয়া ঠেকাতে পারবে না রাষ্ট্রের এই ক্ষয়িষ্ণু স্তম্ভ।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, গবেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত