মাদকবিরোধী অভিযানে নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৮ মে ২০১৮, ১২:১২ | প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৮, ০৯:১৮
ফাইল ছবি

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে দেশের বিভিন্ন জেলায় র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। গতকাল পর্যন্ত এই সংখ্যাটি ছিল ৯৬ জন। গত রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এনিয়ে এই অভিযোগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১০৮ জনে।

রবিবার রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কুমিল্লায় দুইজন, পিরোজপুরে দুইজন, নাটোরে একজন, পাবনায় একজন, ঝিনাইদহে একজন, ঢাকায় একজন, মুন্সীগঞ্জে একজন, চাঁদপুরে একজন নিহত হয়েছেন। আর সাতক্ষীরায় মাদকসহ পাওয়া গেছে গুলিবিদ্ধ দুই লাশ।

পুলিশ ও র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী নিহতরা সবাই মাদক কারবারে জড়িত। তাদের সবার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় মাদকবিরোধী আইনে মামলা আছে।

প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের কাহিনি প্রায় একই রকম। ‘মাদকের কারবারি’কে নিয়ে অভিযানে বের হলে গুলি করে তাদের সহযোগীরা। আর গোলাগুলির এক পর্যায়ে নিহত হন সন্দেহভাজন মাদকের কারবারি। কখনও কখনও পুলিশের এক-দুই জন সদস্য আহতও হন।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই বর্ণনা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা করছেন। পুলিশ যেটাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বলছে, তারা এটাকে হত্যা বলছেন। তারা সন্দেজভাজনদের বিচারের মুখোমুখি করার পক্ষে।

এমনকি সরকারি দল আওয়ামী লীগের মধ্যেও এই অভিযান নিয়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কক্সবাজারের টেকনাফে সরকারদলীয় নেতা এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক নিহতের পর এই অভিযান থামাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আকুতি জানিয়ে খোলা চিঠি লিখেছেন কক্সবাজারের পৌর মেয়র মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী।

তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এই চিঠিটি তিনি পোস্ট করেছেন ফেসবুকে, আশা করছেন, তার নেত্রীর কাছে এই আহ্বান পৌঁছে যাবে।

এদিকে এই মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল। তাদের অভিযোগ, এই অভিযানে চুনোপুটিরাই মারা যাচ্ছে বা গ্রেপ্তার হচ্ছে। যারা মূল হোতা এবং রাঘববোয়াল তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে মনে করেন তারা। এমনকি সরকারদলীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে ক্ষোভ আছে জনমনে।

গত ৩ মে ঢাকায় র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো মাদকের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিতে বাহিনীটিকে নির্দেশ দেন। এরপর থেকে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে র‌্যাব। তাদের পাশাপাশি পুলিশ ও ডিবি পুলিশও অভিযানে মাঠে নামে।

প্রথম দুই-তিন দিন কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। র‌্যাবের অভিযান শুরুর পর প্রথম বন্দুকযুদ্ধ হয় ৭ মে রাতে; তাতে নারায়ণগঞ্জ ও কুষ্টিয়ায় একজন করে নিহত হয়। এরপর ৯ মে রাজশাহীতে নিহত হয় একজন।

১৪ মে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব প্রধান বেনজির আহমদ মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি আবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তার হুঁশিয়ারির পরই থেকে মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়।

সবচেয়ে বেশি নিহত হয় গত ২৫ মে শুক্রবার দিবাগত রাতে। ওই রাতে ১২ জন নিহত হয়। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নয়জন এবং তিনজন নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে নিহত হন।

গত শনিবার রাতে নিহত হয় ১১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, নোয়াখালী, ঠাকুরগাঁওয়ে একজন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। আর মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে দুইজন মারা গেছেন নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে।

সবমিলিয়ে গত ৪ মে অভিযান শুরু পর থেকে এখন পর্যন্ত ১০২ জন মাদক কারবারি নিহত হলেন।

কোন তারিখে কতজন নিহত

১৯ মে দিবাগত রাতে বরিশাল, ময়মনসিংহ, যশোর, টাঙ্গাইল, ফেনী ও দিনাজপুরে পুলিশের সঙ্গে ছয়টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এতে ছয়জন নিহত হয়েছেন।

২০ মে যশোরে মাদকের সঙ্গে জড়িত তিনজন নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে মারা যান। এছাড়া সেদিন রাতেই রাজশাহীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একজন, নরসিংদীতে একজন, ঝিনাইদহে একজন, টাঙ্গাইলে একজন; চুয়াডাঙ্গায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’একজন এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে একজন মারা যায়।

২১ মে দিবাগত রাতে নয় জেলায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ১১ জন। এর মধ্যে কুমিল্লা ও নীলফামারীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুইজন করে মোট চারজন এবং চুয়াডাঙ্গা, নেত্রকোণা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও দিনাজপুরে একজন করে নিহত হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন।

২২ মে দিবাগত রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ১০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কুষ্টিয়ায় দুইজন এবং জামালপুর, কুমিল্লা, ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গা, লালমনিরহাট ও রংপুরে একজন করে মোট আটজন নিহত হয়েছেন। আর গাইবান্ধা ও ফেনীতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন দুইজন।

২৩ মে দিবাগত রাতে কুমিল্লা ও ফেনীতে দুইজন করে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জ থেকে একজনসহ মোট ছয়জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। এছাড়া মাগুরায় দুইজন এবং সাতক্ষীরা ও কক্সবাজার থেকে দুইজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা চারজনের।

২৪ মে বৃহস্পতিবার বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত দেশের সাত জেলায় বন্দুকযুদ্ধে নয়জন নিহত হয়। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নেত্রকোণায় দুইজন এবং সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, কুমিল্লা, গাইবান্ধা ও শেরপুরে একজন করে মোট সাতজন নিহত হয়েছেন। আর রাজধানী ঢাকায় র‌্যাবের গুলিতে নিহত হয়েছেন একজন।

২৫ মে দিবাগত রাতে থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত দেশের আট জেলায় পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নয়জন নিহত হয়। আর মাদক বিক্রেতাদের নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে তিন জেলায় নিহত হয়েছেন তিনজন।

এদের মধ্যে কুমিল্লায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুইজন এবং ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও ও পাবনায় একজন করে নিহত হয়েছেন। দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন একজন করে। আর ফেনী, বরগুনা ও দিনাজপুরে একজন করে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে নিহত হন।

২৬ মে দিবাগত রাতে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, নোয়াখালী, ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে নিহত হয় নয়জন। এর মধ্যে টেকনাফ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হকও রয়েছেন। আর মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে দুইজন মারা যান নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে।

আর ২৭ মে দিবাগত রাতে কুমিল্লায় দুইজন, পিরোজপুরে দুইজন, নাটোরে একজন, পাবনায় একজন, ঝিনাইদহে একজন, ঢাকায় একজন, মুন্সীগঞ্জে একজন, চাঁদপুরে একজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আর সাতক্ষীরায় দুইজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে মাদকদ্রব্যসহ।

(ঢাকাটাইমস/২৮মে/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত