আকাশে বিলীন নীলা মিলুক প্রাণের সংসারে

ইফতেখায়রুল ইসলাম
| আপডেট : ২৮ মে ২০১৮, ১৫:০৯ | প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৮, ১৫:০১

ধরা যাক মেয়েটির নাম নীলা আর ছেলেটির নাম আকাশ। দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাদের পরিচয়। কান্নাজড়িত কন্ঠে নীলার অফিসে আগমন। পছন্দের মানুষের সঙ্গে বিয়ে করতে পরিবারকে রাজি করেছেন তিনি। এতে তার আনন্দিত হওয়ার কথা, কিন্তু তা না- তিনি কাঁদছেন! ফলে শরণ নেয়া পুলিশের।

আংটি বদলের পাঠ চুকেছে, কিন্তু পরিণয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আকাশের পরিবার! কিছু ক্রিয়া তার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া এবং শেষ পরিণতিতে বিয়ে ভেঙে যাওয়া! আমাদের সমাজে বরপক্ষগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবধারিতভাবে কনেপক্ষের উপর এক ধরণের চাপ প্রয়োগ করতে চায়। আর তার কারণ থাকে বিবাহের আয়োজন, দুইপক্ষের অতিথির সংখ্যার হ্রাস বৃদ্ধিকরণ, বিবাহ পরবর্তী অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতাসহ আরও নানা বিষয়। যার ফলে কনেপক্ষের শুধু বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না! তাদের কান্না হয়ে যায় বোবা কান্না।

চুপচাপ বসে থাকা নীলাকে আমার এক সহকর্মী পাঠায়। নীরবে অশ্রুজল বিসর্জন এবং নিজের বেদনার কাব্য বলে চলেছেন নীলা। পরিবারের অনুপস্থিতিতেই বলতে চেয়েছেন নীলা। কখনো পুলিশ পরিবারের চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠে হয়তোবা! তার কথা শুনছি আর বোঝাচ্ছি। দুইবার 'সুইসাইডাল এ্যাটেম্পট' নেয়া মেয়েটির জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে থাকে। ডাকা হয় আকাশ ও তার পরিবারকে।

দুইদিনের আটঘণ্টার কাউন্সেলিং থেকে উপলব্ধি এই যে, আকাশ আর নীলা একে অপরকে অপছন্দ করেন না! তাও থমকে আছে তাদের জীবন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। ভাইয়ের অনিশ্চিত মুখ, বেদনার ভারে জর্জরিত। মায়ের প্রতিচ্ছবি সব মিলিয়ে এ যেন এক অচেনা পথের যাত্রা!

আপনার, আমার কাছে মনে হতে পারে মেয়েটার ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে সকলের মানসিক অবস্থা এক নয়। অনেক ক্ষেত্রে ঠিক থাকে না সামজিক অবস্থানও। ঠিক এই জায়গায়টিতে এসেই আমরা থেমে যাই। তাই প্রখর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নীলা তার এ্যাংগেজমেন্ট রিং ফিরিয়ে এনেও আবার আকাশকেই পেতে চায়। আর আকাশ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় দ্বিধান্বিত। সেই দ্বিধা কেটে যায় দুইদিনের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায়!

হ্যা, আইনগত দিক থেকে এটি খুব বড় অর্জন নয়! কিন্তু যেখানে একজন মানুষের বেঁচে থাকা, দুজন মানুষের জীবন, দুটি পরিবারের সম্মান টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন চলে আসে- সেখানে অর্জন নয় বরং কিছু করার তাগিদটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। আপনার চোখের সামনে পরিতৃপ্ত মায়ের হাসি, ভাইয়ের নিশ্চিত মুখ আর মেয়েটির হাসিখুশি চেহারা যখন বারবার ভেসে উঠবে, তখন আপনার মনে হবে আপনার এ জীবন স্বার্থক।

এরকম হাজারো ব্যক্তিগত, পারিবারিক সমস্যা নীরবে সমাধা হয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক পুলিশের কল্যাণেই তা হয়ে উঠে। তারা লিখেন না, তারা বলেন না- তাই উঠে আসে না পত্রিকার পাতায়! অনেকে মনে করেন এটা তো দায়িত্ব, কি দরকার জানানোর! তাই আলোচনার টেবিলে বলাও হয় না আর।

দুইটি হাতের অনামিকায় আবারও যখন ভালবাসার আংটি উঠে, একটি জীবন যখন রক্ষা পায়, দুইটি মানুষ যখন এক হয়ে নীলাকাশ হয়ে যায়- তখন মনে হয় স্বার্থক এ জীবন, স্বার্থক এই বেঁচে থাকা।

নীলা ও আকাশের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে পাঁচ লাখ টাকার দেনমোহরে। আমার অফিসের স্টাফদের জন্য বর ও কনেপক্ষ চার কেজি মিষ্টান্ন এনেছে! আমরা চাই আকাশের মাঝে নীলা বিলীন হয়ে বিস্তৃত নীলাকাশ হয়ে উঠুক। বর ও কনের সুখী জীবনের প্রত্যাশা করছি।

লেখক: সিনিয়র সহকারি পুলিশ কমিশনার, ডেমরা জোন, ডিএমপি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

নির্বাচিত খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত