বন্দুকযুদ্ধে ‘অজেয়’ বাংলাদেশের র‌্যাব, পুলিশ

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ৩০ মে ২০১৮, ১২:৪৭ | প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৮, ০৮:৫২

গত ১৪ বছর ধরেই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যগুলো আমলে নিলে এটা বলতেই হবে বাংলাদেশের র‌্যাব বা পুলিশ বাহিনী ‘অজেয়’। কারণ, ‘যুদ্ধে’ তাদের পরাজয়ের কাহিনি নেই বললেই চলে।

একজন মানবাধিকার কর্মী বিষয়টিকে কটাক্ষ করে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গায়েবি প্রশিক্ষণ পেয়েছে হয়ত। তাই তারা সব সময় যুদ্ধে জিতে যায়।

২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে র‌্যাব গঠনের পর থেকে ব্যাপকভাবে ‘ক্রসফায়ার’ শুরু হয়। পরে যা রূপ নিয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। তবে ভাষাগত পরিবর্তনের পরও ঘটনার বর্ণনায় পরিবর্তন আসেনি বললেই চলে।

প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্দেহভাজন এবং তার সহযোগীরা গুলি করে, পাল্টা গুলিতে নিহত হয়েছেন ওই ‘অপরাধী’। অথবা ‘অপরাধীকে’ নিয়ে অভিযানে বের হলে তার সহযোগীরা হামলা করেছে আর দুই পক্ষেরর গোলাগুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন সন্দেহভাজন।

প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্দেহভাজন অপরাধী নিহত হয়েছেন। এক যুগেরও বেশি সময়ে কথিত এই গোলাগুলির পর সন্দেহভাজনদের পালিয়ে যাওয়া বা আহত হওয়ার ঘটনাও যে ঘটেনি, এমনও না, তবে সেটি একেবারেই বিরল।

একইভাবে গোলাগুলির পর অক্ষত অবস্থায় জীবিত ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে তার সংখ্যা এতটাই কম যে তা স্মরণে আনাই কঠিন।

মাদক বা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে এই বিপুল সাফল্যের মধ্যেই অবশ্য রাজধানীর গাবতলীতে এক পুলিশ সদস্যকে ছুরি হাতে সহকর্রীদের সামনেই হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

আবার ঢাকার আশুলিয়াতে তল্লাশি চৌকিতে হামলার মধ্যেই আবার অস্ত্র ও গুলি ফেলে রক্তাক্ত সহকর্মীকে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ সদস্যরাই।

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়াতেও সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি দুই জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা ও বেশ কয়েকজনকে কুপিয়ে আহত করে।

রাতের অভিযানে পুলিশ-র‌্যাবের বিস্ময়কর সাফল্য আসলেও দিনের এসব ঘটনায় সরকারি বাহিনীর ক্ষতি সব সময়ই প্রশ্নবোধক। অবশ্য শোলাকিয়ার দুই ‘জঙ্গি’র একজন পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে সঙ্গে সঙ্গে নিহত এবং অন্যজন আহত অবস্থায় ধরা পড়েন। পরে ধরা পড়া ওই ‘জঙ্গি’ও রাতের অভিযানে নিহত হন ‘বন্দুকযুদ্ধে’।

তবে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব পুলিশের এমন ব্যর্থতার খবর আসেনি। তবে কোথাও কোথাও বন্দুকযুদ্ধে বেশ কয়েকজন সদস্য ‘মৃদু’ আহত হয়েছেন। তবে তাদেরকে হাসপাতালেও থাকতে হয়নি।

আর দুটি ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন অক্ষত অবস্থায় প্রাণে বেঁচেছেন। ঠাকুরগাঁওয়ে র‌্যাবের গাড়ি থেকে গভীর রাতে পালিয়ে যান এক জন। অবশ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আবার র‌্যাব গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে ‘বোমা হামলা’ এবং পুলিশের পাল্টা গুলির মধ্যে অক্ষত অবস্থায় ধরা পড়েছেন সন্দেহভাজন আরেক মাদক কারবারি। তিনিও এখন কারাগারে।

এ ছাড়া এখন পর্যন্ত যে শতাধিক ‘বন্দুকযুদ্ধের’ খবর এসেছে গণমাধ্যমে তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই শতভাগ ‘সফল’ র‌্যাব ও পুলিশ। সন্দেহভাজন মাদকের কারবারিরা ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন অব্যর্থ গুলিতে।

চলতি মাসের ৪ মে থেকে মাদকবিরোধী এই অভিযানে নামে র‌্যাব। পরে যোগ দেয় পুলিশ।

র‌্যাব ও পুলিশ যা বলেছে, তাতে অধিকাংশ মৃত্যুই হয়েছে বন্দুকযুদ্ধে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বর্ণনা অনুযায়ী প্রতিটি ‘বন্দুকযুদ্ধই’ ঘটেছে গভীর রাতে, বিশেষত রাত একটা থেকে তিনটার মধ্যে।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাদকের কারবারি বা তার সহযোগীরা গুলি চালিয়েছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আত্মরক্ষায় গুলি চালায়। সন্দেহভাজনরা নিহত হলেও তাদের সহযোগীরা কেউ পাকরাও হয়নি।

প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই মাদক, আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি উদ্ধার হয়। দুই একটি ঘটনায় পুলিশের কয়েকজন সদস্যের আহত অবস্থায় ব্যান্ডেজ বাধা ছবি এসেছে গণমাধ্যমে।

গত প্রায় দেড় দশকের ধারাবাহিকতায় এবারের বন্দুকযুদ্ধেও র‌্যাব পুলিশের ‘তাক লাগানো’ সাফল্যে বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর উপ কমিশনার মশিউর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযানে আমাদের নানা ধরনের পরিকল্পনা থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম থাকে।’

‘অভিযান চলাকালে আমাদের নৈতিক মনোবল, সাপোর্ট (সরঞ্জাম) থাকে যা অপরাধীদের ক্ষেত্রে থাকে না। এছাড়াও অভিযানকালে আমাদের কাছে তথ্য থাকে কোন আসামি কোথায় রয়েছে। সেই তথ্য মোতাবেক আমারা তাদের গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা করে থাকি।’

‘এছাড়াও যেসব আসামি আমাদের উপরে আক্রমণ করে থাকে তাদের লক্ষ্য ঠিক না থাকায় আমাদের হতাহতের খবর কম শোনা যায়।’

‘তবে যে কোন অভিযানেই যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যে আহত বা নিহত হয় না সেটা একেবারেই ঠিক নয়। বিভিন্ন অভিযানে আমাদের অনেক সহকর্মীরাই আহত হয়। তবে বড় ধরনের কিছু না হলে আমরা তা প্রচার করি না।’

একই প্রশ্নে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান ভুইয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘র‌্যাবের ইন্টিলিজেন্স (গোয়েন্দা শাখা) স্ট্রং (শক্তিশালী)। যে তথ্যগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো যাচাই বাছাই করে অভিযানে যাই আমরা। অভিযান খুব নিখুঁতভাবে এবং সতর্কতার সাথে পরিচালনা করা হয়। এ জন্যই র‌্যাবের অভিযানে সাফল্য বেশি।’

বর্ণনায় আস্থা নেই মানবাধিকার কর্মীদের

র‌্যাব বা পুলিশ ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের যে বর্ণনা দিয়ে থাকে, তাতে কখনও আস্থা রাখতে পারছেন না মানবাধিকারকর্মী সালমা আলী। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন,  ‘পুলিশের সঙ্গে যদি বন্দুকযুদ্ধ হতো, তাহলে তাদেরও তো ক্ষয়ক্ষতি হতো। সেটা কিন্তু হচ্ছে না।’

‘এতে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমার মনে হয় যাদেরকে বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে মারা হচ্ছে তাদের মেরে প্রমাণ নষ্ট করা হচ্ছে। যার প্রভাব মোটেও ভালো হবে না।’

মানবাধিকার কর্মী নূর খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গায়েবি প্রশিক্ষণ পেয়েছে। মূল কথা হচ্ছে প্রতিটি ঘটনা তদন্তের দাবি রাখে।’

‘আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঠান্ডা মাথায় মানুষ মারছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে অরাজকতা বিরাজ করবে। কেউ তার মতামত প্রকাশ করতে পারবে না।’

তবে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা আস্থা রাখছেন বাহিনীর বক্তব্যেই। তিনি বলেন, ‘অভিযানে ১০০ জন মাদক ব্যবসায়ী মরলে ৫০ জন পুলিশকে মরতে হবে? পুলিশ তো সৃষ্টি হয়েছে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জন্যই।’

‘তবে জুডিশিয়াল (বিচারিক) তদন্ত করে দেখা যেতে পারে প্রকৃতপক্ষে কী হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা এ ব্যাপারে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখুক। আর গণমাধমকর্মীরা তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে।’

‘তবে এটা তো ঠিক যে চলতি অভিযানে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যা কিছুটা সময়ের জন্য ভালো একটি দিক দেখা যাবে।’

ঢাকাটাইমস/৩০মে/এএ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত