‘রাস্তার রাজা’ চাঁদাবাজ

ইমতিয়াজ উল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০২ জুন ২০১৮, ১৫:০৭ | প্রকাশিত : ০২ জুন ২০১৮, ০৮:৩৮

সাভারের আশুলিয়ায় যানবাহনে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। প্রতিদিন ছোট গাড়িতে ১০ টাকা থেকে শুরু করে বড় গাড়িতে মাসে এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঈদ এলেই চাঁদাবাজির মাত্রা বেড়ে যায়।

চাঁদাবাজির নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকায় প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ মালিক-শ্রমিকদের।

পরিবহন মালিক শ্রমিকরা চাঁদাবাজির ঘটনায় যাদের নাম জানিয়েছেন, তারা কেউ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বীকার করেন না। পুলিশও সবকিছু অস্বীকার করে। আর বাহিনীটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বরাবর যা বলেন, এবারও তাই বলেছেন। তাদের বাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে নেয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।

গত ২৬ মে বাইপাইল এলাকায় সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবিলম্বে এখানে চাঁদাবাজি বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। তারপরও পুলিশ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আশুলিয়ার নবীনগর, নয়ারহাট ও ধামরাইয়ের ইসলামপুর, কালামপুর, শ্রীরামপুরসহ বেশ কিছু জায়গায় যানবাহনে চলে এই চাঁদাবাজি।

নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের নবীনগর ও বাইপাইল এলাকাতে চাঁদাবাজি আরও বেশি।

বাইপাইল ত্রিমোড়ে মাহিন্দ্রা পরিবহন থেকে মাসে প্রায় ৩০ লাখ, আশুলিয়া ক্ল্যাসিক থেকে সাড়ে ১১ লাখ, অন্যান্য পরিবহন থেকে প্রায় এক লাখ ও নয়ারহাট এলাকায় বিভিন্ন গণপরিবহন থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা চাঁদা তোলার তথ্য পাওয়া গেছে। 

বাইপাইল এলাকার একাধিক মাহেন্দ্র চালক বলেন, টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়া বাজার থেকে বাইপাইল পর্যন্ত চার শতাধিক থ্রি হুইলার মাহেন্দ্র পরিবহন চলে। এগুলোর কোনো কাগজ নেই। এ কারণে এসব গাড়ি থেকে দিনে ১৩০ টাকা চাঁদা আদায় করেন ধামসোনা ইউনিয়নের একজন সদস্য।

বাইপাইল ট্রাফিক পুলিশের হয়ে জাকির নামে একজন আলাদাভাবে মাসোহারা আদায় করেন। নতুন কেউ এই সড়কে মাহেন্দ্র চালাতে চাইলে চাঁদাবাজ জাকিরের কাছে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়।

অভিযোগ আছে, কোনো চালক মাসোহারা দিতে না চাইলে পুলিশ সেটি আটক করে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করে।

আশুলিয়া যুবলীগের সাবেক এক নেতাও চাঁদাবাজিতে যুক্ত বলে অভিযোগ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের।

জানতে চাইলে ধামসোনা ইউনিয়নের সেই সদস্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

আশুলিয়া থানা যুবলীগের সাবেক নেতা শাহাদাত হোসেন খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মাহেন্দ্র থেকে চাঁদা তুলেন যুবলীগ নেতা মঈনুল ভূইয়ার ব্যক্তিগত সহকারী আপেল। অথচ মানুষের কাছে হেয় করতেই আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে।’

শ্রমিকরা জানান, চাঁদাবাজদের অত্যাচারে গাড়ি চালিয়ে লাভ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে গাড়ি বিক্রিও করে দিয়েছেন।

সেলিম নামে খেয়া পরিবহনের এক চালক ঢাকাটাইমসকে বলেন, বাইপাইল এলাকায় সব গণপরিবহন থেকে চাঁদা তোলা হয়। চাঁদার পরিমাণ বেশি গুণতে হয় নবীনগর থেকে মহাখালী রুটের আশুলিয়া ক্ল্যাসিক পরিবহনের বাসগুলোকে।

প্রতিদিন সড়কের বিভিন্ন স্থানে তাদের ৭০টি বাসের প্রতিটিকে ১৫৬০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এর মধ্যে বিমানবন্দর এলাকায় দুইশ, বিশ্বরোড এলাকায় তিনশ, মহাখালী টার্মিনালে ৩৫০, নবীনগরে ১৬০ ও বাইপাইলে সাড়ে ৫০০ টাকা।

ইপিজেড থেকে মিরপুরগামী আলিফ, মোহনা ও আব্দুল্লাহপুর থেকে নবীনগরগামী হিউম্যান হলার গুলোকে দিনে ৩০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা গুণতে হয়।

অভিযোগের সত্যতা জানতে চাঁদা উত্তোলনকারী হিসেবে নাম পাওয়া জাকিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গ্রামের বাড়িতে আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর, বাইপাইল, পল্লীবিদ্যুৎ ও বলিভদ্র এলাকায় রেন্ট-এ কারের চালকদের কাছ থেকে জয় নামে একজন আশুলিয়া থানার হয়ে চাঁদা আদায় করে বলে অভিযোগ চালকদের।

প্রতি মাসে গাড়িপ্রতি পাঁচ থেকে সাতশ টাকা জয়কে না দিলে থানার র‌্যাকার দিয়ে তাদের প্রাইভেটকার নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানিয়েছেন চালকরা।

আশুলিয়া থানাধীন নয়ারহাট এলাকায় দিনের যেকোনো সময় গেলেই চোখে পড়বে গণপরিবহন থেকে চাঁদা সংগ্রহের খোলামেলা দৃশ্য।

লেগুনা, ট্রাক ও বাস বা অন্যান্য যানবাহনের একাধিক চালক বলেন,  ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনেই ডি-লিংক, স্বজন, ভিলেজ লাইন, পদ্মা লাইন, মানিকগঞ্জ পরিবহন ও লেগুনাসহ পাঁচ শতাধিক বিভিন্ন পরিবহন থেকে দিনে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়। শাহজাহান নামে এক ব্যক্তি ও তার সহযোগী প্রতিদিন এই চাঁদা আদায় করেন বলে তথ্য চালকদের।

শাহাজাহানকে চাঁদা তোলার সময় পাওয়া গেলেও তিনি চাঁদাবাজির কথা অস্বীকার করেন। পরে স্থানীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি আব্দুল মান্নানের কথা যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। পরে আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

নয়ারহাট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনেই প্রকাশ্যে কীভাবে চাঁদাবাজি হচ্ছে এ প্রশ্নে সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবেদ হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয়টি ক্রিমিনাল কেইস। আপনারা এ ব্যাপারে থানায় যোগাযোগ করুন।’

চাঁদাবাজির অভিযোগের ব্যাপারে ঢাকা জেলা ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফুল ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘চাঁদাবাজিতে ট্রাফিক পুলিশের সংশ্লিষ্টতার কথা তার জানা নেই। তবে ট্রাফিক পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্য এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘চাঁদাবাজদের খুঁজে বের করতে নির্দেশনা রয়েছে। আর পুলিশের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০২জুন/আইআই/ডব্লিউবি/জেবি)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত