অবসরের আগে খেলোয়াড়দের রাজনীতি নয়

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ০৯ জুন ২০১৮, ১২:৪৯

আফগানিস্তানের কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়াটা অনেকের মত আমিও সহজে মেনে নিতে পারছি না। তাই বলে আফগানিস্তানের অর্জনের প্রতি আমার কোনো অশ্রদ্ধা নেই। বরং আফগান বিজয়গাঁথাকে মজলুমের জেগে উঠার অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে জর্জরিত রাষ্ট্রটি যখন কোনও ক্ষেত্রে ইতিবাচক শিরোনাম হয় তখন আমাদের ভালো লাগে। তাই আফগান বীরদের প্রতি স্যালুট। তবে বাংলাদেশের বীরদের প্রতিও আমাদের কোনো অশ্রদ্ধা নয়। বরং ভালোবাসার দাবিতেই টাইগারদের এবং তাদের  ম্যানেজমেন্টকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলতে চাই।

বাংলাদেশের প্রাণ মাশরাফি বিন মুর্তজা মাঝে মাঝে একটি কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন, ক্রিকেট নিছক একটি খেলামাত্র। মাশরাফি নিজেদের থেকে এদেশের কৃষক, শ্রমিকদের বড় তারকা মানেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মাশরাফির অগাধ শ্রদ্ধা। মাশরাফির সাথে দ্বিমত করার কোনও সুযোগ নেই। আমার মনে হয়, মাশরাফি শুধু একজন  ভালো খেলোয়াড়ই নন, ভালো ক্যাপ্টেন আর সরল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হৃদয়বান একজন মানুষ। এরপরেও বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানে ক্রিকেটের রাজনৈতিক অর্থনীতির তীব্রতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ক্রিকেট বন্ধুত্ব বাড়ায়,  কমায়ও। ক্রিকেট আমাদের একতাবদ্ধ করে আবার বিভাজনও সৃষ্টি করে।

ক্রিকেট পশ্চিমাদের কাছে সময় নষ্ট করার হেতু বলে মনে হতে পারে কিন্তু আমাদের কাছে যে আবেগের বিষয়। এখন সে আবেগ কতখানি দরকারি, সেটা নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে। এক অর্থে তো পৃথিবীর সব আবেগই অদরকারি। কিন্তু আবেগ যে আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আবেগ ছিল বলেই আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের মত বড় শক্তিকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পেরেছিলাম। আবেগ এক অন্য পৃথিবীর সন্ধান দেয়, যে পৃথিবীতে সবকিছু সম্ভব। খেলাধুলার বেলায় খেলোয়াড়দের ভেতরে আবেগ কাজ করে না হয়ত, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভেতরে করে। ক্রিকেট আমাদের কাছে তাই শুধু চার-ছক্কার খেলা নয়। ক্রিকেট আমাদের কাছে খেলার চেয়েও বেশি কিছু। ক্রিকেট বাংলাদেশের জন্য এক নতুন পরিচয়, নতুন বাস্তবতা। ক্রিকেট দিয়েই এই প্রজন্ম জেনেছে যে, তাঁদের পক্ষেও বিশ্বজয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্রিকেটারদের চেয়ে বড় তারকা আর কেউ নেই। ক্রিকেটারদের পারফরমেন্স এর উপর এদেশের মানুষের আনন্দ-বেদনা অনেকখানি নির্ভর করে। ক্রিকেট এ প্রতিটি বিজয় কিংবা পরাজয় তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। তবে আমাদের দর্শক আগের যেকোনো সময়ের চাইতে পরিণত। ক্রিকেট এ বাংলাদেশের অবস্থান বুঝেই কিন্তু দর্শক সমাজ প্রতিক্রিয়া জানায়। দর্শকরা জানে বাংলাদেশ প্রতি ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়া-ভারতকে হারিয়ে দিতে পারবে না। আবার দর্শকবৃন্দ এটাও জানে যে, যেকোনো ক্রিকেট শক্তিকে হারিয়ে দেবার সামর্থ্য আমাদের টাইগারদের আছে। টাইগাররা বহুবার এটা করে দেখিয়েছে। একটা অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। সেই জন্যই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে এভাবে টানা তিন ম্যাচে পরাজিত হওয়াটা কেউ সহজে মেনে নিতে পারছে না।

সবার একটাই কথা, যে আফগান ক্রিকেটাররা নিজের দেশে শান্তিতে থাকতে পারে না। অন্যদেশ, অন্য স্টেডিয়ামকে যারা ভেন্যু বানায়, যে আফগানিস্তানে বোমা ফোটে বৃষ্টি ঝরার মত, সেই আফগানিস্তানের সাথে বাংলাদেশের মত একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ক্রিকেট টিম টানা তিন ম্যাচে একটা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে হারবে, এটা মেনে নেয়া কঠিন। ক্রিকেটারও এই পরাজয়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন বলেই আমরা অনুধাবন করি। যার দেশপ্রেম আছে, সে একটু আবেগপ্রবণ থাকবেই।

আফগানিস্তান কেন, আমরা হংকং এর সাথেও হারতে পারি, এমনকি নেপাল-পাপুয়া নিউগিনির সাথেও। দুর্ঘটনা ক্রিকেটেরই একটি অংশ। আফগানিস্তান ক্রিকেটে দ্রুত উঠে আসছে। জাতিগতভাবেই আফগানরা লড়াকু প্রকৃতির। শারীরিক ও মানসিকভাবে এরা শক্তিশালী। সাথে যোগ হয়েছে প্রকৃতিপ্রদত্ত কিছু প্রতিভা। এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম কঠিন বোলারের নাম রশিদ খান। রশিদ খান সর্বশেষ আইপিএলের অন্যতম আলোচিত, সমীহ জাগানো বোলার। মোহাম্মদ নবীর মত অলরাউন্ডার আছে আফগানিস্তানের। ভালো কয়েকজন ফাস্ট বোলারও আছে আফগান ক্রিকেট দলের। তবে প্রতিভার চেয়েও আফগান ক্রিকেটারদের সম্পদ তাদের পরিশ্রম করার সামর্থ্য এবং তীব্র ইচ্ছাশক্তি। ফিল্ডিং এর দিকে তাকালে বিষয়টি ক্লিয়ার হবে। আফগানদের বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে মনে হয়, এরা শতভাগ নয়, পাঁচশত ভাগ প্রচেষ্টা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতে চাইছে। কঠোর পরিশ্রম, সাধনা, দক্ষতা আর মাঠে সাধ্যাতীত বাস্তবায়নের তীব্র বাসনাই আফগানদেরকে ক্রিকেটে ভালো পজিশনে নিয়ে যাচ্ছে।

এমন একটা ক্রিকেট টিমের কাছে বাংলাদেশ কেন, ভারত-অস্ট্রেলিয়াও কদিন পর হয়ত আফগানদের কাছে নিয়মিত পরাজিত হবে। আফগানিস্তানের মধ্যে আমরা ভবিষ্যৎ ক্রিকেট পরাশক্তির লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। আফগানরা এমনই, হারার আগেই হেরে বসে না। কিন্তু বাংলাদেশ তো বহু আগেই এই স্টেজ পার করে এসেছে। ক্রিকেট সব পরাশক্তিকেই বাংলাদেশ পরাজিত করা অভ্যাস রপ্ত করেছে। সর্বশেষ শ্রীলংকায় তিন-জাতি ক্রিকেট সিরিজে বাংলাদেশ অল্পের জন্য চ্যাম্পিয়ন হয়নি। অবিশ্বাস্য সব বিজয় উপহার দিয়েছিল মুশফিকের দল। সেই সিরিজে বাংলাদেশ দেখিয়েছিল, বিদেশের মাটিতেও ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে টাইগাররা খেলতে পারে। তাহলে আফগানদের সাথে এভাবে হোয়াইটওয়াশ হল কেন বাংলাদেশ?

ক্রিকেট ম্যাচ বা সিরিজ খেলতে একটি টিমের যে প্রস্তুতি এবং গবেষণা দরকার, সেটা কি এবার বাংলাদেশ দলের ছিল? আফগানিস্তানের রশিদ খান অত্যন্ত ভালো বোলার। তাঁকে খেলা খুব কঠিন। এটা তো আমরা আম পাবলিকও জানি। কিন্তু কিভাবে রশিদ খানকে খেলতে হবে, সেটি জানতে হবে ক্রিকেটারদের এবং এটা জানতে ক্রিকেটারদেরকে সহায়তা করার সমস্ত উপায় সরবরাহ করবে ক্রিকেট বোর্ড। কোর্টনি ওয়ালশ সর্বকালের ভালো বোলারদের একজন। কিন্তু তিনি কি এখন বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচও? এখন স্পেশালাইজেশনের যুগ। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টি এই তিন রকমের ক্রিকেটেই সিদ্ধহস্ত এমন ক্রিকেটার খুব বেশি নেই পৃথিবীতে। যিনি কোচ হবেন, তার তো সব বিষয়ে দখল থাকতে হবে। ওয়ালশ কোনোভাবেই পরিপূর্ণ কোচের দক্ষতা রাখেন না। ভালো ব্যাটিং কোচ নিয়োগ দেয়া উচিত অবিলম্বে। আমাদের ক্রিকেটারদের প্রতিভার অভাব নেই। দরকার শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।

সর্বোপরি আমাদের ক্রিকেটারদের সমস্ত রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। ক্রিকেটারদের কাজ ক্রিকেট খেলা, রাজনীতি করা নয়। তবে হ্যাঁ অবসরকালে ক্রিকেটাররা কোনও দলের হয়ে যদি নির্বাচনে লড়তে চান, লড়বেন। তাই বলে সাকিব আল হাসান কিংবা মাশরাফির কি বয়স হয়েছে এখন এমপি হওয়ার? যে মন্ত্রি কদিন আগে মিডিয়া গরম করলেন এদের এমপি নির্বাচনের কথা বলে, তিনি কিভাবে এটা বলতে পারেন? মাশরাফি কিংবা সাকিব এমপি হবে কি না, এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। আবার তারা সময় হওয়ার আগেই যদি ভুল কিছু করার সিদ্ধান্ত এরা নেন, সেখানেও আমাদের সুযোগ আছে তাদের বোঝানোর। মাশরাফি এখনো ক্রিকেট খেলছেন এবং ভালো খেলছেন। খেলা শেষ হলে হতে পারে মাশরাফি ক্রিকেট একাডেমি খুলবেন, উনার মত আরও মাশরাফি তৈরি করবেন। এটাই তো তার কাজ।

আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি জনপ্রিয় আমাদের ক্রিকেটাররা। মাশরাফি কিংবা সাকিব কি এটা জানেন না? নিশ্চয় তারা নিজেদের জনপ্রিয়তা বুঝতে পারেন। মানুষ মন্ত্রী-এমপিদের সালাম দেয় কখনো শ্রদ্ধায় কখনো ভয়ে। কিন্তু ভালোবাসার হিসাব কষলে, মাশরাফিদের ধারে কাছে কেউ নেই এদেশে।

মাশরাফি বা সাকিব আল হাসান এদেশের কোটি কোটি মানুষের আইডল। তাঁদেরকে ক্রিকেট খেলতে দেয়া উচিত। পাশাপাশি আমাদের ক্রিকেটাররা যেন উচ্ছন্নে না যায়, বখাটে বা অহংকারী না হয়ে যায় সেদিকেও রাষ্ট্র ও সমাজকে নজর রাখতে হবে। কদিন পরপর কোটি টাকা বোনাস, বাড়ি-গাড়ি দেয়ার কোনো মানে হয় না। ভালো অংকের ম্যাচ ফি, লাখ টাকা বেতন ও কোটি টাকার স্পন্সর মানি তো আছেই। বাংলাদেশে ভালোভাবে চলতে গেলে যত সম্পদ বা সুবিধা দরকার, ক্রিকেটারদেরকে ঠিক ততটুকুই দেয়া দরকার। অর্থনীতিতে যেমন মুদ্রাস্ফীতি যেমন কাম্য নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও কম বয়সে অত্যধিক সম্পদের মালিক হওয়া সবক্ষেত্রে কাম্য নয়। কম বয়সে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোটি টাকার মালিক হয়ে অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলে। আমাদের ক্রিকেটাররা একবার জীবন সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে বিপথে গেলে এই সমাজও যে দ্রুত গভীর খাদের দিকে এগিয়ে যাবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত