ভারতে শীর্ষ নারী ক্রিকেটার বছরে পান ৫০ লাখ রুপী!

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৮, ১৭:২৬

একটু চোখ বন্ধ করে অনুভব করার চেষ্টা করুন। ভাবা যায় না, কী মূল্যবান এই ট্রফি। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল (প্রমীলা) বিশাল প্রতিবেশী ভারতের শক্তিশালী প্রমীলা জাতীয় ক্রিকেট দলকে পরাজিত করে এশিয়ান নারী ক্রিকেটের নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। টেস্ট ও ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশের জাতীয় কোনো ক্রিকেট টিমের এই প্রথম বড় কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়!

ছেলেরা ক্রিকেটে ইতোমধ্যে ত্রিদেশিয় সিরিজ বা এশিয়া কাপের ফাইনালে গেলেও অল্পের জন্য শিরোপা হাতছাড়া করেছে। এখানেই বাংলাদেশের মেয়েরা ক্রিকেটে ছেলেদের পেছনে ফেলল। অবশ্য বাংলাদেশে মেয়েরা নেতৃত্ব দিচ্ছে না কোথায়? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা কিংবা সংসদের স্পিকার, সবাই নারী। নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। নারীরা ঘরে, বাইরে সব স্থানে নিজেদের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, ব্যাংক, আদালত, বীমা অফিস কিংবা গণমাধ্যম সবখানে নারীদের জয়জয়কার। দেশের ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপন এখন নারীরাই। তবে ক্রিকেটে নারীরা যা করে দেখাল, তাতে চরম বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। ভারতকে একই টুর্নামেন্টে দুইবার হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া কতখানি বড় ও কঠিন কাজ, সেটিই নিজে বোঝার এবং পাঠককে বোঝানোর চেষ্টায় এই লেখা।  

নারী ক্রিকেটে এশিয়া অঞ্চলে ভারত বলতে গেলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে এতদিন। নারীদের এশিয়ান লেভেলের টুর্নামেন্ট শুরু থেকে এই পর্যন্ত টানা ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারত । এশিয়ান ক্রিকেটে ভারতের নারীরা এক অর্থে অজেয় ছিল। সেই অজেয় ভারতীয় দলকে টানা দুইবার পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়ে শিরোপা ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশের নারীরা। অথচ অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা কিংবা ঐতিহ্য ইত্যাদি প্রতিটি দিক থেকেই যোজন যোজন পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। শুধুমাত্র প্রতিভা, পরিশ্রম আর সাহসকে পুঁজি করে ভারতের মত শক্তিশালী ক্রিকেট টিমকে নাস্তানাবুদ করে নতুন এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ কয়টি মেয়ে ক্রিকেট খেলে? খুব বেশি নয়। হাতে গোনা কিছু নারী ক্রিকেটার আছে বাংলাদেশে। এদের দিয়ে সম্প্রতি শুরু হয়েছে ঢাকা ও কয়েকটি বিভাগীয় শহর-কেন্দ্রিক নারী ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি করে নারী ক্রিকেট টিম থাকত পারত, কিন্তু আফসোস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়েরাও খেলাধুলা করতে চায় না। আর বাংলাদেশে ক্রিকেট এর নামে যত টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি এর সবই তো প্রায় ছেলেদের জন্য।

ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এই সাফল্য কতখানি চমক জাগানিয়া সেটি আমরা ক্রীড়া সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া থেকেও অনুধাবন করতে পারি। ক্রীড়া সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি ভারতকে দুইবার টানা হারিয়ে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিষয়ে তার মুগ্ধতা প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘র‍্যাংকিং বলছে, ভারত চারে আর আমরা নয়ে। সত্যিকার ব্যবধান আরও বেশি। ফিজিক্যাল-মেন্টাল অ্যাবিলিটি, স্কিল, অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচের চাপ, এসব বাস্তবতায় বাংলাদেশের পাত্তাই পাওয়ার কথা নয় ভারতের কাছে। ফাইনালের আগে বাংলাদেশ ৪০টি টি-টোয়েন্টি খেলেছে। ভারত অধিনায়ক হারমানপ্রিত একাই খেলেছেন ৮০ টি। বিশ্ব ক্রিকেটে সময়ের সবচেয়ে পাওয়ারফুল ও আগ্রাসী ব্যাটারদের একজন তিনি। গত বছর বিশ্বকাপের সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ চার ও ৭ ছক্কায় ১১৫ বলে ১৭১ রানের যে ইনিংস খেলেছিলেন, মেয়েদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস মনে করা হয় সেটিকে.। মিতালি রাজ, এশিয়ার সফলতম ব্যাটার। ঝুলন গোস্বামি, এশিয়ার সফলতম বোলার। মেয়েদের ক্রিকেটের বড় বড় সব তারকা। একবার হয়ত জিতে যাওয়া যায়, তাই বলে পাঁচদিনের মধ্যে দুইবার! অভাবনীয় এই জয়। গত মাসের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে ১৪ মাস ওয়ানডে খেলেনি মেয়েরা। টি-টোয়েন্টি খেলেনি আগের প্রায় দেড় বছর। ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে সময় কাটাবে? এই মৌসুমে ঢাকা লিগ হয়নি। হবেও না। কারণ, মাঠের অভাব। মেয়েদের ক্রিকেটের বেলায় বিসিবির মাঠের অভাব বরাবরই তীব্র। ঘরোয়া ক্রিকেট নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নেই। দীর্ঘ মেয়াদি ট্রেনিং-ক্যাম্প নেই। সূচি নেই। পরিকল্পনা নেই’।

ভারতের নারীরা ক্রিকেটে ভালো করবে না কেন? জেনে অবাক হবেন, ভারতের নারীরাই এখন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারী ক্রিকেটার।  কদিন আগেও নারী ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের মেয়েরা। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ তালিকাভুক্ত নারী ক্রিকেটাররা প্রত্যেকে বছরে ৬২,৫০০ মার্কিন ডলার শুধু বেতন বাবদ আয় করে। ইংল্যান্ডের মেয়েদের মধ্যে যারা এ প্লাস গ্রেড ভুক্ত তাঁদের আয় বছরে বেতন বাবদ ৫০,০০০ মার্কিন ডলার। ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগরার লেখা এক প্রতিবেদন এ বছরের ১০ মার্চ তারিখে প্রকাশিত হয় ইএসপিএন অনলাইনে। সে প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, ভারতের নারী ক্রিকেটররা উপার্জনের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের মেয়েদেরকে সম্প্রতি পেছনে ফেলেছে ভারতের মেয়েরা। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবারই মেয়েদের ক্রিকেটের দিকে যথোচিত নজর দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেছে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট সংস্থা। এই নামের প্রতি সুবিচার করে ভারতের শীর্ষ নারী ক্রিকেটারদের বিশাল অংকের বেতন নির্ধারণ করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সব মিলে বছরে ভারতের শীর্ষ নারী ক্রিকেটার  মিতালি রাজ, ঝুলান গোস্বামী হারমিনপ্রিত কউর এবং  স্মৃতি মান্ধানার উপার্জন হবে ৫০ লাখ রুপী (প্রায় ৭৬, ৭৫০ ডলার)!  

সব ধরণের শ্রম ও মেধা বিনিয়োগের বিনিময়ে নারী-পুরুষের সমান উপার্জন নিশ্চিত করার দাবি বিশ্বব্যাপী। সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান উপার্জন হয়ত সব ক্ষেত্রে এখনি নিশ্চিত করা যাবে না। কিন্তু ভারতের নারী ক্রিকেটাররা নিজেদের উপার্জন নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট বলেই মনে হচ্ছে। তবে ভারত খুব বেশি আগে নারী ক্রিকেটারদের সাথে চুক্তি করেছে এমন নয়। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নারী ক্রিকেটারদেরকে নিয়মিত চুক্তির আওতায় আনে। সর্বশেষ বিশ্বকাপে ফাইনালে ভারতের মেয়েরা হেরে গেলেও ভারতজুড়ে নারী ক্রিকেট নিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

তবে মেয়েদের এই উপার্জনের বড় একটা অংশ কিন্তু ছেলেদের ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে সংগঠিত ব্যবসা-বাণিজ্য থেকেই আসে। এ বিষয়ে সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক ডায়ানা ইদুলজি ইএসপিএনকে বলেছেন, ‘মেয়েরা এখন ক্রিকেটেও খুব ভালো করছে। তাঁদের অবদানকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে মেয়েদের ক্রিকেটকে আরও বেশী উপার্জনক্ষম করতে হলে দরকার যথাযথ মার্কেটিং পলিসি’।

বাংলাদেশের মেয়েরা ক্রিকেট খেলে কেমন উপার্জন করে সেটিও একটু জানার চেষ্টা করি। বাংলাদেশে ছেলেদের ক্রিকেটেই এখন পর্যন্ত উচ্চ মানের পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। তবে জাতীয় দল, ঢাকার শীর্ষ ক্লাব, বিভাগীয় দল, ফ্রেঞ্চাইজি, কর্পোরেট দল এবং ব্যক্তিগত স্পন্সর ইত্যাদি কয়েকটি জায়গা থেকে ছেলেরা ভালো কামাই করেন। সাকিব আর মোস্তাফিজ তো পুরো বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন নামীদামী টুর্নামেন্টে ক্রিকেট খেলেন। আর ছেলেদের জাতীয় দল ভালো কিছু করলে খোদ প্রধানমন্ত্রী বড় অংকের অর্থ পুরস্কার প্রদান করেন। সাথে বাড়ি-গাড়ি তো আছেই। ছেলেদের ক্রিকেটে তাই অর্থকড়ি, নাম-যশের অভাব নেই। সব মিলে বাংলাদেশে ছেলেদের ক্রিকেটে একটা সামাজিক আন্দোলন ঘটে গেছে। আর ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে বিসিবি পৃথিবীর অন্যতম ধনী ক্রিকেট বোর্ডের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ক্রিকেটে অর্থ-কড়ির পরিমাণ খুব কম। ভারতের সাথে তুলনা করলে তো পরিস্থিতি হাস্যকর বলে প্রতীয়মান হবে। 

নারী ক্রিকেটারদের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ভালো কোচ-ফিজিওর ব্যবস্থা করলেও টাকা-পয়সার হিসেবে বাংলাদেশে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের প্রাপ্তি একেবারেই নগণ্য। জাতীয় লীগে মেয়েরা একটি ম্যাচ খেলে পায় ৬০০ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক ম্যাচে মোটামুটি, ৮০০০ টাকা। বিসিবির সাথে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা নারী ক্রিকেটাররা যারা এ প্লাস গ্রেডভুক্ত তাঁরা পায় সবচেয়ে বেশি, ৩০,০০০ টাকা। এ গ্রেড পায় ২০,০০০ আর বি গ্রেড পায় ১০,০০০ টাকা। দেখা যাচ্ছে, যে নারী ক্রিকেটার মাসে ৩০,০০০ পান, তার মোট বাৎসরিক আয় বোর্ড থেকে মোট ৩ লাখ ষাট হাজার টাকা। অথচ ভারতে একজন শীর্ষ নারী ক্রিকেটার বোর্ড থেকে বছরে পাচ্ছেন ৫০ লাখ রূপী!  

তবে সুখবর হল বিসিবি ইদানিং মেয়েদের দিকেও সুনজর দিতে শুরু করেছে। বিসিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়েদের এই সাফল্য হুট করে চলে আসেনি। বিসিবির কিছু সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। হতে পারে, অন্য ক্রিকেট শক্তিগুলোর তুলনায় মেয়েদেরকে দেয়া অর্থ অনেক কম, কিন্তু বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে সুযোগ সুবিধা বাড়ছে। যেমন ভালো কোচ এবং ফিজিওর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ক্রীড়া সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনির লেখা থেকে জানা গেছে, এশিয়ান ক্রিকেট ফেস্টকে সামনে রেখে ভারতীয় কোচ আঞ্জু জৈনকে নিয়োগ দেয় বিসিবি। ভারতীয় দলে একসময় খেলতেন আঞ্জু। সেই সুবাদে ভারতের শক্তি আর দুর্বলতার বিষয়ে ভালো জানাশোনা তার। সহকারী কোচ দেবিকা পালশিকারও একজন ভারতীয়। বাংলাদেশের মেয়েদের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ইংলিশ ট্রেইনার ডেভিড ক্যাপলকে রেখেছে বিসিবি।

মেয়েদের ক্রিকেটে দর্শক আগ্রহ বেশি নেই। তাই স্পন্সর পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবে সবকিছুই দর্শক আর টাকার হিসেবে যাচাই কড়া উচিত হবে না। মেয়েদের ক্রিকেট, ফুটবলসহ প্রতিটি খেলায় রাষ্ট্রের আরও ব্যয় করা উচিত। বাংলাদেশে সব ধরনের মানুষ আছে। খুব আধুনিক, রক্ষণশীল কিংবা ধর্মান্ধ, সব ধরনের মানুষের দেশ বাংলাদেশ। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সব দিক দিয়ে উন্নতি করছে। তবে সাম্প্রদায়িক, উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীও খুব তৎপর। এই উগ্র ধর্মান্ধরা যেন কখনোই সমাজের নিয়ন্ত্রণ না নিতে পারে সে জন্য রাষ্ট্রের উচিত হবে মেয়েদের খেলাধুলায় অর্থ বিনিয়োগ করা। ফুটবল, ক্রিকেটসহ সব ক্রীড়ায় মেয়েরা যদি ভালো অর্থ, সম্মান পায় তাহলে দেশের মেয়েরা খেলাধুলার প্রতি আরও আগ্রহী হবে। ঘরের বাইরে আসবে। ভোগবাদী ও ধর্মান্ধ সমাজের বিপরীতে একটি প্রগতিশীল ও উৎপাদনমুখী সমাজই পারে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত