রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ: খ্যাতির বিড়ম্বনা

কুদ্দুস আফ্রাদ
 | প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৮, ১৩:৩৮

কিশোরগঞ্জের সমৃদ্ধ ভাটি এলাকার সন্তান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। শৈশবে ভৈরবে লেখাপড়া করতে এসে যাঁর নামের প্রথম অংশ ছেঁটে, শেষের অংশে বিশেষণ যুক্ত হয় ‘ভাই’। আবদুল হামিদ থেকে তিনি হয়ে উঠেন ‘হামিদ ভাই’। ভৈরবের স্কুলে মারদাঙ্গা বাধিয়ে সেই হামিদ ভাই ফিরে গেলেন নিজ এলাকার এক স্কুলে। একুশে ফেব্রæয়ারি পালন নিয়ে এখানেও বিবাদে জড়ালেন স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তার বছরখানেক পরে এলেন কিশোরগঞ্জ মহকুমা শহরে। এখানে এসেই যুক্ত হলেন ছাত্র রাজনীতিতে। এবার শিক্ষার্থীমহলে ‘হামিদ ভাই’ থেকে ‘ছাত্রনেতা হামিদ’ হয়ে গিয়েছেন।

তারপরের অর্ধ যুগের ইতিহাসটা অনেকটা এরকম: আইয়ুব শাহী বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখতে গিয়ে কিশোরগঞ্জের ছাত্রসমাজের কাছে তিনি ‘লিডার হামিদ’ হিসাবে পরিচিতি পান। কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ, ছাত্রলীগের পতাকা নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো এই যুবক তখনও লেখাপড়ার পাঠ সমাপ্ত করেননি, তার মধ্যেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সারা দেশে আওয়ামী লীগের তখন একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্য। কল্পনাও করা যায় না, ওই তরুণ-যুব বয়সে আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় দলের মনোনয়ন অর্জন করা। কিন্তু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিশাল নেতার দূরদর্শিতার জন্যই কেবল তা সম্ভব হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কখনও নেতৃত্ব বাছাইয়ে ভুল করেননি।

তাঁর অসম্ভব দূরদর্শিতার কারণেই আওয়ামী লীগ যেমন দ্রুত গ্রামেগঞ্জে প্রসারিত হয়েছিল, তেমনি সত্তরের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সঠিক রাজনৈতিক কর্মীকে বেছে নিতে তিনি এতটুকু ভুল করেননি বলেই ওই তরুণ বয়সে আবদুল হামিদকে কিশোরগঞ্জের দুর্গম ভাটি অঞ্চলের আসন থেকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ভুল করেননি অবশ্য, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও।

এ নিয়ে সরস একটি কাহিনীও প্রচলিত আছে। ওই নির্বাচনের বেশ আগেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আবদুল হামিদ আসন্ন ভোটে নিজের প্রতিদ্ব›িদ্বতার আকাক্সক্ষার কথা জানান। বঙ্গবন্ধু আবদুল হামিদকে জানিয়ে দিলেন আগামীতে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি করা হবে তাকে। একই সঙ্গে তিনি এ কথাও জানিয়ে দেন যে, ওই আসনের জন্য এক প্রাক্তন আমলাকে (উপসচিব) তিনি প্রার্থী হিসাবে বাছাই করে রেখেছেন। তার মাস তিনেক পরের কথা। বঙ্গবন্ধুর জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে প্রায় এক কাপড়ে ট্রেনে চেপে ঢাকা ছুটে এলেন।

কমলাপুর থেকে সরাসরি ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন আবদুল হামিদ। সালাম ঠুকে বঙ্গবন্ধুর সামনে হাজির হতেই মাঠঘাটের লড়াকু যুবক হামিদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করলেন বঙ্গবন্ধু। সম্মোহনি চোখে কি যেন দেখছেন আর মুচকি হেসে চলেছেন। এতে বেশ বিব্রত ও বিচলিত হয়ে ঘামতে থাকেন আবদুল হামিদ।

‘তাকে তো জরুরিই আসতে বলেছিলেন, নাকি টেলিগ্রামে অন্য কিছু লেখা ছিল! কোনো ভুল কি হয়ে গেল!’ ভাবতে থাকেন আর ঘামতে থাকেন আবদুল হামিদ।

না-কি কমলাপুরে ট্রেন থেকে নেমে লুঙ্গি ছেড়ে দ্রæত প্যান্ট পাল্টাতে গিয়ে জিপারের (!) বোতাম লাগানো হয়নি? বোধহয় তা-ই হবে। তাই দেরি না করে কোমরের নিচে জিপারের সামনে দু’ হাত চেপে ধরলেন যুবক হামিদ। তখনও হেসে চলেছেন বঙ্গবন্ধু। এমন নার্ভাস অবস্থায় তাঁর কাছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভোটের কথা জানতে চাইলেন। এক পর্যায়ে আবদুল হামিদের কাছে জানতে চাইলেন তার নিজের ভোটের প্রস্তুতি আছে কি না। দু-চার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘নে, এবার তোকেই মনোনয়ন দেওয়া হলো, নেমে পড় পুরো প্রস্তুতি নিয়ে।’ আবদুল হামিদ তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তাঁকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আবদুল হামিদের চোখ-মুখ দেখে সহজেই পরখ করে নিলেন অন্তর্মনে কি জানতে চাইছেন হামিদ।

এবার, রসিকতা করে বঙ্গবন্ধু বললেন- ‘ভোটে দাঁড়ানোর আগেই তোর প্রতিদ্ব›দ্বীকে তুই হারিয়ে দিলি।’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যাকে মনোনয়ন দিবেন বলে স্থির করে রেখেছিলেন, সেই প্রাক্তন আমলা নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের মাত্র কয়েকদিন আগে মারা যান।

সুতরাং ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো আবদুল হামিদের। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ের মধ্যেদিয়ে আবদুল হামিদের সেই যে শুরু হলো সংসদীয় পাঠশালার কঠিন পথ চলা, তা শেষ হলো ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণে। আর এখন পর্যন্ত এ দেশে তিনিই একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্ব, যিনি টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির মতো মহাসম্মানীয় আসনটি অলঙ্কৃত করেছেন। দুই মেয়াদে ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বেও।

সত্তরের নির্বাচনে আবদুল হামিদ ছিলেন বয়স বিবেচনায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। এমনকি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য সাংবিধানিকভাবে ২৫ বছরের যে নির্দিষ্ট বয়সসীমা প্রার্থীদের জন্য বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তাও তখন পুরো হয়নি আবদুল হামিদের।

অদম্য সাহস, নিরলস পরিশ্রম ও নিজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আর বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্নেহ-মমতায় আবদুল হামিদ সত্তরের নির্বাচনে সকল চড়াই-উৎরাই পার করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই রাজনীতির কঠিন অঙ্গনে বিশেষ ক্যারিসমাটিক নেতা হিসাবে সেই যে তাঁর উত্থান ঘটেছে, তা দিনদিন কেবল বেড়েই চলেছে। শাসন ব্যবস্থা ও রাজনীতির বহুবিধ ক্রান্তিকাল এবং অনেক-অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা-লড়াই, দ্বন্দ্ব-সংঘাত পার করে সমৃদ্ধ ভাটির সেই আবদুল হামিদ আজ এ দেশের ‘অধিপতি’র মহান পদে আসীন হয়েছেন।

তার আগে তিনি এ দেশের জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধীদলের ডেপুটি লিডার পদের মতো সম্মানীয় পদে কর্তব্য ও দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হন। সব মিলিয়ে ৭ বার সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হয়ে নিজ অঞ্চলে শুধু নয়, সারা দেশে রেকর্ড গড়ে রেখেছেন তিনি।

দুই.

আবদুল হামিদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার ঘনিষ্ঠতা খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদে সাংবাদিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে সালাম বিনিময়, আবার কখনো সংসদীয় সভার বিশেষ খবর সংগ্রহে তাঁর শরণাপন্ন হতাম। পঞ্চম সংসদে তিনি নিয়মিত না হওয়ায় খুব বেশি দেখা-সাক্ষাতের সুযোগও ছিল না। তবে ভাটির শার্দূল হিসাবে পরিচিত আবদুল হামিদ সম্পর্কে জানা ছিল আমার অনেক দিন আগে থেকেই।

১৯৯৪ সালে কটিয়াদি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম লোহাজুরীতে আওয়ামী লীগের জনসভার আয়োজন করা হয়। সেই জনসভায় ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক জননেতা (মরহুম) জিল্লুর রহমান প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসাবে কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হামিদসহ অনেকের সঙ্গে সাংবাদিক হিসাবে আমার নামও ছিল। ঢাকা থেকে জননেতা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কটিয়াদি আওয়ামী লীগের প্রয়াত জনপ্রিয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব ও আমি একসঙ্গে যাত্রা করি। লোহাজুরীতে আমরা উপস্থিত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম আবদুল হামিদও বিশাল দলবল নিয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে হাজির। বিস্ময়ে অবাক হলাম আবদুল হামিদের বিচক্ষণতা দেখে।

আমন্ত্রিত নেতাদের সকলেই যখন দুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজ নিয়ে ব্যস্ত, তখন তিনি একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছিলেন আর স্থানীয় নেতাদের নাম ধরে ধরে কে কোথায় আছেন তাদের খোঁজ নিচ্ছিলেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমী আচরণে আশপাশের অনেকেই মুগ্ধ হন। কলেজজীবনে ছাত্রলীগে তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীর বাড়িও ওই এলাকায়। প্রতিদ্বন্দ্বী বন্ধু তখন আওয়ামী লীগ ছেড়ে জাতীয় পার্টি ঘুরে বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। আবদুল হামিদ ওই বন্ধুর খোঁজখবরও নিলেন।

প্রতিদ্বন্দ্বী বন্ধু সম্পর্কে সামান্যতম কটু মন্তব্য না করে বরং তার প্রশংসা-ই করে গেলেন। আবদুল হামিদের এমন আচরণ দেখে স্থানীয় জনসাধারণের অনেকের মন্তব্য ছিল, মানুষ এমনিতেই বড় হয় না, বড় হতে হলে ‘বড় প্রাণ ও বড় মনের’ দরকার হয়। যার সব গুণ রয়েছে আবদুল হামিদের। আর সেজন্যই তিনি কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের শুধু নয়, সমস্ত দলের নেতা-কর্মীদের কাছে ‘বটগাছ’-এ পরিণত হয়েছেন এবং রাজনীতি ছেড়ে দিলেও এখনও তাঁর ছায়ায় আশ্রয় খুঁজে বেড়ান কিশোরগঞ্জের মানুষ।

সপ্তম জাতীয় সংসদে আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার পদে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন এমন খবর অনেকেই বিশ্বাস করেননি। অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক রূপালী’ ও ‘দৈনিক সংবাদে’ ছোট করে খবরটি ছাপা হয়। আমি তখন দৈনিক রূপালীর চিফ রিপোর্টার। খবরটি প্রথমে আমাকে শেয়ার করেছিলেন সে সময়ের ‘সংবাদ’-এর খ্যাতনামা পলিটিক্যাল রিপোর্টার জাফর ওয়াজেদ। এখনকার মতো মোবাইল ফোনের প্রসার তখন ছিল না। এমনকি, ল্যান্ড ফোনও ছিল সীমিত ভাগ্যবানের ঘরে-দপ্তরে। জাফর ওয়াজেদ এ তথ্য দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, হামিদ সাহেবের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায় কি না খোঁজ নিতে।

আমি তখনকার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমানকে ফোন করে এ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে তিনি আমার ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কোনো মন্তব্য না করায় আমি বুঝে গেলাম তথ্য সঠিক। কিন্তু পরের দিন কাগজে এ খবর ছাপা হওয়ার পরে আওয়ামী লীগের অনেকেই ভ্রু কুচকালেন। ঘনিষ্ঠ দু-চারজন নেতা তো বলেই ফেললেন আঞ্চলিক লবিং করেও কাজ হবে না। কৃষক লীগের সভাপতি গাজীপুরের রহমত আলী সাহেব ডেপুটি স্পিকার হচ্ছেন।

তিন.

রাজনীতির কঠিন পরীক্ষায় তিনি বারবার উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন কেবল তাঁর স্বীয় রসবোধ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক নীতি-আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা থাকার কারণে। একইভাবে রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরেও যেতে পেরেছেন, কেবল তাঁর নিজস্ব সাহস-সততা, গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি বিশেষ মমতা, শ্রেণী ও বয়স বিবেচনা না করে সকলের প্রতি যথাযথ কদর ও সম্মান প্রদর্শন, ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, সর্বোপরি মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে।

কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ থেকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, অতঃপর স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে আবার বিরোধীদলের উপনেতার দায়িত্ব গ্রহণ, এবং সর্বশেষ পুনরায় স্পিকারের দায়িত্ব পালন শেষে বঙ্গভবনের মতো সুরক্ষিত জায়গায় অবস্থান করলেও কখনো তাঁকে সাধারণ মানুষের সংস্পর্শ থেকে আলাদা করা যায়নি। আমৃত্যু যাবে বলেও মনে হয় না।

আবদুল হামিদ যেখানে যে অবস্থায় থেকেছেন, সে জায়গায় বসেই খোঁজ রেখেছেন সাধারণ মানুষের। আবদুল হামিদের আগে-পরে স্পিকার ছিলেন মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। এ দু’জনই পোশাক-পরিচ্ছদে যেমন ছিলেন কেতাদুরস্ত, তেমনি চলনে-বলনে ছিলেন বিদেশি ধাঁচের বাঙালি সংস্কৃতির অনুসারী। তাদের সময়ে সংসদ ভবনের স্পিকারের দপ্তরে যাদের বেশি আনাগোনা ছিল, তারাও ছিলেন তেমনি কেতাদুরস্ত প্রকৃতির। কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে স্পিকারের সাক্ষাৎ পাওয়া ছিল বিস্ময়কর ব্যাপার। কিন্তু, আবদুল হামিদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি স্পিকারের মতো মর্যাদাবান পদে আসীন হয়েও সাধারণ মানুষকে ভুলতে পারেননি। যারা তাঁর ভোটার, শুধু তাদের জন্যই নয়, দেশের সমস্ত মানুষকে তিনি ‘একচোখে’ বিবেচনা করতেন। যে কারণে লুঙ্গি পরে গ্রাম থেকে ছুটে আসা সাধারণ মানুষেরাও অবলীলায় আবদুল হামিদের সাক্ষাৎ পেতেন। স্পিকার থাকাকালীন সংসদ ভবনের প্রধান ফটকে আবদুল হামিদের নির্দেশ ছিল; পোশাক-পরিচ্ছেদ বিবেচনায় নয়, কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় যেন আগমনকারীকে সংসদ ভবনে প্রবেশাধিকার দেওয়া অথবা রহিত করা হয়। ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণেই খুব কাছে থেকেই এমন অনেক ঘটনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, যা আর দশজন রাজনীতিবিদের মতো নয়।

২০০৯ সালের এক সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল থেকে জনাদশেক জেলে ছুটে এসেছেন সংসদ ভবনের ফটকে। সবার পরনে লুঙ্গি আর মলিন শার্ট। সংসদ ভবনের ভিতরে প্রবেশের ছাড়পত্রের (পাস) জন্য ছুটোছুটি করছিলেন তারা। সুনামগঞ্জের এক সাংসদের বদান্যতায় অবশেষে পাস মিললেও বাদ সাধেন নিরাপত্তা কর্মীরা। আগত জেলেরা স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন বলে জানালে, তাদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নাকচ করা হয়। প্রবেশ পথের এ ঘটনার কথা স্পিকারকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারীকে ডেকে জেলেদের উপরে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। পরে ওইদিনই তিনি প্রধান ফটকে দায়িত্বপালনকারীদের নির্দেশ দেন লুঙ্গি-শার্ট বিবেচনায় নয়, কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় যেন আগমনকারীকে সংসদ ভবনে প্রবেশাধিকার দেওয়া অথবা রহিত করা হয়।

আরও একটি ঘটনা আমার চোখে এখনও জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। তখন তিনি সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ ফোন করে জানতে চাইলেন আমার অবস্থান। জানানোর পর ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে চলে এলেন জাতীয় প্রেসক্লাবে। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ছোট দপ্তরে গিয়ে বসলেন। আড্ডা দিলেন কিছুক্ষণ। সন্ধ্যা মাড়িয়ে রাত। বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে হুকুম দিলেন তাঁর গাড়িতে উঠার জন্য। গাড়ি প্রেসক্লাব থেকে বের হওয়ার পর জানতে চাইলাম কোথায় যাচ্ছি? বললেন, চলো কোথাও কিছু খেয়ে নিব। সাধারণত সন্ধ্যায় তিনি ঘুমোন। এই সন্ধ্যা রাতে হঠাৎ খাওয়ার ঝোঁক!

বললেন, আজ ইচ্ছা করছে বলেই তিনি খেতে বেড়িয়েছেন। কোথায় যাচ্ছি, জানতে চাইলে বললেন তোমার জানাশোনা কোনো চাইনিজ রেস্টুরেন্টে নিয়ে চলো। নয়াপল্টনের এক রেস্টুরেন্টে এলাম। তিনটি ফ্লোরজুড়ে এ রেস্টুরেন্টের বিস্তার। প্রথম ফ্লোরে প্রবেশের মুখেই দেখি বেশ কয়েকজন আবদুল হামিদকে স্যার ও লিডার সম্বোধন করে সালাম দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলেন। ভাবলাম, হয়তো তিনি বিয়ের দাওয়াতে এসেছেন, তাই রসিকতা করে আমাকে জানিয়েছেন সন্ধ্যা রাতে তাঁর খাওয়ার ইচ্ছে জেগেছে। ভিতরে আসন গ্রহণের পর দলে-দলে বিয়ের নিমন্ত্রিত অতিথিরা এসে আবদুল হামিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। তারা যার যার পরিচয় জানাচ্ছেন।

এর মধ্যেই, এক ফাঁকে আবদুল হামিদ আমাকে বললেন, ‘তুমি কই নিয়া আইলা? এইডা তো বিয়ার অনুষ্ঠান!’ আমার সম্বিত ফিরে এলো। ঠিকই তো, তিনি তো এই রেস্টুরেন্টে আসতে বলেননি, আমিই তো তাকে নিয়ে এসেছি। কি করা যায়? বললাম, চলুন বেরিয়ে যাই। আরও কয়েক মিনিট কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম বেরিয়ে আসার। তার আগে এক বেলবয়কে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম উপরের তলায়ও কি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে? জানা গেলো, দ্বিতীয় তলায়ও বিয়ের অনুষ্ঠান। তবে, তৃতীয় তলায় সাধারণ কাস্টমারদের জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে। কি আর করা, অবশেষে পাত্র-পাত্রী দেখার নাম করে তাদের হাতে শুভেচ্ছা স্বরূপ কিছু টাকা তুলে দিয়ে আমরা বাইরে চলে এলাম।

বলতে হলো, আমরা খেতে নয়, শুভেচ্ছা জানাতেই এসেছিলাম। বলা বাহুল্য, শুভেচ্ছার টাকা আবদুল হামিদ আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, এটা তুমি তাদের হাতে দিয়ে বলে দিও বাইরে আমাদের কাজ আছে, তাই চলে যেতে হচ্ছে। খ্যাতির বিড়ম্বনা বোধহয় একেই বলে। বরপক্ষ ভেবেছিলেন, আমরা কনে পক্ষের অতিথি আর কনেপক্ষ ভেবেছিলেন আমরা বরপক্ষের অতিথি।

 

চার.

২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের প্রথম সভায় বিরোধীদলের নেতার পদে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচন করা হলেও উপনেতার পদটি ফাঁকা রাখা হয়। আবদুস সামাদ আজাদ ও জিল্লুর রহমানের মতো শীর্ষ সারির নেতারা এ পদের দাবিদার হয়ে লবিং করছেন। আবদুল হামিদ সদ্য বিদায়ী স্পিকার। ইতিমধ্যে সফলভাবে সংসদ পরিচালনা করে তিনি সকলের নজরও কেড়েছেন। সংসদের আসন বিন্যাসে বিরোধীদলের প্রথম সারির চার নম্বর আসনটি আবদুল হামিদের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। সংসদে বিরোধীদলের নেতার পাশের আসনটি ছিল আবদুস সামাদ আজাদ ও তারপরের আসনটি জিল্লুর রহমানের।

কথা প্রসঙ্গে একদিন সদ্য বিদায়ী স্পিকার আবদুল হামিদ জানালেন, তাঁর আগ্রহ উপনেতা হওয়ার। কেননা সংসদ ভবনের সব কিছুই তখন তার নজরাধীন। বললাম, কপালে রাজটিকা পরে জন্মেছেন আপনিই হয়ে যাবেন বিরোধীদলের উপনেতা। সে জন্যই এ পদে কাউকে নির্বাচিত করা হয়নি। তিনি বললেন, আমার জন্য লবিং করার কেউ নেই। যারা ছিলেন, তারাই এখন এ পদের দাবিদার। বললাম, নিজের আগ্রহের কথা নেত্রীকে নিজেই জানিয়ে দিন।

আমার কথা শুনে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘নিজের জন্য চাইতে জানলে তো এতদিনে ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি সবই অইতো। কিশোরগঞ্জের টিনের ঘরও পাকা অইতো।’ কথা প্রসঙ্গে আরও বললেন, ‘আমরার মিডামইনের বাড়িতে তো কখনো যাও নাই। গেলে দেখতা ৬ বারের এমপির ঘরে বালা (ভাল) বেড়াও নাই। হেলে (শিয়াল) যদি ঘরের এই মাথা দিয়া দৌড় দেয়, তা অইলে হেই মাথা দিয়া বাইর হইয়া যাইতে পারবো।’ কথাগুলি শেষ করে তিনি বললেন, ‘পারলে তোমরাই লবিং কর।’

আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের প্রায় সবাই আবদুল হামিদকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন। জিল্লুর রহমান থেকে শুরু করে আবদুস সামাদ আজাদ, আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদÑ সবাই ছিলেন আবদুল হামিদের লিডার। কিন্তু স্পিকার হয়ে যাওয়ার পর থেকে দু-একজন নেতার কাছে তিনি ঈর্ষার মানুষ হয়ে উঠেন। কেননা, স্পিকার হিসাবে তিনি তখন তাঁর পদ-পদবীর প্রটোকলের কারণেই বিশেষ সম্মানের অধিকারী হতেন। এটা দু-একজনের কাছে পছন্দনীয় ছিল না কিংবা তারা এটা সইতে পারতেন না। স্পিকার পদ থেকে সাবেক হয়ে যাওয়ার পরেও এই ঈর্ষা কারো-কারো মাঝে বিদ্যমান ছিল। এটা আবদুল হামিদ নিজেও জানতেন এবং বুঝতেন।

সাংবাদিক হিসাবে নয়, ছাত্রলীগের একজন প্রাক্তন কর্মী হিসাবে আওয়ামী লীগের যে কয়েকজন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল, তাদের সঙ্গে বিরোধীদলের উপনেতার পদ কে পেতে পারেন, তা নিয়ে যোগ-বিয়োগের আলোচনা হতো আমার। এই আলোচনায় একটা বিষয় জানতে পেরে বেশ পুলকিত হচ্ছিলাম। তারা কেউ-ই চাচ্ছিলেন না আবদুস সামাদ আজাদ কিংবা জিল্লুর রহমানের মতো সিনিয়র নেতা বিরোধীদলের উপনেতা হোক।

কারো ধারণা ছিল, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে উপনেতা করা হতে পারে। এই অবস্থায় ওই বছরের শবেবরাতের আগের দিন বিকালে চট্টগ্রামের কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্রনেতার সঙ্গে আমি গেলাম জননেত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির সুধাসদনে। চট্টগ্রামের রাজনীতি নিয়ে নানান আলোচনার এক পর্যায়ে সংসদে বিরোধীদলের উপনেতা কাকে করা হচ্ছে প্রসঙ্গটি উঠলো। বললাম, এ পদের যোগ্য মানুষ হচ্ছেন সাবেক স্পিকার আবদুল হামিদ। নেত্রী মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, আমার কাছেও ওনাকে ভাল লাগে। সংসদে ডেপুটি স্পিকার থাকাবস্থায় উনি আমাকেও ওভারলুক করার সাহস দেখিয়েছেন। পরে দেখেছি ওনার মুভ-ই ঠিক ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো সিনিয়র নেতারা তাকে মানতে চাইবেন কি না। মজার বিষয় হলো- পরেরদিন শবেবরাতের সন্ধ্যায় নেত্রীর ঘনিষ্ঠ এক তরুণ নেতা আমাকে ফোন করে জানালেন, আবদুল হামিদকে বিরোধীদলের উপনেতা হিসাবে মনোনয়ন দিয়ে নেত্রী (শেখ হাসিনা) স্পিকারের দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ আমিও ফোনে আবদুল হামিদকে শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্তের কথা জানাই।

তিনি জানতে চাইলেন সোর্স কি? বললাম- ‘নেত্রীর ঘনিষ্ঠ মানুষ।’ তিনি বললেন, ‘আমাকে তো কেউ কিছু জানায়নি। এমনকি নেত্রীর দপ্তর থেকেও।’ জানালাম, ‘আমি কনফার্ম।’ কিছুক্ষণ পর তিনি আবার আমাকে ফোন করে বললেন, ‘সংসদের অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে তিনি ফোনে কুশল বিনিময় করেছেন। যদিও এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানতে চাননি, তারপরও এমন কিছুর বার্তা পেলে তারা নিশ্চয়ই আমাকে জানাতেন।’

এবার আমার সন্দেহ হলো। মনে হলো- মজা করার জন্যেই শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ তরুণ ওই নেতা আমাকে এমন তথ্য দিয়েছিলেন। আমি ফোন ব্যাক করে যখন আবার জানতে চাইলাম, তখন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ওই নেতা বললেন, ‘এখনই যেন কাউকে কিছু না জানাই।’ আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। এ সময় এক পরিচিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে জানান আবদুল হামিদের বায়োডাটা দরকার। কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্ভবত তাঁকে ডেপুটি লিডার অব দ্য অপজিশানের পদ দেওয়া হয়েছে। এবার খুশিতে আমি টগবগ। তর-তর করে দু-এক কথা জানিয়ে ফের ফোন দিলাম প্রিয় নেতা আবদুল হামিদকে। ততক্ষণে তিনিও কিছুটা আভাস পেয়ে গেছেন। বললেন, আজ তো শবেবরাতের রাত। স্পিকারের দপ্তর বন্ধ। কাল সরকারি ছুটি। তার পরের দিন হয়তো প্রজ্ঞাপন হবে। হলোও তাই।

উপনেতা হওয়ার কয়েক মাসের পরে, সম্ভবত ২০০২ সালের অক্টোবরের ঘটনা। তদানীন্তন শাসক বিএনপি-জামায়াত জোটের অত্যাচারে বৃহত্তর বরিশালের আওয়ামী লীগের নেতারা নিজ অঞ্চল থেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন। এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ঢাকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারাও বরিশাল থেকে নাজেহাল হয়ে ফিরছিলেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা (যাদের বাড়ি ওই অঞ্চলে) বরিশাল গিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস করছিলেন না।

এ অবস্থায় উপনেতা হিসাবে আবদুল হামিদ বরিশাল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার সঙ্গী ছিলেন সে সময়ের যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি ও শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আতিকুর রহমান আতিক এমপি। সফর সঙ্গী সাংবাদিক হিসাবে কয়েকজনের বরিশাল যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বরিশালের সহিংস পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে অনেকেই কেটে পড়েন। সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ভোর রাতে বরিশাল লঞ্চ ঘাটে পৌঁছানোর পরেই আমরা আঁচ করলাম পরিস্থিতি খুব সুবিধার নয়। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে যারা সাহস দেখিয়ে লঞ্চ ঘাটে এসেছিলেন উপনেতাকে স্বাগত জানাতে, তাদের মুখমণ্ডলও ছিল আধোঢাকা। অনেকটা জলদস্যুদের মতো কাপড় দিয়ে আবৃত। সার্কিট হাউস ও স্থানীয় এক হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বিকালে প্রতিবাদ সমাবেশ হওয়ার কথা। তাই বিরোধীদলের উপনেতার সহকারী ব্যক্তিগত সচিব ফরিদ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে আমি শহরটি ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলাম।

দিনটি ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের আগেই বিএনপি-জামায়াতের সশস্ত্র ক্যাডাররা রণে সজ্জিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের কর্তারা সার্কিট হাউসে এসে উপনেতাকে জানালেন, মসজিদে নামাজ আদায় করতে গেলে দুষ্কৃতরা বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পারে। এ সব শুনে আবদুল হামিদ বললেন, তিনি মসজিদে গিয়েই নামাজ আদায় করবেন। বিপাক এড়াতে তড়িঘড়ি করে পুলিশের বাড়তি গাড়ি এনে জড়ো করা হলো সার্কিট হাউসের চারদিকে। আবদুল হামিদ জানালেন, তিনি গাড়িতে নয়, হেঁটেই মসজিদে যাবেন। এমন প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে বরিশালে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া কিংবা হেঁটে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের মসজিদে নামাজ আদায়ের অবিচল সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে এই নেতার সাহস পা থেকে মাথা পর্যন্ত। আমি তখন রিকশায় চড়ে শহর ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। নামাজ শেষে তিনি আবার সার্কিট হাউসে ফিরে এলেন। খোঁজ নিলেন আমাদের।

ইতিমধ্যে সার্কিট হাউস সংলগ্ন বিভিন্ন সড়ক ঘিরে অবস্থান নিয়েছে বিএনপির সশস্ত্র অনুসারীরা। তাদের হাতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়েছেন। দুজন ছাত্রনেতাকে বেদম প্রহারের পর রক্তাক্ত অবস্থায় কান ধরে রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন বিএনপির দুর্বৃত্তরা। সার্কিট হাউসে যাওয়ার পথে রিকশায় বসে আমরা নিজেরা এ সব প্রত্যক্ষ করলেও ভাবতে পারিনি এ পান্ডাদের তীর আমাদের জন্যও অপেক্ষা করছে। কড়া পুলিশি প্রহরার মধ্যে সার্কিট হাউসের প্রধান ফটকের সামনে রিকশা থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের উপরও হামলে পড়লো বিএনপির সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। নিজেদের পরিচয় প্রদর্শন করে পুলিশের সহায়তা চাইলেও নীরব ছিলেন পুলিশ কর্তারা। রক্তাক্ত জখমের এক পর্যায়ে পুলিশের এক কর্মকর্তার সহায়তায় আমাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি বাতিল করা হয়।

তবে বরিশালে বসেই আবদুল হামিদ সংবাদ সম্মেলন করে তার অন্য কর্মসূচি বহাল রাখেন। নানা রকম বাধা বিপত্তি ও হুমকি-ধামকির পরোয়া না করেই পরদিন তিনি ছুটে যান দ্বীপজেলা ভোলায়। সেখানে তার গাড়ির উপর মুহুর্মুহু বোমা হামলা চালায় বিএনপির পান্ডারা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল গণমাধ্যমে এই হামলার খবর ফলাও করে প্রচার হয়। আন্তর্জাতিক বেতার মাধ্যম বিবিসি আবদুল হামিদের কাছে ভোলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ছোট্ট এক মন্তব্যে পুরো বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন।

আবদুল হামিদ বলেন, ‘আমি এখন রামাল্লায় আছি।’ অর্থাৎ ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের উপর সে সময় রামাল্লায় উপর্যুপরি বোমা আক্রমণ করছিল ইহুদি সেনারা। এ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে তোলপাড় চলছিল। বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা পরে আবদুল হামিদের এমন দুঃসাহসী অভিযানের ভ‚য়সী প্রশংসা করেছিলেন।

কুদ্দুস আফ্রাদ: ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত