জওয়াবদাতা সলিমুল্লাহ...

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৮, ১৬:২১

সলিমুল্লাহ খান। হালনাগাদ বাংলাদেশের প্রধানতর চিন্তক, দার্শনিক। তথাপি কিতাব রচনা করিয়া খুউব যে আওয়াজ করিতে পারিয়াছেন তাহা নহে। বরঞ্চ অসরকারি দূরদর্শনের বাক-শো তাহার দৌড় আম দরবার অবধি বেশি বেশি পৌঁছাইয়া দিতে সক্ষম হইয়াছে। তাই আসমান সংস্কৃতি তাহার জন্য এবং আমার ন্যায় শ্রোতার জন্য আশীর্বাদ হিসাবে পরিগণিত হইয়াছে বটে।

গত দিন কতক তিনি ঢাকার সাহিত্যমোদী ফেইসবুক মহলে আলোচিত হইয়া আসিয়াছেন। কার্যকারণ কিন্তুক ছোটপর্দার আলোচনা নহে। পরস্পর প্রকাশিত একখানি সাক্ষাৎকার। প্রশ্নকত্তা কে এম রাকিব। জওয়াবদাতা সলিমুল্লাহ খান। চিন্তা নহে, দর্শন নহে- প্রসঙ্গ সেইখানে বাংলা সাহিত্য। বাক-শো মারফত জানিতে পারিয়াছি রাজনীতি-অর্থনীতি-রাষ্ট্র-সমাজ-ইতিহাস-সংস্কৃতি নানাবিধ বিষয়ে গভীর পঠন-পাঠন সলিম স্যারের। তো পরস্পরের আলাপে সেই ভাবনায় অনেকখানি ধাক্কা লাগিয়াছে। আমার মনে হইয়াছে বাংলাদেশে যাহাদের সাথে যোগাযোগ ছিল নতুবা রইয়া গিয়াছে তাহাদের বাহিরে আর কাহারো সাহিত্যে কখনোই আগ্রহ বোধ করেন নাই সলিম স্যার। আর যতক্ষণ সম্পর্ক বর্তমান ততক্ষণ সেই লেখক বড় লেখক; যখনি তাহার সাথে লেখকের দূরত্ব বাড়িয়াছে, তাহাকে তিনি অলেখক প্রমাণ করিয়া আনন্দ পাইয়াছেন। তাই সলিম সাহেবের মত মতো বাংলার সেরা লেখক হিসেবে থাকিয়া যাইবেন আহমদ ছফা। কারণ যিনি বা যাহারা পৃথিবী হইতে বিগত হইয়াছেন তাহাদের সাথে তো আর সম্পর্ক অবনতি হওয়ার কোনো কারণ থাকিবার সুযোগ নাই। তাই তো তাহার বচন:

‘‘প্রবীণ বটের কাছে তো অনেক আগের লেখা। শেষ বয়সে তিনি ‘কবি ও সম্রাট নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন। লেনিন ঘুমাবে এবার বইতে। এইটা একটু পড়েন আপনি। আমি ওটাকে একটা ভালো কবিতা মনে করি। মানে আমাকে বোঝার জন্যে আমি ভালো কবিতার একটা উদাহরণযোগে সংজ্ঞাই দিচ্ছি। আমি রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো কবিতাও পছন্দ করি।’’

তবে কি রবীন্দ্রনাথের বেশিরভাগ কবিতাই তাহার অপছন্দের? রবীন্দ্র-সান্নিধ্য পেলে বিষয়টা কী উল্টা হতো?

পরস্পর বৈঠকের বড় আবিষ্কার কবি সলিমুল্লাহ খান। এই যাবত তাহাকে দর্শনের বলিয়া জানিয়া আসিয়াছি। তিনি-ও যে কবি তাহা আমার ক্ষুদ্র জানাশোনার পরিধির বাহিরেই রহিয়া গিয়াছিল। কিন্তুক এইটা স্পষ্ট যে দশক দশক কবির হিসাব নিয়ে শাস্ত্র কম পাঠ করি নাই। সেই সব তালিকায় না সত্তর, না আশি- কোথাও সলিম সাহেবের কবি নামখানি পাই নাই। এবার আলাপে নিজেকে শুধু কবি হিসাবেই চেনান নাই, বাংলাদেশের কবিতার জাতও বিচার করিয়াছেন। যাহা আমার মোটেই মনঃপুত হয় নাই। বরঞ্চ মনে হইয়াছে এই দেশের কবির জাত বুঝি মারা গেল! কারণ সলিম স্যারের বিচারে গাছ-মাছ এক হইয়া গিয়াছে। যেমন তিনি আবুল হাসান আর নির্মলেন্দু গুণকে একই কাতারে বসাইয়াছেন। সম-মর্যাদা দিয়াছেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহন রায়হানকে। অথচ যাহারা কবিতা নিয়ে সামান্য নাড়াচাড়া করেন তাহারাও জানেন বাংলাদেশের কবিতায় যারা অনেক বেশি ভিন্ন কণ্ঠস্বর হইতে পারিয়াছেন, যাহারা বিরলপ্রজ তাহাদের তালিকায় আবুল ও রুদ্র যতটা জায়গা করিয়া নিতে পারিয়াছেন তাহা বাকি দুই জন পারেন নাই। ‘এমনকি সাজ্জাদ শরিফও খারাপ কবি নন,- সলিম সাহেবের এমন উচ্চারণে নবীন পাঠককুলের মনে হইতে পারে সাজ্জাদ শরিফ গড়পড়তা কবি। অথচ তাহার শত্রুও কবুল করিবেন তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন ভাষা দান করিবার গৌরব অর্জন করিয়াছেন। সলিম স্যার গদ্যকার শাহাদুজ্জামানকে যে ভাষায় আক্রমণ করিয়াছেন, তাহা আর উদ্ধৃত করিতে চাহি না। উপহাস করিয়াছেন ব্রাত্য রাইসুর সৃজনক্ষমতা, দলাইমলাই করিয়াছেন কুতর্কের এই দোকানির নাম পর্যন্ত। সেটা আমার দ্রষ্টব্য নয়। কারণ সলিম স্যার তাহার এক কালের গুরু, বন্ধু, শিষ্য, উর্ধ্বতন, অধ্বস্তন- এই বৃত্তের মধ্যেই ঘোরপাক খাইয়াছেন। নিজেরা নিজেরা দলাদলি করুন তাহা ঠিক আছে, কিন্তুক কুয়োর বাইরে না গিয়েই বাংলা সাহিত্যের তুলাদণ্ড হাতে লইবার ভার নেয়া কতটা ঠিক- সেই প্রশ্ন পাঠক হিসাবে করিবার অধিকার আমার আছে।

তায়েব মিল্লাত হোসেন: কবি ও সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত