এবার শোলাকিয়ায় ড্রোন নিরাপত্তা

আমিনুল হক সাদী, কিশোরগঞ্জ
| আপডেট : ১৩ জুন ২০১৮, ২৩:৫৮ | প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৮, ১৯:২৫

ড্রোনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে কঠোর নিরাপত্তায় এবার অনুষ্ঠিত হবে শোলাকিয়ার ঈদ জামাত। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে প্রতি বছর দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ধারণা করা হয় এ জামাতে তিন লক্ষাধিক মুসল্লি একসঙ্গে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন।

শোলাকিয়া মাঠের জামাতের প্রতি মুসল্লিদের আকর্ষণ ও বিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। ফলে প্রতি বছরই জামাতের কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু শোলাকিয়া ময়দানের বৃহৎ ঐতিহ্য সত্ত্বেও এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো নয়। সাধারণ মেহরাব ও একটি তোরণ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী এ মাঠের তেমন কোনো স্থাপত্য সৌন্দর্য নেই। মুসল্লিরা মাটিতেই নামাজ পড়ে থাকেন। বৃষ্টি হলে কর্দমাক্ত মাঠে বিপাকে পড়েন তারা।

প্রতি বছর ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ যথাক্রমে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয় এখানে। শোলাকিয়া ঈদগাহের জামাত শুধু দেশের নয় উপমহাদেশেরও বৃহত্তম ঈদ জামাত হিসেবে বিবেচিত। হারমাঈন-শরিফাঈনের পর শোলাকিয়া ঈদগাহে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে। মসনদ-ই-আলা ঈশাখাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খানের উত্তরসূরি দেওয়ান মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে ৪.৩৫ একর ভূমি শোলাকিয়া ঈদগাহকে ওয়াকফ করে দেন। এ মাঠের বর্তমান জমির পরিমাণ ৬.৬১ একর। অবশ্য অজু করার পুকুর, মাঠ ও প্রস্রাবখানা মিলিয়ে মাঠের সর্বমোট পরিমাণ প্রায় ৭ একর। মাঠে প্রবেশের মূল সড়কে একটি তোরণ ও একটি দোতলা মিম্বর রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একটি বৃহৎ ও পুরাতন জনবসতি এলাকা শোলাকিয়া স্থানটির পূর্বনাম ছিল রাজাবাড়িয়া। কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্বউত্তর কোনে নরসুন্দা নদীর অববাহিকায় শোলাকিয়া এলাকাটির অবস্থান।

জনশ্রুতি আছে, শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রথম বড় জামায়াতে সোয়া লাখ মুসল্লি অংশ নিয়েছিলেন।  অন্য মতে মুঘল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া, সেখান থেকে বর্তমান শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি।

দেওয়ান মান্নান দাদ খান যে জমি ১৯৫০ সালে ওয়াকফ করেছেন, সেই ওয়াকফনামায় ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে বলে লেখা আছে। সে হিসাবে মাঠের বর্তমান বয়স ২৬২ বছর।

এ ছাড়া জানা যায়, ১৮২৮ সাল থেকে জঙ্গলবাড়ীর জমিদার এ মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকে বড় জামাত শুরু হয়। সে হিসাবে আগামী ১ শাওয়াল শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদুল ফিতরের ১৯১তম জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৫০ সাল থেকে ওয়াকফের দলিলমূলে হয়বতনগর জমিদারবাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খান থেকে বংশানুক্রমিক জ্যেষ্ঠ ছেলেরা  শোলাকিয়া ঈদগাহের মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে দেওয়ান ফাত্তাহ দাদ খান মঈন মোতাওয়াল্লি ও দেওয়ান মো. রউফ দাদ খান নায়েবে মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি মাঠ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।

১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় জামায়াতের ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমদ। শোলাকিয়া ঈদগাহে যুগে যুগে খ্যাতনামা আলেমরা ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এবার ইমামতি করবেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ।

শোলাকিয়া ঈদগাহের ২৬৫টি কাতারে লাখো মুসল্লি নামাজে দাঁড়ান।

ঈদের নামাজ মাঠে পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদা। যে জামায়াতে মুসল্লি যত বেশি হয় ছওয়াবও তত বেশি, গোনাহ মাফ হয়- এ বিশ্বাস থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা এখানে ঈদের নামাজ পড়তে আসেন।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের এ বিশাল জামায়াতে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মুসল্লি নামাজে অংশ নেন।

জামাত শুরুর মুহূর্তে মাঠের অনুচ্চ প্রাচীরের বাইরের সড়ক, নদীর পাড় এবং আশপাশ এলাকায় মুসল্লিদের কাতার ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অংশ নেয়া মুসুল্লির সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যায়।

ঈদের জামাত ঘিরে ময়দানের পশ্চিম পাশে বসে মেলা। এই মেলাও বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। মেলায় বেতের সুন্নতি লাঠি, বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীসহ নানা পসরা মুসল্লিদের আকৃষ্ট করে।

আড়াই শত বছরের পুরনো শোলাকিয়া ঈদগাহটি ঐতিহ্যের তুলনায় উন্নয়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। কিশোরগঞ্জের সুশীল সমাজ ঈদগাহের সামনের পৌরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন গরুর হাটটি মাঠের অনুকূলে ব্যবহার ও বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছেন।

ঈদগাহ কমিটির কার্যক্রম শুধু ঈদকেন্দ্রিক হওয়ায় সারা বছর রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো তৎপরতা থাকে না। শোলাকিয়া ঈদগাহকে ‘শোলাকিয়া আন্তর্জাতিক ঈদগাহ’ নামকরণ এবং মুসল্লিদের সুবিধার্থে মাঠের পরিসর বাড়ানোসহ উন্নয়নের দাবি দীর্ঘ দিনের।

ঈদুল ফিতরের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামায়াতে অংশ নিতে ইচ্ছুক মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে তিনটি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে। ভৈরব-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) ট্রেনটি ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। এটি পরে ভৈরবের উদ্দেশে কিশোরগঞ্জ থেকে ছাড়বে দুপুর ১২টায়।

ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) ট্রেনটি ময়মনসিংহ থেকে ছাড়বে সকাল ৫.৪৫ মিনিটে, কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮.৩০ মিনিট। এটি পরে দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।

দেশে প্রথমবারের মতো নরসিংদী জেলা পুলিশ ড্রোনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেয় গত ২৭ মে। সেদিন নরসিংদী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ড্রোন দিয়ে পরীক্ষামূলক মহড়ার পর ৬ জুন থেকে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির জন্য তিনটি ড্রোন উড়াচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ জানান, এত বিশাল ঈদ জামাতের জননিরাপত্তায় ড্রোন ব্যবহার খুবই কার্যকর হবে। এ জন্য শোলাকিয়ার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ড্রোনের ব্যবহার যুক্ত করা হয়েছে।

নাশকতা ও জঙ্গি তৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য ঈদগাহ মাঠ ও মাঠের আশপাশের এলাকায় ড্রোনে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ঈদগাহ ময়দান, আশপাশের এলাকা, অলিগলিসহ মাঠসংলগ্ন চারপাশের অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকা ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। মাঠে স্থাপন করা হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। এর চারটিতে পুলিশ ও দুটিতে র‌্যাবের সদস্যরা অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তা তদারক করবেন।

ইতিমধ্যে ঈদগাহ মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহর ও আশপাশের এলাকায় বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। বিজিবি, র‌্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, আরআরএফসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় হাজারের বেশি সদস্য দিয়ে নিরাপত্তা বলয় রচনা করা হয়েছে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে কেন্দ্র করে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানান, ঈদগাহ ময়দানের ২১টি প্রবেশপথের মধ্যে মুসল্লিদের জন্য ছয়টি প্রবেশপথ খোলা রাখা হবে ঈদের দিন। সেসব প্রবেশপথে স্থাপিত আর্চওয়ে দিয়ে মুসল্লিদের ঢুকতে হবে ঈদগাহ ময়দানে। এর আগে আরো অন্তত তিন দফা মেটাল ডিটেক্টরে ময়দানমুখী মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করা হবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে ঈদগাহে আগত মুসল্লিদের কেবল পাতলা জায়নামাজ ছাড়া ছাতা বা কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে না ঢুকতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের দিন শোলাকিয়া ঈদগাহের চেকপোস্টে হানা দেয় জঙ্গিদল। ওই হামলার ঘটনায় জঙ্গিসহ প্রাণহানি হয় তিনজনের। সে বছর ঈদ জামাতের ইমামতি করার কথা ছিল ফরীদ উদ্দীন মাসউদের। পরে চার লাখ মুসল্লির বৃহত্তর ঈদুল ফিতরের জামাতে নেতৃত্ব দেন ইমাম মাওলানা শোয়াইব বিন আবদুর রউফ।

তারপর থেকেই শোলাকিয়ার ঈদ জামাতকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়।

প্রথমবারের মতো ২০০৬ সালে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া এনটিভি সরাসরি সম্প্রচার করে এ বড় জামায়াতের। এরপর থেকে প্রতিবারই চ্যানেল আই সরাসরি সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এবারও চ্যানেল আই সরাসরি সম্প্রচার করবে।

(ঢাকাটাইমস/১৩জুন/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত