সুলতানা জামান: বাংলা চলচ্চিত্রের আভিজাত্য

শামীমা চৌধুরী
 | প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৮, ১০:২০

সুলতানা জামান এ দেশের চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি। পঞ্চাশ আর ষাট দশকে এ দেশের বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকরা তখন সুচিত্রা-উত্তম, দিলীপ কুমার-মধুবালার পর্দার রোমান্টিসিজমের জোয়ারে ভাসছে। ঠিক এ সময় এ দেশের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া তরুণী মিনা তাদের দৃষ্টি ফেরাল এ দেশের সিনেমা পর্দার দিকে। অভিনয় প্রতিভার সাথে এক ফ্যাশন আইকনকে পেল এ দেশের সিনেমাপাগল দর্শক। সুচিত্রা সেনের পরে তার শাড়ি পরার স্টাইল, ব্লাউজের কাট, চুলের স্টাইল ফলো করতে হুমড়ি খেল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীরা।

একে তো এক অভিজাত মুসলিম পরিবারে জন্ম-তারপর বিয়েও হয় আরেক অভিজাত মুসলিম পরিবারে। বিয়ের পর হয়ে গেলেন দায়িত্বশীল গৃহবধূ। বয়স কম হলেও স্বামী-শ্বশুরবাড়ির লোকজনের প্রতি সজাগ দৃষ্টি ছিল তার। সংসারের সবার মন কেড়ে নেন তিনি। এ লাজুক ঘরমুখো টুকটুকে মেয়েটিই একদিন কিনা হয়ে গেল এ দেশের সাড়া জাগানো অভিনেত্রী। এবং ষাটের দশকের অন্যতম ফ্যাশন আইকন।

সুলতানা জামান সামাজিক, লোককাহিনিভিত্তিক, ফ্যন্টাসি, সাহিত্যনির্ভর এবং পোশাকি ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসিত হন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটির পাহাড়, জোয়ার এলো, সোনার কাজল, চান্দা, মালা, অনেক দিনের চেনা, জানাজানি, নতুন দিগন্ত, উজালা, পরওয়ানা, ময়ূরপঙ্খী, মনের মতো বউ, শাহজাদা, তৃষ্ণা, নিশান যাদুর বাঁশি, অগ্নিশিখা, জংলি ফুল, বেয়াকুফ, আবার বনবাসে রূপবান, মিশর কুমারী, নয়নমণি ইত্যাদি। বাংলা-উর্র্দু মিলিয়ে প্রায় ৫০টির মতো ছবিতে অভিনয় করেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে হলে, চলচ্চিত্রে নারীর অবদান জানতে হলে, বারবার উচ্চারিত হয় এ নামটি, তিনি সুলতানা জামান। পঞ্চাশ দশকের প্রায় শেষ থেকে পুরো ৬০ দশক তিনি তার অভিনয় ও ফ্যাশন দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন তৎকালীন চলচ্চিত্রের ভুবনকে। অনেকটা সুচিত্রা সেনের সাথে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে তারকা হয়ে ওঠেন তিনি। তৎকালীন চিত্রালী, ঝিনুক, চিত্রাকাশ চলন্তিকা তারকালোক, মর্নিং নিউজ, চিত্রিতা, অবজারভার, সংবাদ, ইত্তেফাক, বেগমসহ সব পত্রিকায় তার ছবি, সাক্ষাৎকার, তাকে নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি প্রকাশিত হতো। তিনি লাক্স বিজ্ঞাপনের প্রথম দিকের তারকাদের একজন। এমন একসময় গেছে যখন সিনে পত্রিকা বা সাপ্তাহিক বেগমের প্রচ্ছদে তার ছবি ছাপা হলেই পত্রিকার কাটতি বেড়ে যেত।

১৯৩৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর নাটোরের সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে তার জš§। বাবা সৈয়দ আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন তৎকালীন নাটোরের রুক্ষিণী স্টেটের জমিদার। মা রহিমা খাতুন ছিলেন গৃহবধূ। তিনি সে সময়ের একজন সুশিক্ষিত নারী। ৯ ভাইবোনের মধ্যে সুলতানা জামানের স্থান দ্বিতীয়। সুলতানা জামানের পারিবারিক নাম হোসনে আরা শরিফা বেগম। বাবা-মা দুজনই ছিলেন সংস্কৃতিমনা, শিক্ষানুরাগী। পরিবারের সবাই জড়িত ছিল নানা সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মে। নাটোর শহর ছাড়াও বৃহত্তর রাজশাহীর প্রতিটি সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে জমিদার পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করতেন বাড়ির মেয়েদের বাইরে যাওয়ার তেমন সুযোগ না থাকলেও বাড়িতে ওস্তাদ রেখে সংগীতের তালিম দেওয়া হতো। শিশু মীনার গানের কণ্ঠ ছিল অপূর্ব। তবে নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল তার বেশি। তবে এ পরিবারের কোনো মেয়ে সিনেমায় অভিনয় করবে, এটা ছিল অকল্পনীয়।

নাটোর শহরের মিরপাড়ায় কেটেছে তার জীবনের আনন্দময় শিশু ও কৈশোরবেলা। বান্ধবীদের সাথে বেণী দুলিয়ে যে ফুটফুটে মেয়েটি স্কুলে যেত, সেকি কখনও ভেবেছিল একদিন রুপালি পর্দাজুড়ে থাকবে তার নাম? মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে তাকে দেখার জন্য? তিনি নাটোর গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। মাঝে তিন বছর রাজশাহীর কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। কারণ তার বাবা-মা চাইতেন তাদের সন্তানরা বাংলার পাশাপাশি যেন ইংরেজিতেও পারদর্শী হয়। ঠিক সেভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল কিশোরী মীনাকেও। ইংরেজি ভাষার ওপর ছিল তার বিশেষ দক্ষতা। পরে রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। বিএ পড়ার সময় ১৯৫৬ সালে চিত্রগ্রাহক কিউ এম জামানের সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি এ দেশের প্রথম চলচ্চিত্র মুুখ ও মুখোশেরও চিত্রগ্রাহক ছিলেন। এ বিয়ে পালটে দেয় তার জীবন। স্বামীর অনুপ্রেরণায় চলচ্চিত্রে রঙিন জগতে তার প্রকাশ ঘটে।

জীবনের প্রায় শেষ দিকে মৃত্যুর মাস কয়েক আগে আমার সাথে এক আলাপচারিতায় তিনি তার ব্যক্তিজীবন ও চলচ্চিত্রজীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সাংস্কৃতিক জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

“পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতেই চলত আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা। গান-বাজনা, আবৃত্তি, নাট্যচর্চা সবই হতো। আসলে টোটাল উত্তরবঙ্গই ছিল তখন সাংস্কৃতিক চর্চাক্ষেত্রে বেশ উন্নত। তখন ভারতের সিনেমা চলত বিভিন্ন হলে। পরিবারের সবার সাথে যেতাম সিনেমা দেখতে। নার্গিস, মিনা কুমারী, মধুবালা, কানন দেবী- এর বেশ পরে সুচিত্রা সেনের শাপমোচন দেখে বাসায় এসে ওদের নকল করতাম, স্টাইল করতাম। বাড়িতে গ্রামোফোন রেকর্ডে ওদের গান শুনতাম। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর ঢাকায় চাচাতো ভাই এ টি এম শহিদুল আলমের বাসায় বেড়াতে আসি। সেখানেই পরিচয় হয় কিউ এম জামানের সাথে (কাজী মেজবাউজ্জামান)। তখন তিনি বেশ জনপ্রিয় ক্যামেরাম্যান। সবাই তাকে সম্মানের চোখে দেখে। প্রথম পরিচয়েই আভিজাত্য, শিক্ষিত, সুদর্শন, ভদ্র, মার্জিত এ মানুষটিকে রীতিমতো ভালোবেসে ফেললাম। বয়সটাও ছিল আমার প্রেমে পড়ারই মতো- ষোলো থেকে সতেরো। বিয়েটা হয় পারিবারিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই। আব্বাও চাইছিলেন আমার এমন ছেলের সাথে যেন বিয়ে হয়, যিনি আমাকে সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহ জোগাবেন। আমাদের বিয়ে হলো ১৯৫৬ সালে।

বিয়ের পর ওনার সঙ্গে বিভিন্ন ফিল্মি পার্টিতে গেছি। লক্ষ করতাম ওনাকে সবাই খুব সম্মান করে। ইন্ডাস্ট্রিতে ওনার খুব চাহিদা। আমাদের বাসাতেও ফিল্মের লোকজন আসতেন। তিনি সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিতেন। ওনার মধ্যে কোনো গোঁড়ামি ছিল না। ফিল্মের এক অনুষ্ঠানে চিত্রালীর সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ ও তার বোন লায়লা আরজুমান্দ বানুর সঙ্গে আলাপ হয়। চমৎকার দুই ভাইবোন। আসলে তখন চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে অনেক অভিজাত মুসলিম পরিবারের লোকজন জড়িত ছিল। পারভেজ ভাই আমাকে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। তখন পারভেজ সাহেবের প্রযোজনায়, মহিউদ্দিন সাহেবের পরিচালনায় ‘মাটিার পাহাড়’ ছবির প্রস্তুতি চলছে। নায়ক কাফি খান। পরে উনি ভয়েস অব আমেরিকায় চলে যান। জামান সাহেব ক্যামেরাম্যান। আমি তো অবাক! জামান সাহেব বোঝালেন এই একটি ছবি করো, পরে ভালো না লাগলে আর করো না। অবশ্য এর মধ্যে সুচিত্রা-উত্তমের ছবি দেখে ফেলেছি কয়েকটি। সুচিত্রা সেনের অভিনয়-স্টাইলে মুগ্ধ আমি। সত্যি বলতে কি সুচিত্রা সেনের কারণে মনের এককোণে ছিল অভিনয়ের শখ। যদিও তা প্রকাশ করিনি। তারপর তো একদিন ভয়ে ভয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। আমার ফিল্মি নাম দেওয়া হলো রাজিয়া। রিলিজের পর চারদিকে আমার অভিনয়ের প্রশংসা। ভালো অভিনয়ের জন্য পেলাম চিত্রাকাশ পুরস্কার। চিত্রাকাশ পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন পরিচালক আজিজুর রহমান। আমাকে নিয়ে চারদিকে হইচই।

এরপর দুই বছর কোনো কাজ করিনি। প্রথম সন্তান কোলে এলো। ওকে নিয়ে মেতে থাকলাম। ফিরিয়ে দিতে লাগলাম একের পর এক প্রস্তাব। আমার সন্তান তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি। ওকে আমি চোখে হারাতাম। ও একটু বড় হলে আবার শুরু হলো অভিনয়। আমার দ্বিতীয় ছবি আব্দুল জব্বার খানের ‘জোয়ার এলো’। নায়ক আমিনুল হক। এবার আমার নাম হলো মীনা জামান। ছবিটি দারুণ ব্যবসাসফল হলো। এরপর অভিনয় করলাম জহির রায়হানের ‘সোনার কাজল’ ছবিতে। বিপরীতে নায়ক খলিল। এরপর সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম উর্দু ছবি ‘চান্দা’তে অভিনয় করি। পরিচালক এহতেশাম বিপুলভাবে প্রশংশিত হন ছবিটির জন্য। ত্রিভুজ প্রেমের সংগীতবহুল ছবি ছিল এটি। এ ছবির জন্য আমাকে নাচতে হয়। অথচ আমি ভালো নাচতে পারতাম না। দেবুদা আমাকে রীতিমতো ধরে ধরে নাচ শিখিয়েছিলেন। ছবিটি রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করে। পত্রপত্রিকায় কেবল আমার অভিনয়ের প্রশংসা। মুস্তাফিজ পরিচালিত তখনকার প্রথম সিনেস্কোপ রঙিন ছবি ‘মালা’তে অভিনয় করেন এরপর। সারা দেশে তো বটেই ঢাকার গুলিস্তান হলে একটানা ২৫ সপ্তাহ ধরে ছবিটি চলেছিল। নায়ক ছিলেন আজিম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাপরে সে কী কঠিন কাজ! সাপের সাথে অভিনয়। যেটিকে দেখলে আমি সবচেয়ে ভয় পাই। সাপের সাথে অভিনয় করতে গিয়ে কতবার যে কাট হয়েছিল। জলে, জঙ্গলে, মাঠে-ঘাটে শুটিং। এ ছাড়া উপায় ছিল না। তখন তো এত আধুনিক ফ্লোর ছিল না। নায়ক আজিম আমাকে খুব সহযোগিতা করতেন।

 এরপর আমি একে একে কাজ করি খান আতাউর রহমানের আরেক দিনের চেনা, ফতেহ লোহানীর সাতরং, আলী মনসুর পরিচালিত জানাজানি, নাজির আহম্মেদ পরিচালিত ‘দুই দিগন্ত’ চলচ্চিত্রে। জংলি ফুল, মিশর কুমারী, উজালা, পরওয়ানা, ময়ূরপঙ্খী, আবার বনবাসে রূপবান কত ছবিতে কাজ করা হলো। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে কাজ করেছি।”

উর্দু ছবিতে কেন কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রে বাজার সম্প্রসারণ এবং ঢাকাতেও যে ভালো ছবি হয়, এ কথা পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে তুলে ধরার জন্যই উর্দু ছবিতে কাজ করেছি। পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে ঢাকার অভিনেত্রীদের মধ্যে আমি, শবনম, সুমিতা দেবীর জনপ্রিয়তা ও অভিনয়শৈলী ঈর্ষণীয় ছিল। লাহোরের জেবা, রাণী, শামীম আরা, দীবা এদের মতো গ্ল্যামারাস নায়িকাদের সাথে টক্কর দিয়ে আমরা অভিনয় করেছি। অর্জন করেছি অনেক পুরস্কার।’

দেশের এখনকার ছবি ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ জগতের সাথে আমার তেমন যোগাযোগ নেই। তবে যেটুকু বুঝি তাতে দেখি এখন ছবি নির্মাণের কৌশল, ধারা বদলে গেছে। সবকিছু খুব আধুনিক হয়েছে। এমনকি গানের সুর, কথাও বদলে গেছে। অনেকে খুব ভালো অভিনয় করছে। ছবি দেখা তেমন হয় না তবে টিভিতে যা দেখি তাতে মনে হয় মৌসুমী, শাবনুর, ফেরদৌস, রিয়াজ ভালো অভিনয় করছে। শাকিব খানকে দেখতে বড্ড ভালো লাগে। বাজার যা ডিমান্ড করে, সেটিই তো করতে হবে।

অভিনয় জগতে না থাকলেও এখনও কিছু আক্ষেপ, কষ্ট তার আছে। তিনি বলেন, ‘আমি বেশির ভাগই সে সময়ের বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছি। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নিহারঞ্জন গুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার- তাদের লেখা কোনো চরিত্রে আমার অভিনয় করা হয়নি। সংগ্রামী নারী চরিত্রে অভিনয় করা হয়নি। করলে ভালো হতো।

 কলকাতায় সুপ্রিয়া দেবী, সৌমিত্র, ঢাকায় ববিতা, ডলি জহুর বয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করছে। আপনি কেন করলেন না? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করার অনেক অফার আমি পেয়েছি। কিন্তু রাজি হয়নি। কারণ আমার অভিনয়জীবনের মূল প্রেরণা ছিলেন আমার স্ব^ামী জামান সাহেব। আমি তো দেখেছি বেশি সুযোগ পেতে, বেশি জনপ্রিয় থাকতে কত নায়িকার সংসার ভেঙেছে। কত দুর্নাম হয়েছে। আমি ছিলাম এর ঠিক বিপরীত। আমার প্রতিটি ছবির পেছনের মানুষ ছিলেন আমার স্বামী। সন্তানদের মানুষ করা ছিল আমার প্রধান দায়িত্ব। এরপর জামান সাহেবের হার্ট অ্যাটাক হলো। আমার মাথার মাইগ্রেনের যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে উঠল ইত্যাদি কারণে স্বেচ্ছায় ছবির জগৎ ছেড়ে আসি। আর স্বামীর মৃত্যু আমাকে একেবারেই চলচ্চিত্র বিমুখ করে তোলে। তবে এ জগৎ আমাকে অনেক খ্যাতি দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে, সচ্ছলতা দিয়েছে। তাই এ জগতের প্রতি আমার ভালোবাসা অম্লান।

অভিনীত ছবির নায়কদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আমিন, হারুন, খলিল, আজিম- তাদের সাথে বেশি অভিনয় করেছি। এরা সবাই সে সময়ের অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাদের আচরণও ছিল রুচিসম্মত-ভদ্র। সবাই ছিল সুদর্শন ও রোমান্টিক, সেই সাথে ভালো অভিনেতা। পর্দার বাইরে তারা আমাকে ভাবি বলেই ডাকতেন।

সুলতানা জামান সে সময়ের জনপ্রিয় সব সিনে পত্রিকার প্রচ্ছদকন্যা হতেন। তার ফ্যাশনদুরস্ত প্রচ্ছদের কারণে পত্রিকার কাটতিও বেড়ে যেত। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি বহুবার চিত্রাকাশ, ঝিনুক, চিত্রালী, পূর্বাণী, বেগম পত্রিকার প্রচ্ছদকন্যা হয়েছি বটে তবে বেগম পত্রিকায় প্রচ্ছদকন্যা হয়ে নারীদের মধ্যে সাড়া জাগাতে পেরেছিলাম, এটা সত্যি। এতে আমি গর্বিত।

পুরস্কার সম্মাননা

সুলতানা জামান দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। প্রথম জীবনে মাটির পাহাড় ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে চিত্রাকাশ পুরস্কার পান ১৯৫৯ সালে। এরপর চান্দা ছবিতে সহ-অভিনেত্রী হিসেবে নিগার পুরস্কার দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ‘মালা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য নিগার পুরস্কার লাভ করেন। বেশ কিছু উর্দু ছবিতে সাইন করেও ছেড়ে দেন। কারণ ঢাকা ছেড়ে দীর্ঘদিন লাহোরে থাকতে হবে বলে। নাটোরের রানী ভবানী পদক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন (১৯৯৯), একই বছর বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

জাতীয় পুরস্কার ২০০৯-এ আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে সুলতানা জামানকে। এ ব্যাপারে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন সত্যিই আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। বারবার জামান সাহেবের কথা মনে পড়ছিল। হুইলচেয়ারে করেই নিজে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিতে পেরে আনন্দিত হয়েছি। ভালো লেগেছে এই ভেবে যে, আমাকে সবাই মনে রেখেছে। আমি প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এ জন্য। উল্লেখ্য, একই বছর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদও তাকে চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত করে।

 সুলতানা জামান বেতার নাটকের সাথেও যুক্ত ছিলেন। বেতারের বেশ কিছু নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। আতিকুল হক চৌধুরীর ক্রীতদাসের হাসি, তাজমহল, কবি হাফিজ কাশমেরির জাফরান নাটকেও অভিনয় করেছেন। এ ছাড়া রেডিওতে গানের ডালি ও ছায়াছন্দসহ বেশ কিছু অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে বিটিভিতে একটি নাটকে অভিনয়ও করেন।

অভিনয়ে অংশ নেওয়ার আগে তিনি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন। লাক্স সাবান, আলম ছাতা, ভিটাকোলা, তিব্বত সাবান ইত্যাদি বিজ্ঞাপনচিত্রে তিনি অভিনয় করেন।

সুলতানা জামান বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। চ্যারিটি ক্রিকেট খেলায়ও অংশ নিতেন। প্রথম চ্যারিটি ক্রিকেট ফেস্টিভ্যালে যোগ দিতে তিনি মারির পিন্ডিতে গিয়েছিলেন।

সাংগঠনিক দিক থেকে তিনি ছিলেন দক্ষ। তিনি এ দেশে প্রথম যে শিল্পী সমিতি গড়ে ওঠে, তার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের ফিল্ম অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন তিনি। তিনি ফিল্ম সেন্সর বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া জোনটা বিজনেস ক্যারিয়ার ওমেন ক্লাব, বেগম ক্লাব, ধানমন্ডি মহিলা সমিতির সদস্য ছিলেন।

সুলতানা জামান আপাদমস্তক একজন সৃজনশীল মানুষ ছিলেন। তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও করতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘কলঙ্কিনী লায়লা’ ও ‘সাগরের নীল চোখ’। আমার পৃথিবী, শুভক্ষণ, সুদূর নীহারিকা, তাজমহল নামে কবিতা লিখেছেন। তাজমহল কবিতাটি তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ যখন আগ্রার তাজমহল দেখতে গিয়েছিলেন, তখন লেখা। সরকারের তথ্য ও প্রকাশনা অধিদপ্তর তাকে নিয়ে যে প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করেছে সেখানে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, অপূর্ণ ইচ্ছা একটাই। আমি লেখালেখি করতাম। আর লিখতে পারি না। এটাই আমার মনের একটা অপূর্ণতা আর কি!

 সুলতানা জামান দুই সন্তানের জননী। ছেলে কে এম শরফুজ্জামান বাপি। মেয়ে মেরিনা জামান। বর্তমানে তারা দুজনেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। নাতিও আছে একজন।

সুলতানা জামান অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী ছিলেন। সেই সাথে ছিলেন ভীষণ বন্ধুবৎসল। তার এক বন্ধু ছিল। তার নাম জোহরা। তিনি সুলতানা জামানের পরিবারের সঙ্গেই এত মিশে গিয়েছিলেন যে, সুলতানা জামান অন্যদের কাছে তাকে নিজের বোন বলে পরিচয় করিয়ে দিতেন। এ সম্পর্কে তার ছেলে শরফুজ্জামান বাপি বলেন, জোহরা খালার সঙ্গে আম্মার পরিচয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেটা ১৯৫৪ সালের কথা। খালা বিয়ে করেননি। দীর্ঘ সময় তিনি আমাদের বাসায়ই থাকতেন। আম্মা তাকে তার বোন বলে পরিচয় দিতেন। তিনি মানুষের বিপদে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন।

তিনি মানুষের দুঃখে মর্মাহত হতেন। হƒদয়ের গভীরে অনুভব করতেন তাদের জন্য ভালোবাসা। আত্মকথায় লিখেছেন তেমনি একটি ঘটনা। “একদিন রাত তিনটায় বাসায় ফিরছিলাম। শীতের কনকনে রাত। একটি লোক আমার সামনে হাত বাড়িয়ে গাড়ির কাছে ছুটে এলো। একজন ভিক্ষুক। আমার সামনে হাত পেতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল তার বয়স আশির কাছাকাছি। গায়ের রং অদ্ভুত ধরনের কালো। খালি গা। মাথায় সব চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে। আমি তাকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে কোনো জবাব দেয়নি। আমি তাকে পাঁচটি টাকা দিলাম। আনন্দের আতিশয্যে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। আমি বাড়ি ফিরে বাকি রাতটুকু ঘুমুতে পারিনি। বারবার শুধু একটা কথাই মনে হয়েছিল। খোদা তোমার দুনিয়াতে তোমার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মানুষ কেউ ছোট, কেউ বড়, কেউ ধনী, কেউ গরিব। কিন্তু কেন? সবাইকে তুমি সমানভাবে রাখতে পারো না। এটাই বোধ হয় আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা।”

সুলতানা জামান ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র জগতে আসেন। তারপর মেয়ে মেরিনা জামানের জš§ হয় ১৯৬০ সালে। এ কারণে পরের দুই বছর কোনো ছবি করেননি। তারপর আবার ষাটের দশকের শেষের দিকে ১৯৭০ সালে অভিনয় থেকে বিদায় নেন। এরপর আবার চলচ্চিত্রে ফিরে আসেন ১৯৭৬ সালে। আমজাদ হোসেনের অনুরোধে তার ‘নয়নমণি’ ছবিতে অভিনয় করেন।

চিত্রালীর ২৬ বৈশাখ ১৩৮৬ সংখ্যায় লিয়াকত হোসেন লেখেন, ‘এককালে সুলতানা জামান ছিলেন নামকরা নায়িকা। ‘মাটির পাহাড়’, ‘জোয়ার এলো’, ‘মালা’- এসব ছবি তার প্রমাণ। সংসারজীবনে ফিরে যাওয়ায় সুলতানা জামান হলেন এক বিস্মৃত নাম। বিদায় নিয়েও চলচ্চিত্র জগৎ ভুলতে পারলেন না। ফিরে এলেন ‘যাদুর বাঁশি’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘নিশান’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে। আবার বিদায় নিলেন চিত্রজগৎ থেকে। সুলতানা জামানের বারবার বিদায় আমাকে হতাশ করেছে।’

সাপ্তাহিক চিত্রালীতে ১৯৭৮ সালের ২০ অক্টোবর বিদায় শিরোনামের একটি লেখায় সুলতানা জামান তার অবসর গ্রহণের কথা জানিয়ে দেন। তিনি লেখেন ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’ তার অভিনীত শেষ ছবি হবে। তিনি আরও লেখেন, ‘প্রিয়জনের সাথে বিচ্ছেদের যে ব্যথা চিত্রজগৎ ছাড়তে গিয়ে সে ব্যথাই আমি বুকে অনুভব করছি...’ ভক্তদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকার ইচ্ছে আর সব শিল্পীর মতো আমার আছে। তবু সময়ের আবর্তে যদি তারা আমাকে ভুলে যান তাহলে আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। বিদায়ের বেলায় তাদের উদ্দেশে আমি বলব, ‘যদি ভুলে যাও মোরে জানাব না অভিমান। আমি এসেছিনু তোমার সভায় দুদিন শোনাতে গান।’

এরপর তিনি আর চিত্রজগতে ফিরে আসেননি। কারণ তার মাইগ্রেনের (কনটেন হেডেক) কারণে সে সময় কোনো কাজই তিনি করতে পারতেন না। চিকিৎসার জন্য তিনি পাকিস্তান ও লন্ডনের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শও নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কিছু লেখালেখি করলেও সেখানেও ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি।

তার জীবনের শেষ সময়টা কেটেছে ছোট বোন শামীমা মাসুদের বাসায়। তিনি ২০১২ সালের ২০ মে সকাল সাড়ে সাতটায় শামীমা মাসুদের ক্যান্টনমেন্টের বাসায় মারা যান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবসান ঘটে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি অধ্যায়ের।

লেখক পরিচিতি: শামীমা চৌধুরী, গণমাধ্যমকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, কবি লেখক, গবেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত