একটি কালোত্তীর্ণ ‘ইত্যাদি’

আবু সাঈদ
| আপডেট : ১৮ জুন ২০১৮, ২২:১১ | প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৮, ২১:৫৫

ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ সব সময়ই নিত্যনতুন ভাবনা নিয়ে হাজির হয় আমাদের মাঝে। এবারও যথারীতি তা-ই। এবারের ঈদ-ইত্যাদি যেমন দেখিয়েছে দুর্নীতি, অপসংস্কৃতি, যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র, তেমনি মানবতার মূল্যহ্রাসের মতো দার্শনিক বিষয়ও ফুটিয়ে তুলেছে।

দূরদর্শী নির্মাতা হানিফ সংকেত নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেখিয়েছিলেন, ফেরি করে মোবাইল ফোন বিক্রি হওয়ার চিত্র। তাঁর সেই ভবিষ্যৎ-ভাবনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে, মোবাইল ফোন অনেক আগেই হয়ে উঠেছে সহজলভ্য, যা হয়তো আমরা ভাবতেই পারিনি। এবারের ‘ইত্যাদি’তে তিনি দেখিয়েছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত এক কর্মকর্তার কক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি, যাতে তার দুর্নীতির চিত্র কেউ ভিডিও বা অডিওতে ধারণ করতে না পারেন এবং তিনি যেন ঘুষ খেতে পারেন নিশ্চিন্তে। সেদিন হয়তো দূরে নয়, যেদিন আমরা দেখব, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অফিস-কক্ষের সামনে ‘মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের’ পাশাপাশি ‘মেটাল ডিটেক্টর’ও বসানো হয়েছে।

যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকায় শরীরে নানা রোগ হওয়া থেকে মুক্তি দিতে এক যথাযথ ব্যায়ামের চিত্রও দেখানো হয়েছে। এর বাস্তব গুরুত্ব বিবেচনায় অনেকেই এই পথে হাঁটতে পারেন বলেও ধারণা করা যায়। অনেক ‘জনহিতৈষী’ ব্যক্তি ভিখারি-সংকটে ভোগার কারণে হয়তো আমরা ভবিষ্যতে দেখতে পাব ভিখারির ভিজিটিং কার্ড বিতরণের চিত্র। ডিজিটাল যুগে মানুষের ‘কর্মব্যবস্ততার’ কথা চিন্তা করে নাটক টিভিতে না দিয়ে ইউটিউবে রিলিজ দেয়া এবং যাত্রা, সিনেমা, ওয়াজ মাহফিল ও জনসভার পাবসিলিসিটির মতো সেটার জন্য মাইকিং করার ধারণাটাও অমূলক নয়। ভবিষ্যৎ-ভাবনার এ বিষয়গুলো এবারের ‘ইত্যাদি’কে করেছে কালোত্তীর্ণ।

তদবিরকে কটাক্ষ করে ‘তদবির শিল্প’ ও ‘তদবির বিশেষজ্ঞ’ শব্দগুলোর অবতারণা আমাদের বর্তমান সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ মাধ্যমের সন্ধান অর্থাৎ ‘চ্যানেল’ ধরার যে অসুস্থ মানসিকতা আমরা লালন করি, তাতে আমাদের সবকিছু সঠিক সিস্টেমে না চলার দিকে ইঙ্গিত দিলো মামা-ভাগ্নে পর্বটি। নেতিবাচক মানসিকতার কারণে কথার অর্থ সঠিকভাবে না বুঝলে যে অনর্থ ঘটে যেতে পারে এবং আইন জেনেও তা না মানা ও স্বাস্থ্যসেবায় মানুষকে জিম্মি করে স্বার্থ হাসিল করার ব্যাপারে আমাদের যে মানসিকতা সে চিত্রও ফুটে উঠেছে এবারের ‘ইত্যাদি’তে।

ফেরদৌস, মম, অপূর্ব ও মোনালিসার নৃত্যে দেখানো হলো চেনা লোকের সঙ্গে যেতেও ‘এই সমাজের নারী’র  সংশয় এবং যানবাহনে-উৎসবে-মিছিলে তাদের বর্তমান দুরবস্থার চিত্রের পাশাপাশি টিভি সিরিয়ালের নেতিবাচক প্রভাব। নৃত্যটির পরিসমাপ্তি হয়েছে সুখ-শান্তির এক নির্মল আহ্বান দিয়ে- ‘মোরা একটি বীণার তার, যেন একটি পরিবার, সবাই সবারই আপন/ যদি মিলেমিশে রই, খোলা মনে কথা কই, দৃঢ় হবে সে বন্ধন।’

বিদেশিদের নিয়ে করা বিশেষ পর্বেও ছিল পারিবারিক শান্তির জন্য এক হয়ে মিলেমিশে থাকার বার্তা।

দেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভুলে আমরা যে ভুল পথে এগোচ্ছি; এ ছাড়া দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোর হারিয়ে যেতে বসা, এফএম রেডিওতে ভাষার বিকৃতি, নকল সুরে ও বেসুরো গলায় মানহীন গান, টিভি অনুষ্ঠানের মানের চেয়ে পরিমাণে গুরুত্বারোপ, দর্শকের কথা বাদ দিয়ে শুধু পুরস্কারের আশায় ছবি নির্মাণ, কিছু অনুষ্ঠানের প্রচারে প্রসার না হয়ে অসার হওয়া ও প্রচার পচার কারণ হয়ে যাওয়া- সে দিকগুলোই তুলে ধরা হয়েছে দর্শক পর্ব ও খণ্ড নাটিকায়। টিভি, বেতার, সিনেমা ও ফোনের নানা হালচাল নিয়ে শহীদুজ্জামান সেলিম, মীর সাব্বির, সাজু খাদেম ও জয়ের ছন্দ-তাল-লয়ের কথোপকথনও ছিল বেশ উপভোগ্য।

নানি-নাতি পর্বে দুর্নীতিবাজ ও ভেজালকারীদের সন্ধানে ডগ স্কোয়াডের প্রয়োজনীয়তার অবতারণা যেমন আমাদের মানবচরিত্রের নেতিবাচক দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে, তেমনি ইত্যাদির নিয়মিত শিল্পীদের নৃত্যে ‘টাকার যাদু’তে আমাদের মনুষ্যত্বের হারিয়ে যাওয়ার করুণ চিত্রও প্রতিফলিত হয়ে ওঠে। ইমন, কুসুম শিকদার, প্রতীক হাসান ও কণার মিউজিক্যাল ড্রামায় দেখা যায়, ঈদবাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যহ্রাস বিষয়টি মিথ্যে হলেও ‘মানবতার মূল্যহ্রাস’ কিংবা ফেয়ারনেস বাড়ানোর নামে আনফেয়ার কর্মকাণ্ড মিথ্যে নয়।

পদ-পদবি-পদক যে কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে মানবচরিত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে, সে দিকটিও বাদ যায়নি। দর্শকপর্বে চঞ্চল চৌধুরীর গাওয়া ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ মানবতাবাদের ডাক দিয়ে যায়। ঈদের চিরচেনা ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ গানটিতে কয়েক হাজার শ্রমজীবীর অংশগ্রহণ ঈদের সমতার বাণীর বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলে। কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী অ্যান্ড্রু কিশোর ও সাবিনা ইয়াসমিনের গানে দেখা যায় মানবতার এক চিরন্তন আহ্বান- ‘বাঁচতে হলে তবে তো বাঁচাতেও হবে, অন্যকে বিপন্ন করে কে সুখী হয় কবে?’

শামীম আরা নিপা ও শিবলী মোহাম্মদের নৃত্যে বাংলাদেশের প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে- শত প্রতিকূলতায় ও দুর্যোগেও যে এ দেশ স্বরূপে মহিমায়- ‘আছে বন্যা, প্লাবন, খরা, আছে দুঃখ-কষ্ট-জরা, তারপরও এই দেশ আমাদের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা।’ সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এবারের ঈদ-ইত্যাদি বিনোদনের পাশাপাশি বিবেকের দরজায় প্রবল কড়ার নাড়ানোর এক অনবদ্য ও কালোত্তীর্ণ ‘ইত্যাদি’, যা দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।

আবু সাঈদ: সহকারী কমিশনার (ভূমি), কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত