‘সরবরাহ বন্ধ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না মাদক’

ঢাকাটাইমস ডেস্ক
| আপডেট : ১৯ জুন ২০১৮, ১০:৩১ | প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৮, ১০:১৭
ফাইল ছবি

শুধু শহরাঞ্চল নয়, দেশের গ্রাম এলাকায়ও পৌঁছে গেছে মাদক। আর ঢাকাসহ শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মাদকসেবী এবং ব্যবসায়ীদের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যেও ঢাকার বসুন্ধরা এলাকার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে গত ১১ জুন শতাধিক মাদকসেবীকে আটক এবং ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়৷

মাদকসেবীদের চিকিৎসা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজ করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম৷ তিনি বলেন, ‘প্রধান তিনটি কারণে বাংলাদেশে মাদক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে৷ ১. চাহিদার সঙ্গে পর্যাপ্ত জোগান, ২. মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত এবং কৌতূহল এবং ৩. হিরোইজম৷ মাদক সকল অপরাধের মূলে কাজ করে৷’

ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকের চাহিদা আছে, তাই সরবরাহও আছে৷ আর এই সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে এর ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না৷ সরবরাহ বন্ধের দায়িত্ব সরকারের৷ সরকার তার দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে সরবরাহ বন্ধ করতে পারছে না বা মাদক সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না৷ বাকি দায়িত্ব সমাজ ও পরিবারের৷ যদি সরবরাহ বন্ধ করা না যায়, তাহলে সমাজ ও পরিবার দায়িত্ব পালন করলেও মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার স্বার্থেই এর চাহিদা তৈরির জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তাই করবে৷’

বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর৷ এর বাইরে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং কোস্টগার্ড মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে কাজ করে৷

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল এবং জলসীমান্ত থেকে এই সময়ের আলোচিত মাদক ইয়াবা পাচার হয়ে আসে৷ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে ইয়াবা সরবরাহ করে মিয়ানমার৷ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার শুরু ২০০৬ সাল থেকে৷ ২০১২ সালে চীন ও থাইল্যান্ডের মধ্যে চুক্তির পর মিয়ানমারের মাদক উৎপাদনকারীদের জন্য ওই সব দেশে পাচার কঠিন হয়ে পড়ে৷ তখন তারা বাংলাদেশকেই মাদক পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে৷

এছাড়া ভারত সীমান্ত থেকে ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক পাচার হয়ে আসে৷ আকাশ পথও ব্যবহার করে মাদক পাচারকারীরা৷ আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আছে তাদের সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক৷

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ অবশ্য মনে করেন, মাদকের চাহিদা এবং জোগান দু'টি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ তিনি বলেন, ‘মাদকের চাহিদা বন্ধ করা গেলে জোগান থাকলেও কোনো লাভ নেই৷ কেউ মাদক কিনবে না৷ আমরা এখন সাপ্লাই চেইন ধ্বংসের জন্য সমন্বিত অভিযান চালাচ্ছি৷ কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবেও জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে৷ মাদকের ব্যাপারে অনেকের ভুল ধারণা আছে৷ কেউ কেউ এটাকে ফ্যাশন এবং হিরোইজম হিসেবে নেয়৷ এটার কুফল আমাদের বুঝাতে হবে।’

সব সংস্থা মিলে ২০১৭ সালে অন্যান্য মাদকের সঙ্গে আলোচিত মাদক ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে চার কোটি ৮০ হাজার পিস৷ মাদক মামলায় মোট আসামি করা হয়েছে এক লাখ ৮২ হাজার ৮৩২ জনকে৷

কিন্তু ২০১৭ সালে মাত্র ২৫৩৯টি মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে৷ এসব মামলার দুই হাজার ৬৮০ জন আসামির মধ্যে বেশিরভাগই খালাস পেয়েছেন৷

বাংলাদেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে মোট ১১৬১২টি৷ মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছরে শাস্তি পেয়েছেন এক হাজার ৬৫ জন আর খালাস পেয়েছেন এক হাজার ৬১৫ জন৷

জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মাদক আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে৷ মাদকের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন৷ আমরা আইন সংস্কার ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য কাজ করছি৷’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পর্যাপ্ত জনবল নেই, তা সত্য৷ তবে মাদক নিয়ন্ত্রেণ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং কোস্টগার্ডও কাজ করে৷ আমরা সবাই মিলে মাদক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি৷’

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার৷ আর কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় দেড় শতাধিক ব্যক্তি৷ কিন্তু এখনো মাদক চোরাচালানের কোনো গডফাদার আটক বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়নি৷

দেশের বিভিন্ন থানা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে যারা মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত, তারা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ যাদের আটক করা হচ্ছে, তারা মাদকসেবী ও সাধারণ খুচরা বিক্রেতা৷ যারা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বা মূল পাচারকারী, তারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন না৷ তাদের কেউ এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে আবার কেউ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকায়ই আছেন৷ মাদক আইনের ফাঁকের কারণে তাদের ধরাও যাচ্ছে না বলে পুলিশ জানায়৷ মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনো কোনো এলাকার পুলিশ সদ্যদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় অভিযান দেখানোর জন্য সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে অনেক৷ অভিযানের মধ্যেই টেকনাফের মাদকের গডফাদার বলে পরিচিত সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি তার দুই সহযোগীকে নিয়ে সৌদি আরবে ওমরাহ করতে চলে যান৷

সাধারণ মানুষের ধারণা, বাংলাদেশে মাদকের বিস্তারের আইন-শঙ্খলা বাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি গ্রুপের হাত আছে৷ তারাই মাদক ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক৷ তাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়৷

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘মাদক কখনোই নির্মূল করা সম্ভব নয়৷ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব৷ মাদক একেবারেই থাকবে না, এই নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয়৷ আমরা মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে সব জায়গায় কাজ করছি৷ মাদকের মূল গডফাদার থেকে শুরু করে এর বিক্রেতা, পাচারকারী, সরবরাহকারী ও ব্যবহারকারী সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছি৷ তবে মাদকের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন ও জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে৷ আমরা এই কাজও শুরু করেছি৷’

অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম মনে করেন, ‘বাংলাদেশে মানসম্পন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রও গড়ে তুলতে হবে৷ যেসব নিরাময় কেন্দ্র আছে, সেগুলো মানসম্পন্ন নয়৷ প্রয়োজনীয় এবং দক্ষ চিকিৎসকও নেই৷’-ডয়েচে ভেলে

(ঢাকাটাইমস/১৯জুন/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত