লাতিনরা বিশ্বকাপে এসে পিছিয়ে পড়ছে কেন?

আজহারুল ইসলাম
| আপডেট : ১৯ জুন ২০১৮, ১৭:০৭ | প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৮, ১৫:৩১

বিষয়টি লক্ষ্যণীয় যে ব্রাজিল ২০০২ এ কাপ জেতার পর আর গতবার আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠা ছাড়া বিশ্বকাপের মতন আসরে ল্যাটিন টিমগুলো ইউরোপিয়ানদের  সঙ্গে পেরে উঠছে না।

কী হতে পারে এর কারণ?

ফুটবলের স্টাইল টা ইউরোপিয়ান স্টাইলের দিকে এখন শিফটেড। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা কখনও নিজ দেশের ছাড়া কোচ রাখে না, বা রাখবে না। দুংগার চাকরি যাবার পর গার্দিওলা ব্রাজিলের কোচিং এর প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, কারণ গার্দিওলা ব্রাজিলিয়ান ট্যালেন্ট দের প্রতি বায়সড। ব্রাজিলিয়ান প্লেইং স্টাইল তার কাছে পছন্দের ।

প্রশ্ন আসতে পারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার অধিকাংশ প্লেয়ার ইউরোপে খেলে, তাও কেন মানিয়ে নিতে পারতেছে না? এর একটা কারণ হলো টিম কেমিস্ট্রি।

আর্জেন্টিনার কথাই যদি বলি, ২৩ জনের মাঝে যেকোন ৩ জন নেই যারা একই ক্লাবে খেলে। ২ জন একই ক্লাবের হয়ে খেলে এমন আছে ৩ টা প্লেয়ার।

১) ওটামেন্ডি-আগুয়েরো (টেকনিক্যালি ডিফেন্ডার আর কোর স্ট্রাইকার দের মধ্যে বল কানেকশন খুব ই লিমিটেড) :ম্যান সিটি

২) মারিয়া- লো সেলসোঃ পিএসজি (যদিও মূল দলে তারা এক সঙ্গে প্লেয়িং টাইম তেমন পাচ্ছে না )

৩) আরমানি-এনজো পেরেজ: রিভার প্লেট (একজন গোল কিপার অন্যজন মিডফিল্ডার)

আশা করি ব্যাখ্যা দিতে হবে না যে এদের কোন গেম কেমিস্ট্রি থাকা বা না থাকায় কিছু আসে যায় কিনা।

ব্রাজিলের বেলায় থিয়াগো সি্লভা- মারকুইনহোস জুটি তাও একসাথে পিএসজির সেন্টার ব্যাক এ খেলে। দানি আল্ভেস (রাইট ব্যাক) থাকলে আরও পোক্ত হতো। কিন্তু মিড আর ফরোয়ার্ডে প্রত্যেকে আলাদা ক্লাবের।

২০১০ এ স্পেনের একাদশের ৬-৭ জন ছিল বার্সার। এখনো স্পেন টিমে মোটামুটি ৭ -৮ জন স্পেনের ক্লাবের (বার্সারঃ পিকে-আলবা-বুস্কেটস-ইনিয়েস্তা; রিয়ালেরঃ রামোস-কারভাহাল-ভাস্কেজ)।

অপরদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি হয়ত প্রথম ম্যাচে ছন্দ পায়নি, কিন্তু বিগত আসরগুলোর নিয়মিত সেমিফাইনালিস্ট টিমের ৫-৬ জন ছিল বায়ার্নে, সেটা গোলকিপার-ডিফেন্ডার-মিডফিল্ডার-ফরোয়ার্ড সব মিলিয়েই।

আমার চোখে লাতিন পাওয়ার হাউস গুলোর আল্টিমেট সাক্সেস না পাওয়ার এটাই কারণ। ইন্ডিভিজুয়ালি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে বাদ দিলে মেসি-নেইমার এমন কি কোতিনহোর মান ইউরোপের অধিকাংশের চেয়ে অনেক উপরে থাকবে নিঃসন্দেহে।

কিন্তু খেলাটা যখন বিশ্বকাপ ফুটবল, সেখানে একটা টিমের ভেতরে একটা ইন্টারলিংকেজ দরকার পড়ে, যে লিংকেজ টা কে অপোনেন্টের জন্য বিট করা টাফ হয়।

বলতে গেলে ২০০২ এর পর কোন লাতিন টিমের ফাইনালে ওঠার নজির ঐ ২০১৪ সালে। আর্জেন্টিনার সে টিমের সেই বিল্ড আপ হবার পেছনেও একটা কারণ ছিল। প্রশ্ন জাগতে পারে কী সেটা?

সাবেলা প্রায় ২.৫ বছর সময় নিয়ে একটা আর্জেন্টিনার টিমকে গুছিয়েছিলেন। সেখানে সেন্টার ব্যাক, দুই ফুল ব্যাক, গোল কিপার, সেন্ট্রাল মিডফিল্ড এমন কি ফরোয়ার্ডরা পর্যন্ত প্রায় ফিক্সড ছিল। টিমের যে ১৪ (৩ জন সাবসহ) জন ফাইনালে খেলেছে তার মধ্যে বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে দলে ঢোকা ছিল ডেমিচেলিসের।

বাকিরা প্রত্যকেই কিন্তু প্রায় টিউনড ছিল। যে কারণে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড থেকে ডিফেন্স এই অংশ টা গতবার অনেক শক্তিশালী ছিল।

শারীরিক উচ্চতা কিংবা ফিজিক্যাল স্ট্যামিনা আরও একটা বড় কারণ । আইসল্যান্ডের কাছে আর্জেন্টিনা যে কারণে অনেক বার পেরে উঠেনি। এ বিশ্বকাপের সবথেকে খর্বাকৃতির দিক থেকে আর্জেন্টাইনরা ৩য় (গড় উচ্চতায়)। অন্যদিকে সর্বোচ্চ উচ্চতার দিক থেকে আইসল্যান্ড ৩য় । যে কারণে এরিয়ালে কন্ট্রোল নেয়া, ক্রসে পারফেক্টলি বল বা মাথা কানেক্ট করা খাটোদের জন্য খুবই কঠিন। আইসল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনা এতোগুলো কর্নার পেয়েও তাই কোন লাভ হয় নি ।

রাশিয়া বিশ্বকাপে যে লাতিন কেউ পারবে না সেটাও না। এবার লাতিনদের মধ্যে ব্রাজিলের কাগজে কলমে সে সম্ভাবনা খুব ভালভাবে আছে। যদিও তারা প্রথম ম্যাচ ড্র করেছে। কারণ দলটির কোচ তিতে এই স্কোয়াডের ৮৫% খেলোয়াড় নিয়ে বাছাই পর্বের অর্ধেকেরও বেশি সময় পার করে এসেছেন। গত বিশ্বকাপে যেটা আর্জেন্টিনার হয়ে সাবেলা করেছিলেন। ব্রাজিলের তাই শুধরাবার জায়গা খুবই কম।

কিন্তু আর্জেন্টিনার কী দশা?

গোলকিপার হুট করে পরিবর্তন করতে বাধ্য হলো। সেন্টার ব্যাকে ওটামেন্ডির পার্টনার রোটেটিং ফিক্সড ফুল ব্যাক নেই। ডিএমএ তারা ডাবল পিভটে পাসচেরানোর পার্টনার ঠিক করতে পারে নাই।

এমন কি ফরোয়ার্ডে তারা বারবার পরীক্ষিত ব্যর্থদের কেই সুযোগ দিতে বাধ্য। ম্যাচের ফলাফলে ব্যর্থতা আসা তাই আর্জেন্টিনার জন্য তেমন অযৌক্তিক নয়।

ব্রাজিল দল টা ইতোমধ্যে গত ২ বছর ধরে গোছানো । কিন্তু সুইচ দের কাছে উচ্চতাতে অনেক বার বাঁধা পেয়েছে , সে সঙ্গে সেন্ট্রাল মিড থেকেও বল যোগানে কিছুটা ঘাটতি ছিল । কোতিনহোর বিপরীত উইং থেকে সেরকম কোন আক্রমণ দানা বাঁধেনি। কোতিনহো কেও বেহ্রামি বেশ ভাল ভুগিয়েছে প্রথম গোলের পরেই । হয়ত তারা পরের ম্যাচেই স্বরূপে ফিরে আসবে।

অনেক আগেই কথাগুলো বলে ফেলেছি। সবার মাত্র ১ ম্যাচ করে খেলা হয়েছে, এমন কি কলম্বিয়া আজ মাত্র মাঠে নামতে যাচ্ছে। তাই এখনও দেখার অনেক বাকি সে দেখার আশা নিয়ে আমিও অপেক্ষারত!

আজহারুল ইসলাম: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

সংবাদটি শেয়ার করুন

খেলাধুলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত