‘চরের সোনা’ বাদামে স্বপ্নভঙ্গ কৃষকের

ফরিদপুর প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৮, ১১:৩৬

পদ্মা-মধুমতি-কুমার নদী বিধৌত ফরিদপুরের চরাঞ্চলের বসবাসকারী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতো বাদাম। কিন্তু এবছর ‘চরের সোনা’ খ্যাত বাদাম নিয়ে কৃষকের স্বপ্নে চিড় ধরেছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ক্ষেত থেকে তুলে ফেলতে হয়েছে বাদাম। নদ নদীতে পানি বাড়ায় চরাঞ্চলে আবাদকৃত বাদাম ক্ষেতে পানি প্রবেশ করায় অপরিপক্ক বাদাম ক্ষেত থেকে তুলতে হচ্ছে কৃষকদের। ঘাম ঝরানো ফসল বাদামকে ঘিরে সারা বছরের স্বপ্ন ম্লান হয়ে গেছে হাজারো চাষির।

জেলার অর্ধশতাধিক চরে বসবাসকারী মানুষগুলো এখন বাদাম তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে অবস্থানের পর স্বল্প সময়ের জন্য জেগে ওঠা এসব চরের জমিতে স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক ফসল হিসেবে বাদামকেই বেছে নেয় চাষিরা।

এক সময় চরের মাটিকে বন্ধা বিবেচনায় কোনো ফসলের আবাদ করা হতো না। বিস্ত্রীর্ণ এলাকার হাজার হাজার একর জমি পতিত (চাষাবাদবিহীন) থাকতো। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের এসব জমিজুড়ে সবুজের সমারোহ। জেলা সদর, মধুখালী, আলফাডাঙ্গা, চরভদ্রাসন, বোয়ালমারী, সদরপুরের অর্ধশতাধিক চর জেগে উঠে। এসব এলাকার জেগে ওঠা চরে অন্য ফসলের ভালো ফলন না হওয়ায় গত ৭/৮ বছর ধরে চাষাবাদ করা হচ্ছে চিনা বাদাম।

চরাঞ্চলের বসবাসকারীরা জানান, এখানকার মানুষেরা শুধুই শহরের বিভিন্ন ধরনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে বদলে গেছে এ এলাকার মানুষের জীবনচিত্র। এখন শুধুই চরের নিকটবর্তী শহরের মানুষের দেয়া কাজ আর অনুদানের ওপর নির্ভর না করে এসব মানুষেরা চরের জমিতে বাদামের আবাদ করে ঘুরিয়ে ফেলছেন জীবনের চাকা।

জেলার সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমার এলাকার বিস্ত্রীর্ণ এলাকাজুড়ে পদ্মা নদীর চর জেগে ওঠায় সেখানে বাদাম চাষ করেছে চাষিরা। কৃষি বিভাগের সহায়তায় চর এলাকাগুলোতে বেশ কয়েক বছর ধরে চিনা বাদাম আবাদ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।’

ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ-চ্যানেল ইউনিয়নের বাদামচাষি হামিদ আলী মন্ডল চরাঞ্চলের বাদামকে ‘চরের সোনা’ অভিহিত করে বলেন, চরের মানুষের জীবন ও জীবিকায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে বাদাম। তার মতে, এখানে কারো জমিন না থাকলেও অন্যের জমিতে কাজ করে উপার্জন করে সংসার চালাচ্ছেন অনেকেই। বাদামের কোনো অংশই ফেলনা নয়। সবুজ পাতাটাও গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এবছর জেলায় ছয় হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল পাঁচ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে। এবছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে।

সরেজমিনে সদর উপজেলার ডিক্রিরচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চরের কৃষকরা বাদাম তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে। বাড়ির সব সদস্যকে নিয়ে তারা বাদাম তুলছে। পানিতে ডুবে থাকা বাদামগুলো তুলতে দেখা গেছে চাষিদের। পানি বাড়ার কারণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাদাম তুলছে তারা।

ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়নের বাদামচাষি মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, এবছর বাদাম আবাদের পর খড়ার কারণে বীজগুলো ভালোভাবে জালায়নি। এরপর বৃষ্টি হলে মোটামুটি বীজগুলো জালায়। কিন্তু এখন নদ নদীতে পানি বাড়ায় বাদামগাছগুলো পানিতে ডুবে যাচ্ছে। অপরিপক্ক থাকা অবস্থায়ই বাদাম ক্ষেত থেকে তুলতে হচ্ছে। বাদামে এবছর লাভ হবে না।

ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিন্টু ফকির ঢাকাটাইমসকে বলেন, এবছর বাদাম চাষিদের একটু ক্ষতি হয়েছে। পানির কারণে তাদের আগে থেকেই বাদাম ক্ষেত থেকে তুলতে হয়েছে। তবে ফলন কিছুটা ভালো হওয়ায় তেমন সমস্যা হবে না।

চেয়ারম্যান বলেন, আগে যারা বাদাম আবাদ করেছিল তারা পানি আসার আগেই বাদাম ঘরে তুলতে পেরেছে।

ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কার্ত্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী ঢাকাটাইমসকে জানান, চলতি মৌসুমে জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি উপজেলায় ছয় হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে চিনা বাদামের আবাদ করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা এবছর ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, চরাঞ্চলে এমনিতেই অন্য ফসল ভালো হয় না, সেই বিবেচনায় আমরা তাদের বাদাম আবাদে উৎসাহী করেছি। এখন ফরিদপুরের বিভিন্ন চরে অন্যতম অর্থকারি ফসল বাদাম। এই বাদাম আবাদের মাধ্যমে অনেকের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে। এই কর্মকর্তা জানান, জেলায় বাদামের চাষাবাদ বাড়াতে ৬০০ কৃষকের মাঝে প্রণোদনা হিসেবে প্রতি কৃষককে ১০ কেজি করে বাদাম বীজ ও ১৫ কেজি করে বিভিন্ন ধরনের সার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ফলোআপ হিসেবে আট হাজার ৪০০ কেজি ভালোমানের বীজ বিতরণ ও চাষিদের বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি জানান, এবছর পানির কারণে বাদামের ফলনে কিছুটা বিঘœ হলেও চাষিরা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

চরের বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষগুলোর দাবি, তাদের জীবন সংগ্রামের পথকে মসৃণ করতে সহজ শর্তে ঋণ বা অন্যান্য সহযোগিতা পাওয়ার পথ যেন করে দেয় সরকার।

(ঢাকাটাইমস/২০জুন/প্রতিনিধি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত