হেরেও ছেলেরা এসি বাসে, জিতেও মেয়েরা লোকালে

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৮, ১৩:১৫

বাংলাদেশ কি কখনো ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে পারবে? এ প্রশ্ন কেউ আমাকে করলে আমি পাল্টা প্রশ্ন করি-কোন বিশ্বকাপ, ছেলেদের বিশ্বকাপ নাকি মেয়েদের? ছেলেদের ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ইহজনমে অংশ নিতে পারবে, এমন আশা করার লোক খুব বেশি নেই বাংলাদেশে। অথচ এটা অসম্ভব না কোনোমতেই।

ফুটবল ফেডারেশনের ইচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বাংলাদেশ একদিন ছেলেদের ফুটবল বিশ্বকাপেও খেলতে পারত। এটা খুবই সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হল, বাংলাদেশ জাতীয় দল এখন ভুটানের সাথে খেললেও জেতার গ্যারান্টি নাই। অন্যদিকে পাশের দেশ ভারত কিন্তু ফুটবলে এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অথচ বয়সভিত্তিক বাংলাদেশি দলের কাছে ভারতের ছেলেরা নিয়মিতভাবে এখনো হারছে; এটা প্রমাণ করে আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব নেই, অভাব নীতি নির্ধারকদের ইচ্ছা আর পরিকল্পনার।

তবে বাংলাদেশের মেয়েদের পারফরমেন্স আবার সব দিক থেকেই ভালো। সাউথ এশিয়াতে মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফুটবল এখন বাংলাদেশের মেয়েরাই খেলছে। বলতে গেলে বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল বিপ্লব হয়েছে। যদিও নারী ফুটবলারদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ না দিয়ে ইতোমধ্যে বেশ সমালোচিত হয়েছে ফুটবল ফেডারেশন। এবার নারী ক্রিকেটারদের বেলায়ও উদাসিনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

যে নারীরা দেশের হয়ে খেলে কদিন আগেই মহাপরাক্রমশালী ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে এশিয়া কাপের শিরোপা জিতেছে, তাদেরকেই লোকাল বাসে চড়তে বাধ্য করেছে বিসিবি। অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্যি ঘটনা, চট্টগ্রামে ঘটেছে। বাংলাদেশ কি এতই ফকির হয়ে গেল যে, নিজেদের বিজয় লক্ষ্মী নারীদের জন্য একটি এসি বাসের ব্যবস্থা করতে পারল না!

কদিন আগে ভারতে আফগানিস্তানের সাথে টানা তিন ম্যাচ হেরে হোয়াটওয়াশ হয়ে এসেছে জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল। এই লজ্জাজনক দুর্বল পারফর্মেন্স এর জন্য দলের অধিনায়ক, ম্যানেজার, কোচ কিংবা বিসিবি প্রধান কেউ জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে এখনো শোনা যায়নি। নিজেরাই লজ্জিত কি না, এতে অনেকের সন্দেহ আছে। আফগানদের সাথে গো হারা হেরে সাকিব বাহিনী আমাদের বিমানবন্দরে আসলে তাদের কে কি লোকাল বাসে তুলেছিল আমাদের বিসিবি? ছেলেদের ক্রিকেটে এটা কল্পনা করা যায়? সাকিব-তামিম আর মুশফিকরা বিমান বন্দর থেকে তিন নম্বর বাসে করে ক্রিকেট বোর্ড বা কোনো হোটেলে গেছে, এমন ঘটনা ঘটবে কোনোদিন?

অথচ মেয়েদের বেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে। আর কদিন পর শুরু হবে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব। এর আগে বাংলাদেশ নারী জাতীয় দল সফরে যাবে আয়ারল্যান্ডে। সামনে কঠিন ক্রিকেট, তাই চট্টগ্রামে নারীরা গেছে অনুশীলন পর্ব কাটাতে। সেখানেই তাদের জন্য লোকাল বাস ভাড়া করেছে বিসিবি!  

ঢাকাটাইমস এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আয়ারল্যান্ড সফর ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশের মেয়েরা এখন চট্টগ্রাম। সেখানেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতি ক্যাম্পে হোটেল থেকে মাঠে যাওয়া-আসার জন্য মেয়েদেরকে দেয়া হয়েছে মানহীন বাস। চট্টগ্রাম শহরের ৬ নম্বর লোকাল বাস হিসেবে পরিচিত একটি বাস ভাড়া করা হয়েছে মেয়েদের যাতায়াতের জন্য। অথচ এই দলটিই মালয়েশিয়ায় এশিয়া কাপে চমক দেখিয়ে ভারতকে দুইবার এবং পাকিস্তানকে হারানো, এমনকি চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসা দলটির সুযোগ সুবিধার ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে ১০ দিন ধরে।

গত ১০ জুন এশিয়া কাপে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলটির একেবারেই কম বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কম থাকা নিয়ে সমালোচনা চলছে। এর মধ্যেই সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবির পক্ষ থেকে।

এর আগে ২০১৬ সালে অনুর্ধ্ব-১৬ এশিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয়া মেয়ে ফুটবলারদেরকে লোকাল বাসে করে বাড়ি পাঠিয়েছিল বাফুফে। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার পর তাদের যাতায়াতের জন্য গাড়ি ভাড়া করা শুরু করে ফুটবল ফেডারেশন।

বিসিবি কি এতই গরিব হয়ে গেল যে, দেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনা নারী ক্রিকেটারদের জন্য ননএসি, লোকাল বাস ভাড়া করতে হবে! কেন এই অবহেলা? কী উদ্দেশ্য এর? ক্রিকেটাররা ক্রিকেট খেলে বলেই তো বিসিবির জন্ম হয়েছে, বিসিবির ব্যাংক একাউন্ট ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বিসিবি এই বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রিকেট বোর্ড।

ঢাকাটাইমসের আরেকটি প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি,  গত ৮ বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ১ হাজার ২০৭ কোটি ৩ লাখ টাকা আয় করেছে। সংসদে জানানো হয় যে, ‘ক্রিকেট বোর্ড ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২২৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আয় করেছে।’ জাতীয় সংসদকে আরও জানানো হয় যে, ‘বিসিবি ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩৯ কোটি ৪৮ হাজার টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১২৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০১ কোটি ১ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৫৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৬৫ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৮১ কোটি ১৬ লাখ টাকা আয় করেছে।’

শুধু মুখে মুখে প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার বুলি আওড়ালেই হবে না। নীতি নির্ধারকদের কাজেও প্রমাণ করতে হবে যে তারা আসলেই প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়তে চান। নারী ক্রিকেটার বা ফুটবলারদেরকে এভাবে অবহেলা করলে লাভবান হবে মৌলবাদী গোষ্ঠী, যারা চায় না এদেশে নারীরা ঘরের বাইরে আসুক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারীর শুধু নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বিসিবির সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবদান রাখার সুযোগ সবচেয়ে বেশি; এদেশে ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরাই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত এবং জনপ্রিয়। অথচ  জাতীয় নারী ক্রিকেটারদেরকে কি না, দেয়া হচ্ছে লোকাল বাস? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি জানেন, নারী তারকাদের প্রতি দেশের নীতি নির্ধারকদের এই অবহেলার কথা?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত