যেমন হলো আ.লীগের নতুন ঠিকানা

তানিম আহমেদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২১ জুন ২০১৮, ১৫:১৪

প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত দশক পর স্বয়ংসম্পূর্ণ ভবন পেল আওয়ামী লীগ। আধুনিক নানা সুযোগ সুবিধা থাকা ভবনটিতে মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে।

ভবনটির নির্মাণশৈলীতেও রাখা হয়েছে মুন্সীয়ানা। এটি সহজেই পথচারীদের দৃষ্টি কেড়ে নিতে বাধ্য বলেই মনে করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

গত তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের যে ভবনটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, সেটি ভেঙে নির্মিত হয়েছে ১০ তলা দৃষ্টিনন্দন ভবন।

আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, দলের নিজস্ব তহবিল থেকে থেকে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সময় ঠিকানা পাল্টেছে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দলের সভাপতি হয়ে দেশে ফেরার পর দলটি থিতু হয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে।

আর যে মাটির ওপর ভবনটি ছিল, আট কাঠার সেই জমিটি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা নিয়ে তৈরি হয়েছে ভবনটি। আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত ভবনটি পুরোটাই থাকবে ওয়াইফাইয়ের আওতায়।

দলের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন ২৩ জুন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ভবনের উদ্বোধন করবেন।

সেদিন বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে ভবনের চাবি তুলে দেবেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন। আর উদ্বোধন শেষে সভাপতিমণ্ডলী, যুগ্ম সম্পাদকসহ অন্য নেতা ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জায়গা নির্ধারণ করে দেবেন সভাপতি।

নেতারা জানান, উদ্বোধনের পর দলের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে এই ভবন থেকে। আর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয় থেকে দলের নির্বাচনী কার্যক্রম ও সিআরআইসহ দলের অন্যান্য সংস্থার গবেষণামূলক কাজ চলবে।

জানতে চাইলে ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দলের নেতাকর্মীদের জন্য নতুন কার্যালয় একটি উপহার। নতুন করেই শুরু হবে পথচলা। আশা করছি নতুন ভবন আমাদের জন্য নতুন বিজয় বয়ে আনবে।’

‘আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে আওয়ামী লীগের নতুন ভবন উদ্বোধন দলের নেতাকর্মীদের বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।’

সভাপতির জন্য বুলেটপ্রুফ কক্ষ

ভবনটিতে নবমতলায় বসবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তার ফ্লোরটি করা হয়েছে বুলেটপ্রুফ ডাবল গ্লাস দিয়ে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সভাপতির কক্ষের সঙ্গে রয়েছে বিশ্রামাঘার ও নামাজের জায়গাও। 

সাধারণ সম্পাদকের কক্ষ রাখা হয়েছে অষ্টম তলায়। তার জন্যও রাখা হয়েছে সুপরিসর কক্ষ।

কোন তলায় কী আছে?

ভবনের সামনের দেয়ালের দুইপাশ কাচ দিয়ে ঘেরা আর মাঝখানে সিরামিকের ইটের বন্ধন। সামনের দেয়ালজুড়ে দলের সাইনবোর্ডসহ মুক্তিযু্দ্ধের রণধ্বনী ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’র পাশাপাশি ৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি খোদাই করে লেখা আছে।

ভবনটির প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোর চার হাজার ১০০ বর্গফুটের। চতুর্থতলা থেকে উপরের সব কয়টি ফ্লোর তিন হাজার ১০০ বর্গফুটের।

ভবনে সাত, আট ও নয় তলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কক্ষ রাখা হয়েছে। সপ্তম তলায় বসবেন দলের কোষাধ্যক্ষ।

ছয় বা সাত তলা পর্যন্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলালীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অফিস থাকবে।

দ্বিতীয় তলার সম্মেলন কক্ষে ৩৫০ জনের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৃতীয় তলায় ২৪০ জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নিচে রক্ষিত নির্দেশনা অনুযায়ী জানা যায়, চতুর্থ ও পঞ্চমতলায় সাধারণ অফিস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, মিডিয়া রুম। ষষ্ঠতলায় আছে সম্মেলন কক্ষ। একদম উপরে দশম তলায় থাকছে ক্যাফেটোরিয়া।

তিন তলার সামনের অংশটা ‘ওপেন স্কাই টেরাস’। অনেকটা বাসার ড্রয়িংরুম বা পাঁচ তারকা হোটেলের আদলে করা হয়েছে এই অংশ। এখানে কৃত্রিম বাগানের ফাঁকে ফাঁকে চেয়ার-টেবিল দিয়ে বসার ব্যবস্থা থাকছে। পাশাপাশি থাকবে চা-কফি খাওয়ার আয়োজন।

ভবনের চার ও পাঁচতলায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়াও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিমসহ সমমনা সংগঠনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

ভবনটিতে ঢুকলেই হাতের বাম পাশে রয়েছে অভ্যর্থনা ডেস্ক। সেখানে সিঁড়ির পাশাপাশি আছে দুটি লিফট। বেসমেন্ট ও প্রথমতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের কথা বলা হলেও পরে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে আওয়ামী লীগ। সামনের সড়কে ছেড়ে দেওয়া নিজস্ব জায়গায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান নেতারা। একইভাবে ছাদে হেলিপ্যাড করার সিদ্ধান্ত থাকলেও আপাতত তা করা হয়নি।

ভবনের সামনে-পেছনে ছেড়ে দেওয়া জায়গায় হবে বাগান। আর ভবনের সামনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এত বড় ভবন কেন?

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, দলের সংগঠন আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে, সারাদেশে বেড়েছে কর্মী-সমর্থক।

শেখ হাসিনা তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে দল পরিচালনা করেই। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দলটির পরিসর বেড়েছে অনেক। সারাদেশে অসংখ্য নেতাকর্মী ও সমর্থকের পাশাপাশি অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম এ ছোট্ট কার্যালয় থেকে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছিল।

সেই চিন্তা থেকেই ২০১১ সালে নতুন কার্যালয়ের পরিকল্পনা মাথায় আসে আওয়ামী লীগের।

সরকারি বিধি অনুযায়ী নানা কার্যক্রমের পর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজে হাত দেওয়া হয়।

নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নির্মাণ

ভবন নির্মাণের নতুন কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভবন নির্মাণ করতে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়নি। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ভবনটি নির্মিত হয়।

দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। সেই হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার চার মাস আগেই শেষ হলো ভবন নির্মাণের।

নির্মাণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী সামনের দিকে রাস্তা থেকে ১০ ফুট ও পেছনের দিকে ১৭ ফুট জায়গা ছেড়ে মোট জমির ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নতুন কার্যালয়টি যেখানে নির্মিত হয়েছে, সেই জমিটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেওয়া হয়েছে সরকারের কাছ থেকে।

আর ভবন নির্মাণের আগে বিদ্যুৎসহ নানা বকেয়া বিল মিলিয়ে সরকারকে দিতে হয়েছে এক কোটি টাকা।

কবে কোন ভবনে আওয়ামী লীগ?

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন  আওয়ামী লীগ যাত্রা শুরু পুরনো ঢাকার রোজ গার্ডেনে। অল্প কয়েকজন নেতার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দলটির মানুষের মন জয় করতে দেরি হয়নি। পাকিস্তান আমলে এই দলটি হয়ে উঠে এ দেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

যত সময় গেছে দল আকারে হয়েছে বড়। আর সময়ের ব্যবধানে প্রয়োজনের তাগিদে দলটিকে কার্যালয় পরিবর্তন করতে হয়েছে বেশ কয়েকবার।

রোজ গার্ডেন থেকে ১৯৫৩ সালেই ৯ কানকুন লেনে, ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকায় ৫৬ সিমসন রোডে, ১৯৬৪ সালে ৯১ নবাবপুর রোডে, এরপরে সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলিতে এবং পরে পুরানা পল্টনে কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়ে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম চলেছিল। এরপর যায় সার্কিট হাউস রোডে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্দুকে সপরিবারে হত্যার ছয় বছর পর ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলে তিনি কার্যালয় নিয়ে আসেন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শেষে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার ইতিহাস রচিত হয় এই ভবনটিতেই। তবে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় নেয়া হয় ধানমন্ডিতে। তবে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি সহযোগী ও ভাতৃপ্রতীম সংগঠনের ঠিকানা ছিল সেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউই।

(ঢাকাটাইমস/২১জুন/টিএ/ডব্লিউবি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত