বিশ্বকাপ নিয়ে অন্যরকম ‘গৃহযুদ্ধ’

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৮, ১৪:২৫

বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই খৈনিদা খেলা দেখার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তার পছন্দের দল আর্জেন্টিনা। নীল-সাদা জার্সি কিনেছেন। মাথার ফেটি। পতাকা। রিস্ট ব্যান্ড। শেষে একটা চশমা জোগাড় করেছেন। একটি গ্লাস নীল আর অন্যটি সাদা। ৫৬ ইঞ্চি সনি ব্রাভিয়া কালার টিভি কিনে বাসায় তোলার পর জানলেন, ঘরের শত্রু বিভীষণ। তিনি আর্জেন্টিনা আর হোম মিনিস্টার অর্থাৎ তার স্ত্রী তুলি বৌদি একজন কট্টর ব্রাজিল সমর্থক। দুজনেই বাড়ির ছাদে দুই দেশের পতাকা উঠিয়ে গৃহযুদ্ধের জানান দিলেন। 

শুরুতেই গ্যালারি অর্থাৎ বসার ঘর ভাগাভাগি। দুটো ডবল সোফা দুজনে দু দিকে টেনে নিয়ে যে যার অবস্থান তৈরি করলেন। মাঝখানে দিলেন টি-টেবিল। টি-কাপ দুটোই আলাদা। একটি নীল। অন্যটি হলুদ। বিছানাও ভাগাভাগি করে নিতেন। সুযোগ ছিল না। তাই ওই কোলবালিশই ভরসা। মাঝ মাঠে (বিছানায়) কোলবালিশ রেখে, দুজন দুপাশে।

রান্নাবান্নায় ভাগাভাগি হলো না। এক হাঁড়িতেই রান্না হচ্ছে। তবে দুজনে আগে ডাইনিংয়ে পাশাপাশি চেয়ারে বসতেন, এখন বসেন মুখোমুখি। তবে ঠান্ডা মাথার গৃহযুদ্ধ এখানে কিছুটা চেতিয়েছে। খৈনিদা একেবারেই ঝাল খেতে পারেন না। অম্বলের কঠিন ব্যামো। ডাক্তার একবার নাক কুচকে বলেছিলেন, বেছে চলুক মশাই, তা না হলে আলসার-ফালসার বাধিয়ে বসবেন। বেছে কি আর চলা হয়? গিন্নির পছন্দ ঝাল। টক রান্নাও ঝালে মুখে দেওয়া যায় না। পারলে ভাতেও দুটো কাঁচামরিচ ভেঙে দেয়। তবে স্বামী দেবতার জন্য তার মায়া হয় বৈকি। তাই দু-পদ রান্না করলে একপদে ঝাল কমিয়ে দেয়। কিন্তু বিশ^কাপ যুদ্ধে তাও বন্ধ। আর্জেন্টিনার সমর্থককে কুপোকাত করতে ঝালই ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরকারিতে ঝালের মাত্রা বেড়েছে। আর যখন কোনো অস্ত্র নেই তখন লংকাই ভরসা!

খৈনিদা সব হজম করেই আসছিলেন। কিন্তু সাম্পাওলির ছেলেরা যা খেলছে তা হজম হওয়ার মতো না। বুঝ হওয়ার পর থেকেই খৈনিদা আর্জেন্টিনার সমর্থক। খেলায় ভালোমন্দ থাকতে পারে, তাই বলে দিনের পর দিন খারাপ খেলা তো অস্বাভাবিক ব্যাপার। পায়ে বল পেয়েও যারা গোল করতে পারে না, বল দিয়ে আসে গোলকিপারের হাতেÑ তাদের ব্যাপারে কীবা বলার থাকে? শুরুর ম্যাচে নবাগত আইসল্যান্ডের সঙ্গে বহু কষ্টে হার ঠেকিয়েছে মেসি, আগুয়েরোরা। 

হান্ডেড পার্সেন্ট টাক নিয়ে মাঠের বাইরে সাম্পাওলির ছুটোছুটি দেখলে খৈনিদার হাত নিসপিস করে। এই টেকোটার ভুলের খেসারত দিচ্ছে আর্জেন্টিনা। সেদিন আইসল্যান্ডের কাছে এক-এক গোলে সমতা নিয়ে কোনোমতে মাঠ ছেড়েছে মেসিরা। তবে খৈনিদা সেদিন হতাশ হননি। বলেছেন, ফুটবল আনপ্রেডিক্টেবল গেইম। গোলবলের খেলা। এনিয়ে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা ঠিক না। কখন কী ঘটে যায় কে জানে? 

তুলি বৌদি টিপ্পনি কেটে বলেছিলেন, মর্নিং শোজ দ্য ডে। শুরু দেখেই বোঝা গেছে, মেসিদের দৌড় কতখানি হবে। হারতে হারতে টিকে গেল। তার আবার আনপ্রেডিক্টেবল গেইম! খৈনিদা এবার কথা আমলে নেননি। শুধু বলেছেন, সময় তো ফুরিয়ে যায়নি। সামনের খেলাতেই দেখা যাক।

সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ব্রাজিলের খেলা। দুজনেই বেশ আগ্রহ নিয়ে বসেছিলেন খেলা দেখতে। তবে শেষে খৈনিদাই হাসিমুখে ঘুমোতে গেছেন। খেলা শেষে গিন্নিকে বললেন, শেয়ানে শেয়ানে লড়াই হলো। ব্রাজিল বলে পার পেয়ে যাবে? ফলাফল তো ওই সমতাই। তুলি বৌদি মুখ বুজে ছিলেন। 

ব্রাজিলের সমর্থকরা আদতে দুটো পক্ষের সমর্থন করেন। একটি ব্রাজিল। অন্যটি আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া যেকোনো দল। তুলি বৌদিও তাই। ২১ জুন রাতে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। গ্যালারিতে (বসার ঘরে) খেলা দেখতে বসে খৈনিদা তো অবাক। বিস্মিত গলায় বললেন, তুমি কি দল পাল্টেছো নাকি তুলি? 
তুলি বৌদি কপাল কুচকে বললেন, কেন?
এই যে ক্রোয়েশিয়ার জার্সি পরে বসে আছো।
তো কী হয়েছে?
আমি তো জানি তুমি ব্রাজিলের সাপোর্ট করো। গায়ে ক্রোয়েশিয়ার জার্সি—তাই অবাক হলাম।
অবাক হওয়ার কী আছে? আমি তো আজ ক্রোয়েশিয়কে সাপোর্ট করছি।
খৈনিদা বললেন, হলুদ জার্সির দলের সাপোর্টাররাও তো হলুদ স্বভাবের হবে। আজ এই দল তো কাল ওই দল। 
তুলি বৌদি গলা চড়িয়ে বললেন, মুখ সামলে কথা বলবে কিন্তু। 
খৈনিদা স্মিত হেসে বললেন, কী করবে? হলুদ জার্সি পরে সতর্ক করবে নাকি?

তুলি বৌদি কথা বাড়ালেন না। খেলা শুরু হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনা বনাম ক্রোয়েশিয়া। প্রথমার্ধে দুদল আক্রমণ করেছে। কাছাকাছি গিয়েও কেউ গোল পায়নি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টাইন গোলকিপার উইলি কাবায়েরোর শিশুতোষ খেলায় খৈনিদার বুক ভেঙে গেল। ওদিকে তুলি বৌদি শিশুদের মতো লাফাতে শুরু করেছেন। এক-দুই-তিন করে তিন তিনটি গোল হজম করে বৈদ্যুতিক খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি। গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন ভক্তদের কান্না। এদিকে পর্দার এপাশে খৈনিদাও অধিক শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন। পাড়া-মহল্লার দু-একটি বাড়ি থেকে উল্লাসের শব্দ আসছে। খৈনিদা বুঝলেন, তুলি বৌদির মতো অনেক ব্রাজিল সমর্থকের জন্য আজ মধুরাত। স্লিপিং পিল খেয়েও যারা ঘুমোতে পারেন না, সেই ব্রাজিল সমর্থকরা আজ নাক ডেকে ঘুমোবেন।

(ঢাকাটাইমস/২২জুন/এইচএফ)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত