গাজীপুরে বিএনপির লড়াই হেফাজত নেতার সঙ্গেও

ইফতেখার রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ জুন ২০১৮, ২৩:৪৭ | প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৮, ১৯:৩১

গাজীপুরে ভোটের লড়াইয়ে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে ধর্মভিত্তিক আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলামের এক নেতার প্রার্থী হওয়ার বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে আলোচনা তৈরি করেছে। আর এই বিষয়টি বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের জন্য নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির কারণ হচ্ছে নানা দিক থেকে।

হেফাজতের গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ ফজলুর রহমান অবশ্য এই সংগঠনের ব্যাপারে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সাবেক শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের হয়ে। তার মার্কা মিনার।

১৯৯৯ সালেই বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয় ইসলামী ঐক্যজোট। তবে ২০১৬ সালের শুরুতে জোট ছেড়ে আলাদা হয় তারা। আর বিএনপির সঙ্গে এই বিভক্তির পরেই হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব কমতে থাকে।

যদিও ফজলুর রহমান স্পষ্ট করেই বলছেন, কোনো প্রার্থীকে সুবিধা দেয়ার জন্য বা কাউকে বেকায়দায় ফেলার জন্য তিনি প্রার্থী হননি। তিনি প্রার্থী হয়েছেন তাদের দলের পক্ষে। ভোটের মাঠে তাদের ভোটের অবস্থান জানান দিতে চান।

ফজলুর রহমান প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ ও পথসভায় অংশ নিচ্ছেন, সঙ্গে থাকছেন কওমি মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষকরা।

দেশের অন্যান্য এলাকার মতো গাজীপুরেও বেশ কিছু কওমি মাদ্রাসা রয়েছে এবং তাদের ছাত্র-শিক্ষক এবং অনুসারীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট আছে। আবার মসজিদ মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্তদের একটি বড় অংশ নিশ্চিতভাবে ফজলুর রহমানের পক্ষেই কাজ করছেন ও ভোট দেবেন। 

হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে কাউকে মেয়র পদে সমর্থন দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে ফজলুর বলেন, ‘না এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং কোন নির্দেশনাও আমাদেরকে দেওয়া হয়নি।’

‘হেফাজত একটি ধর্মীয় ও অরাজনৈতিক সংগঠন। তবে আমি সংগঠনের জেলার সাধারণ সম্পাদক, তাই হেফাজতের কর্মীরা সবাই আমার পক্ষে কাজ করছেন।’

ভোটাররা কেন আপনাকে ভোট দেবে- এমন প্রশ্নে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমার জন্ম এই গাজীপুরে। শৈশব, কৈশর ও যৌবন কেটেছে এখানে। সে হিসেবে গাজীপুরের রাস্তা-ঘাট ও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান ছাড়াও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে জনগণ আমাকে ভোট দেবে।’

‘আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ মাদক ও সন্ত্রাস। শুধুমাত্র আইন করে অপরাধ দমন করা যাবে না। তাই নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নতির জন্য ইসলামের আলোকে সমাজকে সুন্দর করে গড়ে তোলা হবে।’

আগামী ২৬ জুন গাজীপুরে যে ভোট হতে যাচ্ছে তাতে জাহাঙ্গীর আলম, হাসান উদ্দিন সরকার ও ফজলুর রহমান ছাড়াও মেয়র পদে লড়াই করছেন আরও চার জন। তারা হলেন: ইসলামী আন্দোলনের নাসির উদ্দিন (হাতপাখা), ইসলামিক ফ্রন্টের জালাল উদ্দিন (মোমবাতি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাজী মো. রুহুল আমিন (কাস্তে) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদ আহমদ (টেবিল ঘড়ি)।

পাঁচ বছর আগে হেফাজতের আবেগি বক্তব্যে বিএনপির বাজিমাত

২০১৩ সালের মেয়র নির্বাচনে হেফাজতের ভূমিকা ছিল আগ্রহোদ্দীপক। ওই বছরের মে মাসে রাজধানীর শাপলা চত্ত্বরে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদেরকে উচ্ছেদে অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানির গুজব ছড়িয়ে পড়ে। আর হেফাজত নেতারা তখন আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ব্যাপক প্রচারে নামেন যা ক্ষমতাসীনদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাটিতে বিএনপির দেড় লাখ ভোটে জয়ের একটি কারণ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক জনগোষ্ঠীর যতটা প্রভাব লক্ষ্য করা হয়, ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন কখনও হয় না। তবে কোনো বৃহৎ দলের পক্ষে নেতারা ভোটের প্রচারে নামলে তারা যে প্রভাব ফেলতে পারেন, এটা স্বীকৃত। এই দিক থেকে হেফাজত নেতার আলাদা লড়াই বিএনপির জন্য কিছুটা হলেও বেকায়দার কারণ হতে যাচ্ছে গাজীপুরে।

২০১৩ সালেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ফজলুর রহমান। পরে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় তিনি তা প্রত্যাহার করে নিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম এ মান্নানের পক্ষে প্রচারণায় নামেন।

তবে এবার শেষ অবধি ভোটের লড়াইয়ে থাকবেন, জানিয়ে দিয়েছেন হেফাজত নেতা। বলেন, ‘গতবার জোটের সিদ্ধান্তে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলাম। কিন্তু এবার জোটের বাইরে থাকায় নির্বাচন অনেকটাই নিশ্চিত।’

আবার ২০১৩ সাল তখন শাপলা চত্বরে অভিযান নিয়ে নানা ‘বিকৃত তথ্য’ ও আবেগী বক্তব্য তখন ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে বলে ধারণা করা হয়। তবে এবার হেফাজত নেতা তার গণসংযোগে সেসব বক্তব্য আর তুলে ধরছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন, ‘এটা আসলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সুতরাং এখানে ৫ মের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এখানে লোকাল সমস্যাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরে  আমরা ভোট প্রার্থনা করছি।’

২০১০ সালে নারী নীতি বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক দলগুলোর নেতারা গঠন করেন হেফাজতে ইসলামী। আর ২০১৩ সালে ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে তাদের অবস্থান ও সেখান থেকে উচ্ছেদের পর ছড়ানো নানা গুজব সংগঠনটিকে নিয়ে তুমুল আলোচনা তৈরি করে। যদিও সে সময় বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির গুজবের পরে আর কোনো প্রমাণ মেলেনি। আর সেসব কথা এখনও আর বলছেনও না হেফাজত নেতারা।

ঢাকাটাইমসকে হেফাজত নেতা মেয়র প্রার্থী ফজলুর রহমান বলেন, ‘সাধারণ জনগণ এখন উভয় দলের উপর ক্ষুব্ধ । তাদের কাউকেই জনগণ ভালোভাবে মেনে নিচ্ছে না। গত পাঁচ বছর বিএনপির মেয়র আশানুরুপ উন্নয়ন করতে পারেনি। আর এই সরকারও ক্ষমতায় থেকে ব্যার্থতার প্রমাণ দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই কারণে নগরীর বাসিন্দারা নতুন কাউকে বেছে নেবে এবং আমাকে মেয়র হিসেবে জয়লাভ করাবে ইনশাআল্লাহ।’

ভোটারদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন- জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন, ‘খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি আমরা।’

জাহাঙ্গীর-হাসান দুই পক্ষেই কওমি সংশ্লিষ্টরা

কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ভোট টানতে পারেন-এমন বিশ্বাস থেকে আওয়ামী লীগের জাহাঙ্গীর আলম এবং বিএনপির হাসানউদ্দিন সরকারও তাদের জনসংযোগে এদেরকে সঙ্গে নিয়েছেন।

হেফাজতে ইসলামী ঐক্যজোট ছাড়াও বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে বিভিন্ন দল ২০ দলের শরিক। তারা আবার ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছেন।

কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট একটি অংশের আবার আবার জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। জাহাঙ্গীর নিজেও বেশ কিছু মাদ্রাসায় দাতা হিসেবে পরিচিত। ফলে তার হয়েও ভোট চাইছেন বহু মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক।

জাহাঙ্গীর আলম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘শুধু ১৪দলীয় জোট বা মহাজোটের ভোট নয়, ইসলামী দলগুলোর ভোট, হেফাজতের ভোট এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষের ভোট আমি পাব।’

সম্প্রতি হেফাজতের আমির আহমেদ শাহ শফির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টিও উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলেন, ‘তিনি আমাকে দোয়া করেছেন। সর্বদা আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সাধারণ মানুষের খেদমত করার জন্য বলেছেন।’

টঙ্গীর সংসদ সদস্য (গাজীপুর-২ আসন) আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ আহসান রাসেল ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘হেফাজতকে নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেভাবে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাতে আমি মনে করি এই ছাত্র-শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা এবার আমাদেরকেই নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন।’

বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘অতীতে হেফাজতের ন্যায়সঙ্গত দাবির সঙ্গে ছিল বিএনপি। বিএনপি যেমন জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তেমনি শিকার হয়েছেন হেফাজতের নেতারা। নিশ্চয়ই সেগুলো তারা ভুলে যাননি।…তাই আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের অধিকাংশ ভোট আমিই পাব।’

ঢাকাটাইমস/২২জুন/আইআর/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত