আবেদন হারিয়েছে বামশক্তি

কাজী রফিকুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৯ জুন ২০১৮, ১৫:১৭ | প্রকাশিত : ২৯ জুন ২০১৮, ০৮:১০
ফাইল ছবি

দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করছেন সাবেক বামপন্থী নেতারা। সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি জনসমর্থন আদায়েও তারা রাখছেন সাফল্য। কিন্তু বামপন্থী দলগুলোতে থেকে তারা আবার জনগণকে আকর্ষণ করতে পারছেন না।

বাম দলগুলো বড় দলগুলোকে নানা সময় নানা পরামর্শ দিচ্ছে কীভাবে রাজনীতি করা উচিত, রাজনীতিতে গুণগণ কী পরিবর্তন আনা উচিত। কিন্তু নিজেদের মধ্যেই এই পরিবর্তন আনতে পারছে না তারা।

বাম দলগুলো এবং নেতারা নানা ইস্যুতে সব সময় সোচ্চার। গণমাধ্যমও তাদেরকে বেশ গুরুত্ব দেয়। ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির দিক থেকেও তাদেরকে নিয়ে নেতিবাচক খুব বেশি কথা শোনা যায় না। কিন্তু ভোটের ফলাফলে তাদের কোনো প্রভাবই নেই।

দেশের অন্যতম প্রধান বাম দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতা স্বীকার করেছেন, তারা ভোটের অংক বুঝতেই পারছেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরীও মনে করেন, বামদের কোনো অবস্থান নেই বাংলাদেশে। কিন্তু এটা বামরা স্বীকার করতে চায় না।

সদ্য সমাপ্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ছয় লাখ ৩০ হাজার ভোটের মধ্যে বামপন্থী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির কাজী মো. রুহুল আমীন ভোট পেয়েছেন ৯৭৩ টি। সাত মেয়র প্রার্থীর মধ্যে তার অবস্থান সবার নিচে।

বামপন্থী অন্য কোনো দল এখানে প্রার্থী দেয়নি। যদি ধরে নেয়া হয়, তাদের অনুসারীদের ভোটও পেয়েছেন সিপিবির প্রার্থী, তাহলে সেটি গোটা বামপন্থী রাজনীতির আবেদন হারানোর প্রমাণ হিসেবেই দেখা যায়।

গত ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও পাঁচ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৫৩৪ ভোট পেয়ে সবার তলানিতে ছিলেন সিপিবির মিজানুর রহমান বাবু। 

এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সিপিবি-বাসদ-এর সম্মিলিত প্রার্থী বজলুর রশিদ ফিরোজ এক হাজার ২৯ ভোট পেয়ে জামানত হারান।

সে সময় ঢাকা উত্তরে একই জোটের আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন দুই হাজার ৪৭৫ ভোট এবং আওয়ামী লীগের শরিক জাসদের নাদের চৌধুরী পান এক হাজার ৪১ ভোট।

এমনকি আলোচনায় না থাকা ধর্মভিত্তিক দলগুলোও এখন বামপন্থী দলের চেয়ে ভালো ভোট পাচ্ছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন ভোট পেয়েছে ২৬ হাজার ৩৮১ টি। এটি সিপিবির প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে ২৭ গুণেরও বেশি। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ইসলামী আন্দোলন সিপিবির প্রায় ২৭ গুণ বেশি ভোট পায়।

বাম দলগুলো বরাবর মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার। বড় দলগুলো এ নিয়ে কর্মসূচি না দিলেও নিজেদের মতো করে যতটাই হোক নানা বক্তব্য তুলে ধরে তারা। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, চালের দামসহ নানা ইস্যুতে রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নানা সময় চুপ থাকলেও বাম নেতারা রাজপথে নানা সময় প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

পরিবেশ নিয়েও সব সময় উচ্চকণ্ঠ বামরা। বিশেষ করে তাদের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন বেশ নাড়া দেয়। বিএনপির মতো বড় দলও বামদের এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে।

বাম নেতারা প্রায়ই দাবি করেন যে, দুই প্রধান দলের প্রতি বীতশ্রত হয়ে গেছে মানুষ। কিন্তু এই ‘বীতশ্রত’ মানুষদেরকে দলে টানতে পারছে না তারা। বরং দিনে দিনে তারা ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিপিবির পাঁচ জন নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের বাইরে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন তখন বরিশালের একটি আসন থেকে জিতেছিলেন হাতুরি প্রতীক নিয়ে।

১৯৯৬ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ এর একাংশের নেতা আ স ম আবদুর রব লক্ষ্মীপুরের একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এরপর কেবল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর এবং পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের শরিক হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে কয়েকজন বাম নেতা ভোটে জিতেছেন। এটা নিশ্চিত যে, নিজেদের শক্তিতে নয়, জয় এসেছে আওয়মী লীগের সমর্থনে।

‘ভাবি জনগণ আমাদের ভোট দেবে, কিন্তু দেয় না’

সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স স্বীকার করেছেন, তারা জনগণকে পড়তে ভুল করেছেন। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের অংক আমরা যেমন বুঝি, বাংলাদেশের নির্বাচনের অংক বুঝতে আমাদের কতগুলো ঘাটতি আছে।’

‘নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারছি, তারা আমাদের ভোট দেবে। কিন্তু নির্বাচনের সময় দেখা যায় আমরা ভোট পাচ্ছি না। এই অংক বুঝতে আমাদের ঘাটতি আছে।’

তবে খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণ সঠিক ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি দাবি করেন প্রিন্স। বলেন, জনগণ ভোট দিতে পারলে তাদের প্রার্থীর ভোট আরো বাড়ত।

কিন্তু এর মধ্যেও তো আপনারা যাদের গুরুত্ব দেন না, সেই ধর্মভিত্তিক কিছু দল ঠিকই ভোট পাচ্ছে- এমন মন্তব্যের জবাবে প্রিন্স বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক ধর্মপ্রাণ। অধিকাংশ ইসলামিক দলগুলোর মুরিদরাই পীরদের ভোট দিয়ে থাকেন। আমার কাছে মনে হয় এটাই তাদের ভোট পাওয়ার কারণ।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বাড়াতেই চাইলেন না।  বাম রাজনীতির প্রবীণ এই নেতা বলেন, ‘গাজীপুর নির্বাচনের বিষয়ে আমরা একটা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছি। সেখানে সব দেয়া আছে। এর বাহিরে কিছু নাই। এর বাহিরে কিছু বলব না।’

গাজীপুর ও খুলনায় অংশ নেয়নি আরেক আলোচিত বাম শক্তি গণসংহতি আন্দোলন। তিনিও গণমাধ্যমের পরিচিত মুখ। প্রায়ই তিনি ক্ষমতাসীন দলকে জনবিচ্ছিন্ন বলে আক্রমণ করেন। তবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ভোটে দাঁড়িয়ে তিনি সাত হাজার ৩৭০ ভোট পেয়ে জামানত হারান।

বামদের ভোট কমার বিষয়ে জানতে চাইলে সাকি সরাসরি কিছু না বলে দোষারোপ করেন ক্ষমতাসীনদের প্রভাবকে। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘সরকার একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে চায়। তারা তাদের শাসনের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করেছে। খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচন তারই প্রমাণ। এখানে নির্বাচনের কোন পরিবেশ নেই।’

‘বামরা যে শক্তিহীন সেটা তারা মানে না’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আফসান চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশে বাম রাজনীতি কখন সফল ছিল না। আর তারা রাজনীতিতে আসলে পরিপক্কও নয়।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও হিউম্যানিটি বিভাগের অধ্যাপক বলেন, ‘বাংলাদেশে এককভাবে বামরা কখনো তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে পারেনি। এর বেশ কিছু কারণ আছে, এরা রাজনীতি ওইভাবে বোঝে না। আবার তাদের অবস্থান সুদৃঢ় না, এটাও তারা মানতে চায় না।’

‘১৯৪৭ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বাম রাজনীতির একটা ভীত ছিল। তারপর থেকে ডানদের ছাড়া বামরা কখনোই দাঁড়াতে পারেনি। ইসলামিক দলগুলো ৫ শতাংশ ভোট পায়। আবার পীর যারা তাদের ক্ষেত্রে আরও বেশি। কারণ, মুরিদ হওয়ার শর্ত ভোট দিতে হবে। বামরা রাজনৈতিক ভাবে অনেক পিছিয়ে।’

ঢাকাটাইমস/২৯জুন/কারই/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত