চিকিৎসার জাতীয়করণের উদ্যোগটা নিক সরকার

ওয়াসেক বিল্লাহ
 | প্রকাশিত : ০৯ জুলাই ২০১৮, ১৩:৫৭

কিছুদিন পর পর চিকিৎসকদের ধর্মঘট দেখতে দেখতে মনটা বীতশ্রত, ক্ষুব্ধ। রোগীদের জিম্মি করার মতো অমানবিক কাজ করে বারবার তারা সফল হয়ে আস্ফালনটাও বেড়েছে।

অন্যান্য অনেক খাতের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সারাদেশে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে। কিন্তু অন্য সব খাতের নৈরাজ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষরাও উচ্চকিত, সংস্কার করে আরও জনবান্ধব করার আলোচনাও আছে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটা নেই। সরকার বলছে বটে, কিন্তু চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করছে। আর কোনো ব্যক্তি চিকিৎসকের অনিয়মের পক্ষেও প্রায়ই দাঁড়াচ্ছে তারা।

সবশেষ নমুনা দেখিয়েছেন চিকিৎসকরা চট্টগ্রামে। সেখানকার ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলায় শিশু মৃত্যৃর অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তেই। বলাই বাহুল্য এই তদন্ত করেছেন চিকিৎসকরাই। ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ এসেছে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।

আবার এই তদন্তে উঠে আসা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে পাঁচটি বেসরকারি হাসপাতালে নানা ভাওতার প্রমাণ পেয়ে নিয়েছে ব্যবস্থা। ব্যস, ওমনি এগিয়ে আসলেন বেসরকারি হাসপাতালের মালিক-ডাক্তারা। পাল্টা চাপ দিতে তারা বন্ধ করে দিলেন চিকিৎসা।

একটি হাসপাতাল মালিক যিনি একজন চিকিৎসকও, তার বক্তব্যের একটি ভিডিও প্রকাশ হয়েছে নিজেদের মধ্যে বৈঠকের। সেখানে তিনি রীতিমতো ‘মার’ দেয়ার কথা বলেছেন। এই ‘মার’ কাকে দেবেন তিনি সেটা স্পষ্ট নয়। তবে ‘মার’ দেয়া হয়েছে জনগণকেই। এক দিনের ধর্মঘটে রোগীদের ভুগিয়ে দাবি আদায়ে প্রশাসনের কাছ থেকে অঙ্গীকার আদায় করে নিয়েছেন হাসপাতাল মালিকরা।

সামাজিক মাধ্যমে চিকিৎসকদের বিভিন্ন পেজে ঢুকলে জনগণের প্রতি তাদের অদ্ভুত মনোভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়। অদ্ভুত বলা হচ্ছে এই কারণে যে সেখানে এমন বহু লেখা আছে যার মানে এমন দাঁড়ায় যে চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি মেধাবী আর আইন অমান্য হলেও তাদের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নিতে পারবে না।

এই ব্যবস্থা আসলেও নেয়া যাচ্ছে না। কারণ পরিবহন শ্রমিকদের চেয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে নৈকট্য আরও প্রকট আর কথায় কথায় তারা ধর্মঘটে গিয়ে তীব্র ভোগান্তি তৈরি করে প্রশাসনকে প্রতিবারই নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছে।

যে যে কারণে চিকিৎসকরা ধর্মঘটে গেছে, সেটা রীতিমতো বিস্ময়কর। ২০১২ সালে অফিস সময় চলাকালে বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছিলেন মৌলভীবাজারের একজন সরকারি চিকিৎসক। হাতেনাতে ধরে তাকে কারাদণ্ড দেয়ার পরদিন থেকে গোটা জেলায় রোগী দেখা বন্ধ করে দেয় চিকিৎসকরা। আর রোগীদের দুর্দশা চরমে উঠার পর ওই চিকিৎসককে মুক্তি দেয়া হয়।

২০১২ সালের ৩০ মে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমিনুল ইসলামের মলদ্বারের অপারেশন করার সময় শরীরের ভেতর সুঁই রেখে দেয়ার ঘটনায় মামলা হলে ২০১৩ সালের ৩ জুন এক চিকিৎসককে কারাগারে পাঠায় আদালত। আর পরদিন থেকে চট্টগ্রামে ধর্মঘট শুরু করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। আর চাপ দিয়ে তিন দিনের মধ্যে ওই ডাক্তারকে জামিনে ছাড়িয়ে আনেন তারা।

২০১৪ সালে রাজশাহীতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর পর ভুল চিকিৎসার অভিযোগে মামলা করেন তার স্বজন। আর এই মামলায় আসামি চিকিৎসক গ্রেপ্তার হলে গোটা জেলায় ধর্মঘটে যায় চিকিৎসকরা। তখনও তারা সফল হয়।

এক রোগীর মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে মামলা করলে ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দিন ধর্মঘট করেন চট্টগ্রামের চিকিৎসকরা। আর এভাবেই তারা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির ১৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘আপা’ ডাকায় এক রোগীর স্বজনকে অপমানজনক শাস্তি দেয়ার ঘটনা তদন্ত করে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। চাপ দিয়ে তখনও সফল হয় চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে, তাতে এটা স্পষ্ট যে রোগীদের তারা ব্যবসার উপকরণ হিসেবে নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, তারা রোগীদের অকারণে অতিরিক্ত ওষুধ দেন। বিভিন্ন গবেষণাতেও এর প্রমাণ আছে। অভিযোগ আছে, ওষুধ কোম্পানি থেকে নেয়া উপহার আর টাকা প্রাপ্তি এর কারণ।

অথচ অতিরিক্ত ওষুধ দেয়া হয়েছে কি না, এটি রোগীর বোঝার উপায় নেই কোনোভাবেই। তারা কারণে অকারণে ওষুধ খেয়ে এরই মধ্যে বহু এন্টিবায়েটিক আর কাজ করছে না।

রোগ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে কমিশন নেয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ। প্রয়োজন হলে যেকোনো রোগ পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু সেখান থেকে ডাক্তার কেন টাকা নেবেন, এই প্রশ্নটি চিকিৎসকদের কারও কাছ থেকে জোরেশোরে উঠতে শুনলাম না।

সরকারি চিকিৎসকরা নিয়ম মতো হাসপাতালে যান না, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চাকরিচ্যুতির হুমকিতেও সেভাবে কাজ হয়েছে, তার প্রমাণ নেই। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রাম এলাকার হাসপাতালগুলো বেশি ভুগছে।

এর মধ্যে চিকিৎসকদের আচরণ নিয়ে রোগীদের ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাত্রা। দলে দলে সামর্থ্যবানরা বিশেষ করে ভারতে যাচ্ছে কেবল ডাক্তার দেখাতে। সেখান থেকে ঘুরে আসা রোগীরা চিকিৎসকদের আচরণ আর পেশাদারিত্ব নিয়ে যেসব কথা বলেন, তাতে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের আচরণ নিয়ে হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এ থেকে উত্তরণ কী কখনও হবে না? আমার ক্ষুদ্র চিন্তা বলছে, আর যাই হোক, বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবার চাবি রেখে এটা সম্ভব নয়।

হাসপাতালের জাতীয়করণের কাজটি শুরু করুক সরকার। একদিনে হয়ত হবে না, কিন্তু এ ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিক করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগীদের যে পরিমাণ হয়রানি করছে, তেমন অভিযোগ সরকার হাসপাতালে আসে না। সেখানে যেসব অভিযোগ, তার বেশিরভাগের জন্য দায়ী সক্ষমতার অভাব আর চিকিৎসকের অনুপস্থিতি আর লোকবল সংকট। অনেক বেশি কাজ করলে আচরণটা খারাপ হতে পারে। এগুলোর সমাধান করুন।

টাকা আসবে কোত্থেকে-সবচেয়ে বড় এই প্রশ্ন। আমার কথা হচ্ছে, সরকার এমন হিসাব করুক যে, কত টাকা করে টিকিট কাটলে, কত টাকা শয্যা ভাড়া দিলে হাসপাতালের টাকায় হাসপাতাল চলতে পারবে।

শুরুতে কিছু মানুষ শোরগোল করবে, সমস্যা নেই। ১০ টাকা বা ২০ টাকার টিকিটে সব হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে হবে-এই চিন্তাটা বাদ দেয়া যেতেই পারে।

দুই টাকা ইউনিট যখন বিদ্যুতের দাম ছিল তখন বিদ্যুতের কষ্টে যে পরিমাণ পুড়েছে মন, এখন অতিরিক্ত বিলেও ততটা পুড়ে না। মাথার ওপর পাখা না ঘুরলে যে কষ্ট, সেটা টাকার কষ্টের চেয়ে বেশি।

একইভাবে হাসপাতালের বিল বেশি নিন, আপত্তি করব না। কিন্তু সেটার মানটা উন্নত হোক। ২৪ ঘণ্টা না হোক, ছয় ঘণ্টার বদলে ১৮ ঘণ্টা রোগী দেখা হোক সরকারি হাসপাতালে। হাসপাতালগুলো পরিচ্ছন্ন হোক, টয়লেটগুলো ঝকঝকে তকতকে হোক। রোগী অপেক্ষার জায়গায় আরামদায়ক চেয়ার থাকুক। গরমের দেশ হিসেবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থাকুক।

আরও বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স নিয়োগ হোক। টাকা আসবে কোত্থেকে? ওই যে বললাম, ২০ টাকার টিকিট কেটে ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই।

দেশের দারিদ্র্যের হার যখন ২২ শতাংশ আর দারিদ্র্য সীমার ওপরে কিন্তু ঝুঁকিতে রয়ে গেছে যখন আরও অন্তত ২০ শতাংশ, তখন এই কথাগুলো গরিববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান আছে।

কারা দরিদ্র্য, সেই তথ্য দরকারের কাছে থাকা উচিত। স্মার্ট পরিচয়পত্রে এই তথ্যটিও সন্নিবেশিত করা সম্ভব। যে ২২ শতাংশ দরিদ্র্য তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা কঠিন হবে না। যদি আরও ১০ শতাংশকে এই সুবিধা দেয়া যায়, সেটাতেও মনে হয় কেউ আপত্তি করবে না।

যারা দিতে পারবে না, তাদেরকে বিশেষ তহবিল থেকে টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করুন। যারা টাকা দিতে পারবে না, তাদের টাকাটা বাকিরা সবাই মিলে দিয়ে দেবে। তাতে সবার ওপরই চাপ কমবে।

ব্যাপকভাবে চিকিৎসা বিমা চালুর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষদের প্রিমিয়াম সরকার দিয়ে দিতে পারে। প্রতি মাসে বা প্রতি সপ্তাহে যদি বিমার প্রিমিয়াম দেয়া যায়, তাহলে আমার ধারণা চাপটা কম আসবে। আর বিপুল সংখ্যক মানুষকে বিমার আওতায় আনা গেলে প্রিমিয়ামও খুব বেশি হবে না।

এ জন্য হিসাব কষতে হবে টিকিটের টাকা কত হবে। তাহলেই ম্যাক্স হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, অ্যাপোলো বা অন্য সব হাসপাতালের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে, সেগুলো আসবে না বলেই আমার ধারণা।

আরেকটা বিষয় জরুরি। মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ প্রথা বাতিল। এতে কিছু মানুষ চাকরি হারাবে বটে, কিন্তু রোগীদের অকারণে বিপুল ওষুধ দেয়ার প্রবণতা কমবে। এক বছরের বাচ্চাকে গরমের কারণে কাশি হলে এন্টিবায়োটিক আর ডাক্তাররা দেবে না- সেটা নিশ্চিত।

লেখক: সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত