কোটা নিয়ে রাজনীতি না অপরাজনীতি!

মাহবুব রেজা
 | প্রকাশিত : ১১ জুলাই ২০১৮, ০৮:১৯

দেশের নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তৈরি করা কিংবা তৈরি হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে রাজনীতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে সেই প্রশ্ন দিন দিন মানুষকে ভাবিয়ে তুলছেÑএ রকমটাই মনে করছেন রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে কোনো ইস্যুকে ইস্যু বানাতে যেখানে ব্যর্থ সেখানে এই কোটা সংস্কার আন্দোলন যেন তাদের মধ্যে নতুন করে রাজপথ গরম করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সুতরাং এই সুযোগ হেলায় ফেলায় নষ্ট করা যাবে না এ রকম ভেবে তারা একে যথাযথ ব্যবহারে মাঠে নেমেছে বলে তারা বলছেন। তবে তারা বলছেন কোটা নিয়ে সাধারণ ছাত্রদের এই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের পাশে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তারা তৎপর, ফলে মানুষের সামনে ছড়িয়ে পড়ছে ভুল তথ্য। রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, সাধারণ ছাত্রদের নামে চলতে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত অপরাজনীতিতে পরিণত হবে! পাশাপাশি দেশের শিক্ষাঙ্গনকে অস্থির করে এর আগে এক-এগারোর সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল সে রকম অবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিল রাজনীতির অশুভ শক্তিটি। সরকার সে যাত্রায় ঠান্ডা মাথায় কৌশলী ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে পরিস্থিতির অবনতি হয়নি।

জানা যায়, শুরুর দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে তা নানা কারণে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়ে সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। ছাত্ররা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন করে আসছিল। তবে গত এপ্রিলে এই আন্দোলন কোনো কারণ ছাড়া আচমকাই সহিংস রূপ ধারণ করে। দেশের বিদ্যমান নিরুত্তাপ রাজনৈতিক পরিবেশে সাধারণ ছাত্রদের এই আন্দোলনকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং তাদের সঙ্গে থাকা একটি অশুভ শক্তি এ থেকে ফায়দা আদায়ে তৎপর হয়ে ওঠে। আর এরই জের ধরে অশুভ শক্তিটি ছাত্র নামধারী বহিরাগতদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে উপাচার্য ভবনে হামলাসহ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা করে বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি করে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে তৎপর হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ক্যা¤পাসের এই উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামলে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়ে পড়ে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন ক্যা¤পাসে। নাশকতামূলক কর্মকা-ে দেশবাসী আতংকিত হয়ে পড়েছিল। সেসময় সেই অশুভ শক্তিটি এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে গিয়ে মেতে উঠেছিল সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সাধারণ ছাত্রদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি সরকারের একটা বড় অংশের এক ধরনের নৈতিক সমর্থন ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই আন্দোলন যখন কিছু অশুভ শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হতে থাকল তখন তারা তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে গেলে পুরো বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কোটা নিয়ে রাজনীতির এই চরম অবস্থার কি পরিণাম হতে পারে তার পূর্বাভাষ বুঝতে পেরে সরকার হার্ড লাইনে অবস্থান নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে কঠোর হাতে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরিবেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসে। এ ঘটনার পর ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় সংসদে কোটাব্যবস্থা বাতিলের কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি কোটা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কোটা তুলে দেয়ার কথা বললে ছাত্ররা আন্দোলন ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যায়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় কোটা সংস্কার আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

দুই.

সরকারি চাকরিতে বর্তমানে সংরক্ষিত কোটা ৫৬ শতাংশ। এর বাইরে ৪৪ শতাংশ নেয়া হয় সরাসরি মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে। বিসিএসে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০, জেলা কোটায় ১০, নারী কোটায় ১০ ও উপজাতি কোটায় পাঁচ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণ করা আছে। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে এক শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের বিধান আছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি পড়াশোনা শেষে অধিক হারে কোটা থাকায় তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে কোটা পরিচয়ে অনেক ক্ষেত্রে কম মেধাবীরা জায়গা করে নিচ্ছে, ফলে হতাশা আর বেকারত্ব বাড়ছে। সাধারণ ছাত্রদের দাবি কোটার ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরও কমিয়ে এনে মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হোক। জানা যায়, সবকিছু ভালোই চলছিল।

তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার তিন মাস পরও কোটা বাতিলের বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় ৩০ জুন থেকে আবার রাস্তায় নামে ছাত্ররা। ২৭ জুন সংসদে ‘সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকতে হবে, কমানো যাবে না’Ñ বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবশ্যই, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই তো আজ আমরা স্বাধীন। তাদের অবদানেই তো আমরা দেশ পেয়েছি।’ রাজনীতি-বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে পুঁজি করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনে সক্রিয় থাকা রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়া অশুভ চক্রটি আবার নতুন করে মাঠে নামে। সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করে নিজেদের শক্তিসহ মাঠে নামে তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা সংস্কারের ইন্ধনদাতারা পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়ে। শুরু হয়ে যায় কর্মসূচি-পাল্টা কর্মসূচি। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েক নেতাকে গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে মোড় নেয়। সরকারি ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ওপর মহল থেকে নির্দেশ ছিল যেন তাদের নেতাকর্মীরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু কিছু অতি উৎসাহী নেতাকর্মী কোটা সংস্কারের আন্দোলনে থাকা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষে, বাহাসে, বিতর্কিত কর্মকা-ে, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সরকারের জন্য তা এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

তিন.

ইস্যুহীন রাজনীতিতে বিরোধী দলের জন্য সব কিছুই ইস্যু হয়ে যায়Ñ বিএনপির শীর্ষ নেতারা সংস্কার নিয়ে চলতে থাকা রাজনীতিতে নাক গলিয়ে সরকারের ব্যর্থতা, পদত্যাগ দাবি করেছেন। বিএনপির সঙ্গে একই ঢঙে গলা মিলিয়েছেন কিছু বাম নেতাও। এসব বাম নেতা নিজেদের অতীত বিসর্জন দিয়ে বিএনপি নেতাদের সুরে সংস্কার আন্দোলন প্রতিরোধে সরকারি ছাত্রসংগঠনের ভূমিকার নিন্দা করতে গিয়ে ছাত্রলীগকে এনএসএফ-এর সঙ্গে তুলনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। রাজনীতি-বিশ্লেষকরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের রাজনীতি যাদের নির্দেশে চলছে তা সহসাই অপরাজনীতিতে পরিণত হবে বলে উল্লেখ করে বলছেন, সংস্কার আন্দোলন প্রতিরোধে নানা কারণে ছাত্রলীগের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতেই পারে কিন্তু তাই বলে এদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রনায়ক ৬৯ বছরের ঐতিহ্যমাখা একটি ছাত্রসংগঠনকে এনএসএফ-এর সঙ্গে তুলনা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মাহবুব রেজা: কথাসাহিত্যিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত