মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে রায় মন্ত্রীর কাছে জানেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৮, ১৫:৩৯ | প্রকাশিত : ১৭ জুলাই ২০১৮, ১৪:৪০

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সরকারি চাকরিতে কোটা থাকবে না ঘোষণা দেয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে রায়ের কথা প্রধানমন্ত্রী জেনেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছে।

মঙ্গলবার গণভবনে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় শেখ হাসিনা এই কথা জানান। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ইলেকট্রনিক ট্রান্সফার পদ্ধতিতে সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর কার্যক্রম উদ্বোধন করতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এই ‍সুবিধা প্রথম পাচ্ছেন কক্সবাজারের মুক্তিযোদ্ধারা। সারাদেশের সব মুক্তিযোদ্ধাই ধীরে ধীরে এভাবে তাদের ভাতা পাবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারগুলো কী অবস্থায় পড়েছিল, তার বর্ণনার পাশাপাশি তিনি ক্ষমতায় আসার পর কী কী সুবিধা দিয়েছেন, সেটা তুলে ধরেন। কথা বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে।

সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের দাবিতে প্রথম আন্দোলনের চেষ্টা হয় ৯০ দশকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতায় তাদের ছেলেমেয়েদেরকেও আনে। এরপর স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের অনুসারীরা এই কোটা বাতিলের দাবিতে নানা কর্মসূচি শুরু করে।

তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যে আন্দোলন শুরু হয় তাতে কোনো বিশেষ কোটার কথা না বলে কোটা সংস্কারের দাবি সামনে আনা হয়। ৩০ শতাংশ মু্ক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ করে নারী ও জেলা কোট, পাঁচ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা এবং এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটার বদলে সব মিলিয়ে কোটা ১০ শতাংশ করার দাবি ছিল ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’।

আর গত ৮ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত নানা ঘটনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১১ এপ্রিল সংসদে ঘোষণা দেন, সরকারি চাকরিতে কোনো কোটা থাকবে না।

গত ২ জুলাই কোটা সংস্কার, বাতিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটি কমিটি গঠন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ১১ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক জানান, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় আছে। পরদিন সংসদে প্রধানমন্ত্রীও এই রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, এখন এই কোটা বাতিল হলে আদালত অবমাননা হবে।

২০১২ সালেই হাইকোর্ট এমন রায় দিয়েছিল একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। তখন বলা হয়, যদি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পদ পূরণ না হয়, তাহলে সে পদ ফাঁকা রাখতে হবে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর ২০১৫ সালে আপিল বিভাগ জানায়, কোটায় পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া না গেলে সাধারণ মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ দেয়া যাবে।

প্রধানমন্ত্রী গত এপ্রিলে সংসদে তার ঘোষণার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘কোটা আন্দোলনের নামে যখন ভিসির বাড়িতে আক্রমণ, তাদের হত্যার প্রচেষ্টা, ভাঙচুর, লুটপাট, একেবারে বেডরুমে ঢুকে গিয়ে লুটপাট করেছে, গয়নাগাটি, টাকা পয়সা সব লুটপাট করেছে, অরাজক পরিস্থিতি, আমি বললাম, ঠিক আছে, কোটা থাকবে না।’

‘মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী যখন বললেন, এ নিয়ে হাইকোর্টে একটা রায় আছে, আমি তখন পার্লামেন্টে বললাম, যেহেতু এটা হাইকোর্টের রায়, আমরা তো এটা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করতে পারব না। তারপরেও প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে দিয়ে একটা কমিটি করে দিয়েছি, তারা এটা দেখবে। কিন্তু হাইকোর্টের রায়কে আমরা অবমাননা করতে পারি না।’

কোটা নিয়ে ‘বিশেষজ্ঞ’ মত হিসেবে যারা কথা বলেন, তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা আলোচনা করেন, কথা বলেন বা মন্তব্য দেন, তারা না হাইকোর্টের রায়ের সম্পর্কে জ্ঞান আছে না আপিল বিভাগের যে ভার্ডিক্ট সম্পর্কে ধারণা আছে। সেগুলো বেমালুম ভুলে যান।’

প্রচ্ছন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী আন্দোলন

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করলেও আন্দোলনকারীদের বক্তব্য এবং কীর্তিকলাপ দেখে প্রধানমন্ত্রীর ধারণা, এই আন্দোলন আসলে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা হঠাৎ দেখলাম বাংলাদেশে কোটাবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে মনে হচ্ছে যেন প্রচ্ছন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে।’

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উত্তরাধিকারদের অন্তর্ভুক্তির কারণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালের পর আমি মুক্তিযোদ্ধা বা আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এইটুকু বলার সাহসও অনেকে ছিল না। কারণ, এটা বললে পরে চাকরিবাকরি কোনো কিছু হতো না, কোনো সুযোগ পেত না।’

‘মুষ্টিমেয় কিছু লোক যারা ক্ষমতার কাছে গিয়ে ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী তারা পারত। কিন্তু সাধারণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সম্মানই ছিল না, তারা অবহেলিত ছিল।’

‘যেহেতু ৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আমরা দেখেছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকরি পাওয়ার মতো বয়স নেই, তাই আমরা যাতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার যেন বংশানুক্রমিকভাবে তাদের ছেলে মেয়ে, নাতি, তারাও যেন চাকরি পেতে পারেন এবং তারা যেন সুযোগ পায়, সেটা সৃষ্টি করার জন্য আমরা এভাবেই করে দেই।’

‘মুক্তিযোদ্ধা, তার ছেলে মেয়ে বা ছেলেমেয়ের ছেলেমেয়ে, অন্তত বংশানুক্রমে অন্তত রাষ্ট্র পরিচালনায় যেন দায়িত্ব রাখতে পারে সে ব্যবস্থাটা আমরা করে দিয়েছি।’

জাতির পিতার কন্যা বলেন, ‘খুব কষ্ট হয়, যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, তিনি ভিক্ষা করে খায় কিংবা রিকশা চালিয়ে দিন যাপন করে বা দিন মজুরি করে বা খেতে পায় না, চিকিৎসা পায় না, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।’

স্বাধীনতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধীদের অনুসারীরা যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসনে না পারে বা রাষ্ট্রীয় পদ না পায়, সেই বিষয়টাও দেখতে হবে বলেও উল্লে। করেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী কোটা নিয়ে আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে কোটায় নিয়োগ পাওয়ারা মেধাবী নয়, বলে প্রচার নিয়ে কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা পরীক্ষা দেয়, তারা কি মেধাবী না? তারা সকলেই তো মেধাবী। … পরীক্ষা তো যথেষ্ট কঠিন। … অত্যন্ত মেধাবী হলেই তারা পাস করতে পারে। তার পরে তারা চাকরি পায়।’

‘এমন কি ধরনের মেধাবী হয়ে গেল, যারা পরীক্ষা দিচ্ছে, পাস করছে, তারা সকলেই মেধাবী না, এই ধরনের কথাবার্তা তারা বলে কীভাবে? বা হঠাৎ এ রকম আন্দোলনে যাওয়ার মতো যে যৌক্তিকতা আছে, সেটা আমরা বুঝি না।’

যারা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় পাস করে তাদের সবারই চাকরি হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘যতগুলো পদ শূন্য থাকে, ততগুলো পদে চাকরি হয়। বাকি তালিকা থাকে, এটা আমি এমনকি ব্যবস্থা করে দিয়েছি, তারা নন ক্যাডারভুক্ত হয়ে যেন চাকরি পায়, সেই সুযোগটাও করে দিয়েছি।’

এটা কী আন্দোলন?

কোটা নিয়ে আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনে হামলা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আন্দোলন করলে আন্দোলন করবে, কিন্তু সেখানে ভাঙচুর করা ভিসির বাড়ি আক্রমণ করা, তার পরিবার লুকিয়ে কোনো রকমে জীবন বাঁচিয়েছে।’

‘এই ছাত্ররা আন্দোলনের নামে ভিসির বাড়ি আক্রমণ করেছে বা লুটপাট করেছে। এর চেয়ে গর্হিত কাজ শিক্ষার্থীদের জন্য আর কী হতে পারে?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই ধরনের কাজ শিক্ষার্থীরা করতে পারে, এটা ভাবতেই লজ্জা লাগে। তাও যদি তারা আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়, সেটা আরও লজ্জার। কারণ এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমিও ছাত্রী ছিলাম।’

কোটা নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা এই বিষয়টি কেন চেপে যাচ্ছেন, সে প্রশ্নও রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

(ঢাকাটাইমস/১৭জুলাই/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত