চালের দাম নিয়ে আবার কারসাজি

কাওসার রহমান
 | প্রকাশিত : ১৮ জুলাই ২০১৮, ০৮:৪৩
ফাইল ছবি

দাম কমতে না কমতেই চালের দাম নিয়ে আবার শুরু হয়েছে কারসাজি। কারসাজির এ সুযোগ অবশ্য সরকারই করে দিয়েছে। নতুন বাজেটে সরকার হঠাৎ করেই চাল আমদানির ওপর পুনরায় ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। যার ফলে গত এক মাস ধরে ভারত থেকে চাল আমদানি প্রায় বন্ধই রয়েছে। আমদানিকৃত চালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গেই সুযোগটি লুফে নিয়েছে চালকল মালিকরা। ফলে সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে। বেশি বাড়ছে মোটা চালের দাম। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নি¤œআয়ের মানুষ। আর লাভ হচ্ছে দেশি মিল মালিকদের। তারা কর আরোপের দিন থেকেই কেজিপ্রতি চালের দর বাড়িয়েছেন পাঁচ থেকে সাত টাকা। অথচ এখন চালের ভরা মৌসুম। কোনোভাবেই দাম বাড়ার কথা নয়।

গত ৭ জুন দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি চালের আড়ত বাবুবাজার-বাদামতলিতে ভারত থেকে আমদানি করা মোটা চাল বিক্রি হতো ৩৩ থেকে ৩৬ টাকা। ওইদিন প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী দেশের কৃষকের স্বার্থ ও পর্যাপ্ত মজুদের কথা চিন্তা করে চাল আমদানিতে সব মিলিয়ে ২৮ ভাগ কর আরোপ করেন। এর পরদিনই নি¤œআয়ের মানুষের মোটা চালের দর ওঠে সর্বনি¤œ ৩৯ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪১ টাকা পর্যন্ত। আর ২৮ চালের দর ওঠে ৩৬ টাকা থেকে ৪২ টাকায়। মিল মালিকদের কারসাজিতেই চালের বাজারের এই উল্লম্ফন বলে দাবি আড়ত মালিকদের।

কৃষককে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিতে সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে। এর পেছনে সরকারের যুক্তি হলো, এতে ন্যায্য দাম পাবে কৃষক। কিন্তু বাজারে দেখা গেল অন্য চিত্র। নতুন শুল্কে মোটা চাল আমদানি করে তা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ছে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর। বর্তমানে মিনিকেট ৬০, আটাশ ৫০ থেকে ৫৫, স্বর্ণা ৫০, নাজিরশাইল ৬৫ ও পাইজাম ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে পাইজাম ৪৪ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। স্বর্ণার অবস্থাও একই। তবে বাজারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নি¤œআয়ের মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকা মোটা চালের দর। বাজেটের দিন থেকেই এই দুই চালের দর বেড়েছে কেজিতে পাঁচ থেকে সাত টাকা। ভারত থেকে চাল আসা বন্ধ হওয়াতেই এই দুই ধরনের চালের দর এতটা বেড়েছে। তবে অন্য চালের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। এর কারণ হলো কৃষককে বাঁচাতে এমন সময় আমদানি করা চালে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তার আগেই কৃষকরা ধান বিক্রি করে দিয়েছে। আর মিলাররাও সংগ্রহ করা চাল মুজদ করে রেখেছে। ফলে চালের বাজার এখন মিলারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

আমদানিকারক ও মিলারদের হাতে এখনো কিছু পুরনো আমদানি করা চাল আছে, যা বিক্রি হচ্ছে। আবার কেউ কেউ দেশি চাল ভারতীয় চালের পুরনো বস্তায় ভরেও বেশি দরে বিক্রি করছেন। ভারতীয় চাল আসা বন্ধ হওয়ায় দর বাড়লেও লাভ হয়েছেন দেশের মিল মালিকদের। কর আরোপের পর ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধ হওয়ায় মিল মালিকরাই বাজেট ঘোষণার পর এই দর বাড়িয়েছেন। বাজার এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। তারা চাইলে বাজার উঠবেÑ নামবে অথবা স্থিতিশীল থাকবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছর সারা দেশে ৪৭ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও মৌসুমটিতে আবাদ হয়েছে ৪৯ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে। এই জমি থেকে চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর হেক্টরপ্রতি ধানের গড় ফলন ৪ টনের ওপর। এবার ধানের উৎপাদনে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ায় বাম্পার ফলন হয়েছে। এর আগে গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আকস্মিক বন্যায় হাওর অঞ্চলে বোরোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকারি হিসাবে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। যদিও বেসরকারি হিসাবে উৎপাদন আরও কম হয়। ফলে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। হু-হু করে বেড়ে যায় চালের দাম। এ সময় সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে চাল আমদানিতে শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে দুই শতাংশে নিয়ে আসে। কিন্তু এ বছর চালের উৎপাদন ভালো হওয়ায় কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে গত পয়লা জুলাই শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের (২০১৮-১৯) বাজেটে চাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ এবং রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ পুনরারোপ করেছে। আর তার প্রভাবেই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে।

তবে প্রশ্ন হলো বাজেটে নতুন করে শুল্ক আরোপের আগে গত এক বছরে দেশে ৫৬ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। এ বছর আউশ উৎপাদিত হয়েছে ২৭ লাখ টন। আমন মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছে আরও প্রায় এক কোটি ৩৮ লাখ টন চাল। আর সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমেও এক কোটি ৯৭ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। অর্থাৎ গত এক বছরে দেশে চালের জোগান ছিল ৪ কোটি ১৮ লাখ টন। আর সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে চালের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল তিন কোটি ২০ লাখ টন। অর্থাৎ প্রায় এক কোটি টন চালের বেশি জোগান ছিল। ফলে এ সময়ে চালের দাম বৃদ্ধি একেবারেই অযৌক্তিক। তাহলে কোনো কারসাজি না হলে চালের দাম বাড়বে কেন?

আবার বিশ্ববাজারেও চালের দরে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রতি টনে ৩৫ ডলার কমে গেছে। বিশ্ববাজারে প্রতি টন চালের দাম ৪০০ ডলারের নিচে। ঠিক এই সময়ে দেশে মোটা চালের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। এখানে যদি ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের কোনো কারসাজি না থাকে তাহলে দাম না কমে এখন বাড়বে কেন?

আমাদের দেশে সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ানো নতুন কোনো কৌশল নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী বড় ব্যবসায়ীরা এক জোট হয়ে (যাকে সিন্ডিকেট বলা হয়) পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে। এবারও সরকারের তৈরি করে দেওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিল মালিকরা ও চাল ব্যবসায়ীরা একই পন্থায় চালের দাম বাড়াচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ধান মজুদ করে রেখে চাহিদার চেয়ে কম চাল সরবরাহ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়েছে।

মিল মালিকদের কারসাজির পাশাপাশি চালের এই দাম বাড়ার পেছনে সরকারেরও দায় আছে। এর আগেও দাম বৃদ্ধির সময় দেখা গেছে, কোনো কিছু বিবেচনা না করেই সরকার শুল্ক না কমানোর ব্যাপারে গোঁ ধরে বসেছিল। এবারও কোনো সাত-পাঁচ না ভেবেই বাজেটের মাধ্যমে হঠাৎ করেই চাল আমদানির ওপর শুল্ক বসিয়ে দিয়েছে। সামনে নির্বাচন। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ফলে চালের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব নির্বাচনে পড়াটা স্বাভাবিক। আমার মনে হয়, সেই দিকটা সরকারের পক্ষ থেকে চিন্তা করা হয়নি। আবার ওই চালের দামই বেশি বাড়ছে যা দেশের নি¤œ ও মধ্য আয়ের মানুষ খায়। এদের সংখ্যাই দেশে বেশি। ভোটের হাওয়ায় এরাই ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।

আবার বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই দেশে চালের দাম বেড়ে যায়। মিল মালিকরা এই সময়টাতে চালের দাম বৃদ্ধির জন্য অজুহাত দেয় বৃদ্ধির কারণ ধান শুকিয়ে চাল তৈরি করতে সমস্যা হয়। এ কারণে চালের জোগান কমে গিয়ে দাম বৃদ্ধি পায়। ঠিক সেই সময়টাতেই চাল আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হলো। যাদের সুপারিশে চালের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হলো তারা সঠিক সুপারিশ করেনি। যেখানে নির্বাচনের আর ছয় মাসও বাকি নেই সেখানে হঠাৎ করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সঠিক হয়নি। আর যাদের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেই প্রান্তিক চাষিদের হাতে কিন্তু ধান নেই। সব ধান এখন বড় চাষিদের হাতে, যাদের শত শত বিঘা জমি আছে। আর ধান মজুদ আছে মিলারদের কাছে। এই অবস্থায় শুল্ক বৃদ্ধি মানে তাদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তাই সরকারের উচিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অন্যথায় জাতীয় নির্বাচনে চাল একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে, যা ভোটের বাক্সকে প্রভাবিত করতে পারে।

কাওসার রহমান: নগর সম্পাদক, দৈনিক জনকণ্ঠ

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত