‘মা’

অধ্যাপক ডা. এইচ আই লুৎফর রহমান খান
| আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৮, ১৮:২১ | প্রকাশিত : ১৮ জুলাই ২০১৮, ১৮:১৯

সব চেয়ে কম অক্ষর দিয়ে তৈরি যত গুলো শব্দ আছে তার মধ্যে ‘মা’ শব্দটিই সবচেয়ে দামী। আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় পূর্ণ, শ্রুতিমধুর, সুন্দর ও মিষ্টি একটি শব্দ। কোনও কিছুর সঙ্গেই এ শব্দের তুলনা হয় না।

প্রতিটি শিশুই ছোটবেলায় তার মায়ের সাহচার্য পেয়ে বেড়ে ওঠে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক গঠনে মায়ের ভূমিকা তাই সব চেয়ে বেশি। একজন বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্র নায়ক বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে ভালো মা এনে দাও, আমি তোমাদের একটি ভালো জাতি উপহার দিব।’

মায়েরা যখন তাদের সন্তানদেরকে সঠিক পথে চালিত করেন তাদেরকে ভালো মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন, তখনই একটি ভালো জাতি তৈরি হয়। এই সুনাগরিক ও ভালো জাতির সংমিশ্রনেই একটি দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়।

মাকে নিয়ে ছোটবেলার অনেক ঘটনার কথাই মনে পড়ে। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। বয়স বড়জোড় দশ কিংবা এগারো। একদিন পাশের বাড়ির আমার সমবয়সী দুই জন খেলার সাথী এসে বলল- চল, আজকে আমরা মাঠে খেলতে না গিয়ে স্কুলের পাশের জমিদার বাড়ির গাছের নারিকেল চুরি করতে যাব। আমি বললাম, আমি তো গাছে উঠতে পারি না। ওরা বলল, তোকে গাছে উঠতে হবে না। জমিদার বাবুতো চোখে দেখেন না। তার বৃদ্ধা স্ত্রী (যাকে আমরা দিদি মা ডাকতাম) তোকে তো খুব আদর করেন। তুই তার সাথে গল্প করবি, আর আমরা ততক্ষণে পুকুর পাড়ের গাছ থেকে নারিকেল পেড়ে আনব। তুই আমাদের সমান সমান ভাগ পাবি। আমি কোনো কিছু না ভেবেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। কথা মতো আমি দিদিমার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে গল্প শুরু করলাম।

স্কুলের শিক্ষকের ছেলে, তদুপরি ভালো ছাত্র হিসেবেও কিছুটা সুনাম ছিল। যে দুটি কারণ সবার কাছে আমার অতিরিক্ত আদর পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমি না বুঝেই সুযোগের একটি অসদ্ব্যবহার করে বসলাম। এদিকে দিদি মা মুড়ি, গুড়, সন্দেশ ইত্যাদি দিয়ে আমাকে সমাদর করছেন। আর ওদিকে আমার সাথীরা তারই গাছের নারিকেল চুরি করছে। ভয়ে আর অনুশোচনায় আমার মুখ শুকিয়ে আসছিলো, বুকটা ধড়ফড় করছিল আর মনটা ছটফট করছিলো। খাবার আর ভিতরে যাচ্ছিল না, তাই বারবার পানি খাচ্ছিলাম। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঝটপট বেড়িয়ে পড়লাম। কোনো রকম পরিশ্রম না করেও চারটি নারিকেল ভাগে পেয়ে মনের খুশিতে নারিকেল নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম।

তখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। মা জিজ্ঞেস করলেন নারিকেল কোথায় পেয়েছিস? বললাম দিদিমার গাছের। মার দ্বিতীয় প্রশ্ন, দিদি মা দিয়েছে? বললাম, না। তবে কিভাবে আনলি? সংক্ষেপে ঘটনা বলা শুরু করার সাথে সাথে মা প্রচন্ড রেগে গিয়ে আমাকে মারতে আসলেন। আমি দৌড়ে গিয়ে বাড়ীর পাশের পাট ক্ষেতে আশ্রয় নিলাম।

আষাঢ় মাস, চারিদিকে পুকুর, ডোবা, নালা সব কিছুই বৃষ্টির পানিতে ভরে টইটম্বুর। বৃষ্টি ভেজা মাটির স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ আর ঝরে পরা ভিজে পচা পাট পাতার বিশ্রি গন্ধ মিলিত হয়ে এমন দম বন্ধকর এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল যা নীরবে সহ্য করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমি পাটক্ষেতে লুকিয়ে আছি। সন্ধ্যার ডুবু ডুব সুর্য্যের লাল আভা পশ্চিম আকাশে আষাঢ়ের সাদা কালো মেঘগুলোকে রক্তিম সাজে রাঙিয়ে শিল্পির তুলির আঁচড়ে আঁকা রঙিন ক্যানভাসে পরিণত করে এক মনোমুগ্ধকর অভূতপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল। অবাক হয়ে সে দিকে তাকিয়ে থেকে কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছিল তা টেরই পাইনি।

সম্বিত ফিরে পেলাম পাট ক্ষেতের ভিতর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের হুক্কাহুয়া শব্দে। মনে পড়ে গেল পুকুর পাড়ের ঝোপের ভিতর থেকে প্রায়ই তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে একটি বুড়ো শিয়ালকে বেরিয়ে আসতে দেখা যেতো। ভয়ে আমার অন্তরাত্মা বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। ভাবলাম শিয়ালের পাল্লায় পড়ার চেয়ে মায়ের বকুনি খাওয়া ঢের ভালো। এক দৌঁড়ে বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। এমন কাজ আর কোন দিন করব না এমন প্রতিশ্রুতি দিলাম ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। আরও একটি বড় ভয় ছিল আমার বাবাকে নিয়ে। তিনি ছিলেন একজন কড়া শিক্ষক ও বড় ডিক্টেটর। বাবাকে না জানাতে মাকে অনুরোধ করলাম। একটি শর্তে মা রাজি হলেন। পরের দিন গিয়ে দিদিমাকে নারিকেল ফেরত দিতে হবে। যদিও শর্তটি ছিল আমার জন্য ভীষণ কঠিন, লজ্জাজনক, সম্মান হানিকর ও বেদনাদায়ক। তার পরেও ডিক্টেটর বাবার কঠিন শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেতে বিনা বাক্য ব্যয়ে রাজি হয়ে গেলাম। বকুনি ও পিটুনি খাওয়ার চেয়ে আমার বিবেচনায় এ শাস্তির পরিমান ছিল শতগুন বেশি।

শুধু যে কারণে মায়ের উপর আমার অনেক দিন অভিমান ছিল তা হচ্ছে, অন্য মায়েদের চেয়ে সন্তানের প্রতি আমার মায়ের ভিন্ন আচরণ। আমার যুক্তি ছিল, আমি তো হলাম পরোক্ষ চোর। কিন্তু প্রত্যক্ষ চোরের মায়েরা তো নারিকেল পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। ওদের নারিকেল ফেরত দেওয়া তো দূরে থাক কোন বকুনিও তো খেতে হয়নি।

মায়ের ব্যাপারে আমার এ ভুল ভেঙ্গে ছিল অনেক দিন পর। যখন দেখেছি আমার সাথীদের পক্ষে উচ্চ শিক্ষা তো দূরে থাক, স্কুলের গন্ডি পেরোনোও সম্ভব হয়নি। তারও অনেক পরে উপলব্ধি করেছি কেন সম্রাট নেপোলিয়ান একটি ভালো জাতি গঠনে শুধু ভালো ‘মা’ চেয়েছিলেন।

১০ জুলাই ছিলো এমন একজন মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর আগে তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে ৮৮ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মাকে সব সময়ই মনে পড়ে। ওই দিন আরও বেশি মনে পড়েছে। তার অনুপস্থিতি ভীষণ কষ্ট দেয়, স্মৃতিগুলো অনেক পীড়া দেয়। চোখের কান্না তো সবাই দেখতে পায়, মনের কান্না তো আর দেখা যায় না। তাই তার কষ্টটা আরও বেশি। আপনারা সবাই পৃথিবীর সকল মায়ের জন্য দোয়া করবেন এবং আরও দোয়া করবেন যেন এমন মা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে জন্ম নেয় যে মায়ের সন্তানেরা সুনাগরিক হয়ে একটি ভালো জাতি ও একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, সুন্দর ও শান্তির দেশ আমাদের উপহার দেয়।

‘যতো দিন ভবে এ দেহে রবে জীবিত আমার প্রাণ, ততো দিন মনে মায়ের স্মৃতি মোর, রবে চির অম্লান।

লেখক:  সাবেক বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফেসবুক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত