প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফাঁদে অস্থির ছাত্র সমাজ

অনুপম মাহমুদ
 | প্রকাশিত : ১৮ জুলাই ২০১৮, ২০:২৭

- এখন ক্লাস ফাইভে পড়, একটু ভালো করে পড়লেই তুমি ভালো একটা স্কুলে পড়তে পারবে।

- সামনেই এসএসসি, জিপিএ ফাইভ না পেলে কোন ভালো কলেজে ভর্তি হতেই পারবে না!

- এইচএসসিটা ভালো করে দাও, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে তোমাকে আর কিচ্ছু বলব না, তুমি তখন এমনিতেই ট্র্যাকে উঠে যাবে।

মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা মায়েদের এই কথাগুলো শুনেই আমরা বড় হয়েছি। পড়ালেখা শেষ হলে চাকরি খোঁজেন এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। উদ্যোক্তা হতে চাইছেন খুব কম। যদিও এই উদ্যোক্তা হওয়ার মতো পরিবেশের যথেষ্ট ঘাটতি এখনো বিদ্যমান। প্রথামাফিক মানসিকতা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি বলেই ‘সোনার হরিণের’ খোঁজে পথে নামে সবাই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী দেশে এই মুহূর্তে (২০১৬-১৭ হিসেব অনুযায়ী) ১৫ বছরের বেশি বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ আর কর্মহীন আছেন ২৬ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। গত বছরের তুলনায় তা ৮০ হাজার বেশি, অর্থাৎ প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছেন প্রায় এক লাখ বেকার। উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা বেশি। মোট বেকারের ১১.২% উচ্চশিক্ষিত, সংখ্যায় তিন লাখের উপর।

৩৬ তম বিসিএস এর বিজ্ঞপ্তি ইস্যু হয়েছিলো ২০১৫ সালের ৩১ মে। আবেদন জমা পড়েছিল দুই লাখের উপর। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা শেষে দুই হাজার ৩২৩ জনের পক্ষে সুপারিশ দেয়া হয় ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর। এখন ২০১৮ সালের জুলাই মাস চলছে। অর্থাৎ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। যারা নির্বাচিত হয়েছেন এবং কোনো কাজে আছেন তারা কি কোনো লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারবেন? আর দুই লাখ থেকে দুই ৩২৩ জন নিয়োগের অনুপাত এটাই বলে এই দেশে আমরা কতটা চাকরির সংকটে আছি।

বিগত বছরগুলোতে যে হারে বেতন ও সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে, এতে সরকারি চাকরির প্রতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়ে এবং অভিভাবকদের আগ্রহ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং যৌক্তিক। সেই তুলনায় বেসরকারি পর্যায়ে চকুরির নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা কম।

জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে (জানুয়ারি, ২০১৮) জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানান, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শূন্য পদের সংখ্যা তিন লাখ ৫৯ হাজার ২৬১টি। মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন দপ্তরসমূহে মধ্যে প্রথম শ্রেণির শূন্য পদ ৪৮ হাজার ২৪৬টি। দ্বিতীয় শ্রেণির শূন্য পদ ৫৪ হাজার ২৯৪টি। তৃতীয় শ্রেণির শূন্য পদ ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৩৭টি এবং চতুর্থ শ্রেণির শূন্য পদ সংখ্যা ৭৩ হাজার ৯৮৪টি।

নিয়োগ বন্ধ আছে অনেক প্রতিষ্ঠানে। মামলা এবং নানামুখী ভুল সিদ্ধান্ত এর জন্য দায়ী। বেকারদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন উন্নত জীবনের আশায়।

মূলত চার ধরনের জনশক্তি আমরা দেশের বাইরে রপ্তানি করি। ১. পেশাজীবী, ২. দক্ষ শ্রমিক, ৩. মাঝারি দক্ষ শ্রমিক ও ৪. অদক্ষ শ্রমিক। দুঃখের বিষয় হচ্ছে মাত্র চার শতাংশ পেশাজীবী আমরা পাঠাতে পারছি। ৩৩ শতাংশ দক্ষ, ১৫ শতাংশ মাঝারি মানের দক্ষ ও প্রায় অর্ধেক জনশক্তি ৪৮ শতাংশ অদক্ষ শ্রমিক দেশের বাইরে যাচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতিযোগিতার বিশ্বে টিকে থাকার জন্য দক্ষতা ভীষণ প্রয়োজন। এই ৪৮ শতাংশ যদি পেশাজীবী হতো তাহলে এই দেশের প্রতিবিম্ব একেবারেই ভিন্ন হতে পারতো।

বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্সে আমাদের অর্থনীতি এখনও শক্ত অবস্থানেই আছে। কিন্তু এই সুযোগে দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণেরা দেশ ত্যাগ করছেন, যা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অদক্ষতা এবং দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে অনেক তরুণের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এক একজন তরুণের জন্য পথে বসেছে এক একটি পরিবার। অনেক পরিবার ঋণ নিয়ে কিংবা সহায় সম্পদ বিক্রি করে তাদের সন্তানদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন উন্নত জীবনের আশায়।

হাঁস-মুরগি পালন, কুটির শিল্প, মৎস্য চাষ, নার্সারি, ধাত্রীবিদ্যা, কাঠমিস্ত্রির কাজ, সেলাই, ছাপাখানা, দর্জির কাজ, কাজ, বিদ্যুতের কাজ, বই বাঁধাই, ওয়েলডিং-এর কাজ, টেলিভিশন- বেতার- মোটর মেরামতের কাজ ইত্যাদি নানা রকমের কর্মমুখী শিক্ষা যদি আমরা সানন্দে গ্রহন করতাম, তবে আমি বিশ্বাস করি এই দেশে বেকারত্ব থাকতো না।

শ্রম ও পেশা নির্বাচন নিয়ে আমাদের খুঁতখুঁতে ভাবনার পেছনে আছে পাছে লোকে কিছু বলে ও সামাজিক মর্যাদা। কাজ কে ছোট করে দেখছি আমরা।

বর্তমানে ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮৫ টি। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে দুইটি। বিশেষায়িত ইঞ্জিনিয়ারিং / টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আছে ১০ টি যেখান থেকে বিএসসি সনদ দেয়া হয়।

এই মুহূর্তে দেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ আছে ৩০ টি, আর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ আছে ৬৫ টি। গণহারে কলেজ সরকারি করা হয়েছে, অথচ শিক্ষকদের মান নিয়ে ভাবছি না।

আমরা পলিটেকনিকে পড়তে চাইছি না, ভোকেশনাল ট্রেড এড়িয়ে যাচ্ছি। আবার যারা পড়ছি তারা নাম সর্বস্ব বসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি সনদ নিয়ে চাকরির জন্য আবেদন করছি। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে আর তার পর যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি তখনই হতাশায় ডুবে যাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু বিষয়ভিত্তিক বিভাগ আছে, যা পড়ে আমরা অর্জন করি স্নাতক এর সনদ, যার বাস্তব বা প্রায়োগিক কোন ক্ষেত্র এই মুহূর্তে বাংলাদেশে নেই। তাহলে কেন পড়ানো হচ্ছে এই সব বিষয়?

আমরা গ্রাজ্যুয়েশন করে ঠিক করিকি চাকরি করব বা খুঁজব। কেউ কেউ মাস্টার্স করে তার পর খোঁজ খবর নেন, কোন কোন চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন। অথচ এই সিদ্ধান্ত নিতে হয় আরও আগে। একটা বাস্তব উদাহরণ দেই।

রাব্বি এই মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত সাতটি কলেজের একটিতে বাণিজ্য অনুষদে স্নাতক পড়ছে শেষ সেমিস্টারে। ক্লাস খুব করা হয় না, তবে পরীক্ষা দেয়। কারণ, সে একটা চাকরি করছে। গার্মেন্টস সেক্টরের মেশিনারিজের কাজ হাতে কলমে শিখেছে নানা ও মামাদের কাছে। রাব্বির নানা একজন স্বশিক্ষিত মেকানিক এবং সুনামের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত কাজ করছেন। এখনো তার নামে তার ছেলেরা এবং নাতি পুতিরা কাজ করছেন।

রাব্বির দুঃখ হলো, সে কাজ ভালো পারে কিন্তু নামীদামী প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারছে না সার্টিফিকেট এর অভাবে। এসএসসি, এইচএইসসি দুটোতেই বাণিজ্য বিষয়ের সার্টিফিকেট এখন বেকার। পলিটেকনিক কিংবা প্রকৌশল নিয়ে পড়তে পারেনি সে! কারণ শুরুটাই হয়েছে বাণিজ্য দিয়ে।

আমাদের অনেক পরিবারেই এমন চিত্র বিদ্যমান। সঠিক পরামর্শ এবং দিক নির্দেশনার অভাবে আমাদের অগুণতি তরুণ আজ বিভ্রান্ত এবং হতাশায় নিমজ্জিত। প্রতি বছর ২০ লক্ষাধিক মানুষ শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে হচ্ছে না। এই ব্যবধান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পড়ালেখা শেষ করে একটি তরুণ যখন প্রতিবন্ধকতা কংবা নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন তাদের অধিকাংশই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। এর মূল কারণ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির করুণ ব্যবধান।

সমস্যার মূল কারণ, চিহ্নিত করে সমাধান করলে ছাত্ররা ক্লাস রুমেই থাকবে, রাজপথে নয়। তারুণ্যের শক্তিক্ষয় জাতির জন্য লজ্জা এবং মেধার অপচয়।

লেখক: উন্নয়ন ও অধিকার কর্মী

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত