‘পেশিশক্তি ব্যবহার সরকারের পতনের কারণ হবে’

ঢাবি প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৮, ১৯:২১ | প্রকাশিত : ১৯ জুলাই ২০১৮, ১৭:৪৪

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে জড়িতদের ওপর হামলা এবং শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সমাবেশ থেকে সরকার পতনের সতর্কতা দেয়া হয়েছে।

একজন শিক্ষক বলছেন, পেশিশক্তির ব্যবহার সরকার পতনের কারণ হতে পারে। অন্য একজন শিক্ষক বলেছেন, ছাত্রলীগ শব্দটি তার কাছে গালি।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক’দের ব্যানারে সংহতি সমাবেশ হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭২ জন শিক্ষক অংশ নেন।

সমাবেশে শিক্ষকরা হামলাকারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিচারের পাশাপাশি কোটা আন্দোলনের গ্রেপ্তার নেতাদের মুক্তি দাবি করেন।

‘মনে হয় তার বাপের দেশ’- গত ২৭ জুলাই কোটা আন্দোলনের নেতা রাশেদ খান এমন বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে দিয়েছেন, এমন অভিযোগ উঠার পর ৩০ জুন কোটা আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। ২ জুলাই এই হামলার প্রতিবাদে কর্মসূচিতেও হামলা হয়।

ছাত্রলীগের এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষকও প্রতিবাদী কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। গত ১৫ জুলাই ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দের’ কর্মসূচিতে হামলার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকদের কর্মসূচি ঘিরে রাখে ছাত্রলীগ। সেখানে এক শিক্ষকের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় ছাত্রলীগ নেতাদের। এসব ঘটনায় আজকের এই কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামাল বলেন, ‘সরকার জনগণের আন্দোলনকে পেশিশক্তি দিয়ে চাপিয়ে রাখার যতই চেষ্টা করুক না কেন, একদিন না একদিন তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে এবং সরকারের পতনের কারণ হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানীরও সমালোচনা করেন এই অধ্যাপক। বলেন, ‘আপনাকে ভুলে যেতে হবে যে আপনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। কারণ, আপনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং অনেকদিন ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাসরিন ওয়াদুদ বলেন, ‘এখন ছাত্রলীগ আমার কাছে একটা গালির নাম।’

উপাচার্য আখতারুজ্জামানের এই পদে থাকার কোনো যোগ্যতাই নেই বলেও মনে করেন নাসরিন। বলেন, ‘যদি তার লজ্জা থাকে তাহলে তিনি এখনি পদত্যাগ করবেন।’

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে দ্বৈত প্রশাসন দেখতে পাচ্ছি। প্রথমটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং অন্যটি হলো যারা আধিপত্য বিস্তার করে গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদের নানা রকমের নির্যাতন করছে, তাদের প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি হলের কর্তৃত্ব হল প্রশাসনকে দিতে ব্যর্থ হন, যদি তিনি ক্ষমতাসীনদের চাপে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে আপনাকে বলব যে, আপনি নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগ করুন।’

একই বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘রাশেদ ও ফারুকদের (কোটা আন্দোলনের গ্রেপ্তার নেতা রাশেদ খাঁন ও ফারুক হাসান) নেতৃত্বে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব।’

‘যদিও বা বয়সের অনুপাতে তারা আমাদের চেয়ে অনেক ছোট তারপরও তারা আমাদের আগামী দিনের পথিকৃৎ ও চলার প্রেরণা।’

কোটা আন্দোলনকে যুক্তিসঙ্গত উল্লেখ করে আবরার বলেন, ‘এটাকে যুক্তি দিয়ে না পেরে অবশেষে রাজনীতি ও পেশীশক্তি দিয়ে খণ্ডানোর চেষ্টা হচ্ছে।’

‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা চিহ্নিত। তাদেরকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একইসাথে ছাত্রলীগের এসব কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এবং তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিপদে ফেলতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বাসায় হামলা করা হয়েছে।’

‘প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ভিসির বাসায় যারা হামলা করেছে, তাদের ধরা হচ্ছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কেউ ছাত্র নয়। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ের সত্যতা দেখিয়ে বলা হয়েছে যে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। তাহলে হঠাৎ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা ভিসির বাসায় হামলা করেছে, এ তথ্য সরকার কীভাবে পেল?’

আনু মুহম্মদের দাবি, এই আক্রমণটা ছিল পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিপদে ফেলতেই এ হামলা করা হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তের নামে প্রতারণা করছে।

দেশে কোনো ‘ন্যায্য’ আন্দোলন করলেই একে ‘জামায়াত-শিবিরের’ আন্দোলন আখ্যা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকেই শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই আন্দোলনে শিক্ষকরাও কেন যুক্ত হয়েছে। আপনাকে বলতে চাই আপনি যদি এক ঘণ্টার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতেন, তাহলে দেখতে পারতেন যে, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের মাত্রা কতটুকু এবং এ আন্দোলন কীভাবে গভীর ক্ষোভ থেকে তৈরি হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খানের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাসরীন ওয়াদুদ, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাসিবুর রশিদ প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে মিছিল করেন।

ঢাকাটাইমস/১৯জুলাই/এনএইচএস/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত