ভোটের বছরে জোটের হিড়িক

এম গোলাম মোস্তফা, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৮, ১৫:৫৪ | প্রকাশিত : ২০ জুলাই ২০১৮, ০৮:২৮

দেশের মূলধারার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনোটিই এককভাব ভোটে অংশ নিতে চাইছে না। আগে থেকেই জোটবদ্ধ দলগুলো আবার বর্তমান শক্তিতে ভোটের লড়াইয়ে নামার বদলে শক্তি বাড়াতে চাইছে।

নতুন দলের সঙ্গে জোট বা সমঝোতার কথা ভাবছে ক্ষমতাসীন ১৪ দল আর তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট।

সংসদে প্রধান বিরোধী দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও আলাদা জোট আছে। তার জোটের আকার দলের সংখ্যার বিবেচনায় ঢাউস। সব মিলিয়ে ৫৮টি। অন্তত জোটের পক্ষ থেকে তাই বলা হয়েছে।

সব শেষ জোট গঠন করেছে আবার আটটি বাম দল। এখানে আবার রুশপন্থী এবং চীনপন্থী বলে পরিচিত দলের অংশগ্রহণও আছে।

আওয়ামী লীগও জোট বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলেছে সাবেক বিএনপি নেতা নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল বিএনপির সঙ্গে। নাজমুল হুদাও একা আসেননি, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আরও নয়টি দলকে। বুধবার এই আলোচনা হয়েছে বটে, কিন্তু এর ফল পেতে শেখ হাসিনার সম্মতির অপেক্ষায় দুই পক্ষই।

বিএনপি আবার তার ঢাউস জোটের বাইরে আগ্রহী জাতীয় ঐক্যে। বিএনপি থেকে বের হয়ে গঠন করা বিকল্প ধারা, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যসহ নানা দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রবীণ আইনজীবী কামাল হোসেনও আবার আগাচ্ছেন ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’ নিয়ে।

এর মধ্যে আবার তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা দিয়ে গত ডিসেম্বরে গঠন করা জোট যুক্তফ্রন্ট আবার আলোচনা হারিয়েছে। তারা এখন বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে।

এদের বাইরে আবার কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক রাজনৈতিক ছোট ছোট এবং প্যাডসর্বস্ব দলের উদ্যোগেও নতুন জোট গঠনের চেষ্টার খবর এসেছে গণমাধ্যমে।

সংসদীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশেও নির্বাচনকেন্দ্রীক জোট গঠন নতুন কিছু নয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জোটের লড়াইও বলা যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আটদলীয় জোটকে বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল হারিয়ে দেয়।

তবে এরপর ১৯৯৬ সালে এসে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভোটে দাঁড়ায় আপন শক্তি নিয়ে। আসলে তখনই কোন দলের কতটা শক্তি, সেটা বুঝা গিয়েছিল।

এর পর ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ এককভাবে লড়াই করলেও বিএনপি বাজিমাত করে জোটের শক্তি দিয়ে। সে সময় এরশাদ তার চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে সঙ্গে নিয়ে জোট করলেও কার্যকর কিছুই করতে পারেননি।

এরপর ২০০৬ সালের আগে জোট গঠন করে আওয়ামী লীগও। আর ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জোটের শক্তিতে বিএনপির চারদলীয় জোটকে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরে।

এরপর আওয়ামী লীগের মোকাবেলায় বিএনপি জোটের আকার বাড়াতে বাড়াতে ২০টি দল করে। এই জোটে এখন আবার একেকটি দলের ভগ্নাংশ মিলিয়ে দলের সংখ্যা ২০টির বেশি।

তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন জোট গঠন বা জোটের আবার বৃদ্ধির চেষ্টা কতটা ‍সুফল বয়ে আনবে বড় দলের জন্য বা আদৌ সুফল আনবে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কারণ, নতুন যেসব জোট গঠন হচ্ছে বা বড় দলগুলোর সঙ্গে যারা জোটে অংশ নিতে আলোচনা করছে তাদের না আছে সাংগঠনিক শক্তি, না আছে জনপ্রিয়তা। এক দলের এক নেতা বা এক দলের দুই নেতা-এভাবেই পরিচিতি দেয়া যায় কাউকে কাউকে।

নতুন জোট গঠন করা সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের কাছেই প্রশ্ন ছিল কী লাভ এভাবে জোট গঠন করে।

জবাব আসে, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই জোট গঠনে মৌলিক কোন পরবর্তন আনবে না। আমাদের আন্দোলন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এই দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রয়োজনে নীতি আদর্শকে উপেক্ষা করে শক্তির সমাবেশ ঘটাতে চায়। তারা নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে রাজনীতি করতে চায়। আমরা এসব নীতিহীন রাজনীতির সংস্কৃতি থেকে জাতি বের করে আনতে চাই। এই দুই দলের হাত থেকে জাতিকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে তা সম্ভব।’

‘আমাদের এটা নির্বাচনী এবং আন্দোলন সংগ্রাম জোট। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির ধারণা বাস্তবায়ন করতে চাই। সংগ্রামের প্রয়োজনে আমরা অনেক কিছু করব। প্রয়োজনে আমরা ইলেকশন করব, আবার সংগ্রামের প্রয়োজনে ইলেকশন বয়কট করব।’

তবে সেলিম জোট করে কতটা করতে পারবেন, সেটা তর্কসাপেক্ষ। বামদের শক্তি ক্ষয় হতে হতে, তারা ভাঙতে ভাঙতে এবং নেতারা সব বড় দলে চলে যাওয়ার পর দেশের কোথাও এই দলগুলোর অবস্থান আছে এমনটি নয়। ১৫ মে খুলনা এবং ২৬ জুন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সিপিবি-বাসদের প্রার্থী যে ভোট পেয়েছেন, সেটি একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এ বিষয়টি নতুন কিছু নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বছর আগে থেকে এই জোট গঠনের সংস্কৃতি ছিল। ’৭১ সালের আগেও এ দেশে নির্বাচন জোট গঠন হয়েছিল সেটা যুক্তফ্রন্ট।’

‘এই নির্বাচনী বছরে জোট গঠনের বিষয়টি বড় করে না দেখে বরং সামনের নির্বাচনে যে ইস্যুগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিত। সামনের আন্দোলনে কী প্রভাব পড়বে তা বলা সম্ভব না, বিশ দলের যে জোট সেখান থেকে ৯ দল ভেঙে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছে বলে খবর আছে।’

‘এই দলগুলো কী প্রভাব ফেলতে পারবে তা বলা যাবে না। বামরাও আবার এক জায়গায় জোট গঠন করেছে। তারা ১% ভোট নিয়ে কী আন্দোলন গড়ে তুলবে সেটাও বলা কঠিন।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দিন আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জোটগুলো যদি গঠিত হয়, তাহলে নির্বাচন স্বচ্ছ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে করে ক্ষমতাশীন দলের মাতব্বরি একটু কম থাকবে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিজানুর রহমান শেলী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘জোটের রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়, নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক দলের মধ্যে জোট অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। প্রধান দলগুলো মনে করে তাদের শক্তির সাথে আরও শক্তি বাড়িয়ে জোট গঠন করে। জোটের এই দলগুলোর ভোটে তেমন প্রভাব না থাকলেও, সংখ্যার দিক দিয়ে বাড়ছে।’

‘বড় প্রধান শক্তির ওপর ভর করে চলে এই ছোট দলগুলো। এগুলোকে সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। কীভাবে নির্বাচনী বৈতরনী পার হবে সেটাই এখন মূল বিষয়।’

ঢাকাটাইমস/২০জুলাই/জিএম/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত