শেরপুরে কাকলি সিনেমা হল ভেঙে গড়া হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন

শেরপুর প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২২ জুলাই ২০১৮, ২২:৪৬

দীর্ঘদিন যাবত লোকসানের ফলে শেরপুরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ কাকলি সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হচ্ছে। শহরের কেন্দ্রস্থল মুন্সীবাজার এলাকায় প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো সিনেমা হলটি ভেঙে সেখানে সাত তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছে মালিকপক্ষ।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, যেখানে এক যুগ আগেও সিনেমা হলের জন্য আলোচিত ছিল শেরপুর। ছোট এ শহরে সে সময় ছয়টি সিনেমা হল থাকায় সবাইকে হতবাক করত। ঢাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অথবা ঢাকার চেয়ে একদিন আগে শেরপুরের সিনেমা হলগুলোয় নতুন ছবি মুক্তি পেত। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসত সিনেমা দেখতে। টিকিট পাওয়া থেকে শুরু করে আসনে বসা পর্যন্ত অনেকটা যুদ্ধ করতে হতো দর্শনার্থীদের। টিকিট কাটা নিয়ে হামলা-সংঘর্ষ ছিল সিনেমা হলগুলোর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দর্শকদের উপস্থিতিতে লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় বিত্তবানদের অন্যতম ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছিল সিনেমা হল। অথচ ডিজিটাল জীবনযাত্রা হওয়ায় কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র এ সিনেমা হলগুলো।

তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ও শীলা গার্মেন্টসের স্বত্ত্বাধিকারী রাসেল তার বন্ধু আশফাক ও অণিক বলেন, একদিকে ঘরে বসে ভিনদেশি কিরণমালা, বধূবরণ, সত্যের ভক্ত, বোঝে না সে বোঝে না দখল করে নিয়েছে টিভির রিমোট, আর অন্যদিকে প্রতিনিয়ত সিনেমা শিল্পীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও ক্রমেই কমে যাচ্ছে একসময়ের জনপ্রিয় প্রদর্শন কেন্দ্র সিনেমা হলগুলো। স্যাটেলাইট-ইন্টারনেটের মতো উন্নত প্রযুক্তির জাদুর ছোঁয়ায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলের প্রয়োজনীয়তা। হারিয়ে যাচ্ছে জনপ্রিয়তা, দেখা মিলছে না দর্শনার্থীদের। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ও সিনেমার মান নিম্নমুখী হওয়া তথা নিম্নমানের গল্প, কপি-পেস্ট কাহিনী ধীরে ধীরে দর্শকদেরকে করছে হলবিমুখ। ব্যবসা না হওয়ায় তাই বাধ্য হয়েই বর্তমানে শহরের খোয়ারপাড়ের লিখন সিনেমা হল, বটতলার ঐতিহ্যবাহী মেঘনা সিনেমা হল, পদ্মা সিনেমা হল নামে তিনটি হল ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন হল মালিকরা। যদিও রূপকথা ও সত্যবতী নামে দুইটি হল চালু রয়েছে শুধু বনেদি ব্যবসার ধারাবাহিকতা নামক নিয়মের জন্যই।

চালু থাকা সব সিনেমা হলের স্থাপনাতেই গড়ে উঠেছে নানাবিধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

কাকলি সিনেমা হলের মালিক গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন বলেন, এক সময় শেরপুর শহরে ছয়টি সিনেমা হল ছিল। ঢাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ছবি মুক্তি দেয়ার প্রতিযোগিতা ছিল হলগুলোর মধ্যে, ব্যবসাও ছিল জমজমাট। কিন্তু বাংলাদেশে সিনেমার মান পড়ে যাওয়ায় এবং ঘরে বসে বিনোদনের অনেক সুযোগ সুবিধা আসায় দর্শক এখন আর হলে আসে না।

তিনি জানান, ১৯৬৯ সালে পরশমণি সিনেমা দিয়ে কাকলি প্রেক্ষাগৃহের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর চলতি বছরের জুন মাসে এ সিনেমা হলের শেষ প্রদশর্নীর সময় চলছিল পোড়ামন-২। এই সিনেমা হলে নায়করাজ রাজ্জাক ও নায়িকা ববিতাসহ অনেক বড় বড় অভিনেতা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে গেছেন। ১৯৭০ সালে এই হলে ছাত্রলীগের সভায় বক্তব্য রেখেছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী।

ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী এই হলটি ভেঙে ফেলার কারণ জানতে চাইলে লিটন বলেন, সিনেমা ব্যবসায় এখন লাভ তো দূরের কথা, আমরা আমাদের খরচও তুলতে পারি না। কাকলি সিনেমা হলের জায়গায় সাত তলা যে বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে, তার পঞ্চম তলায় ছোট একটি সিনেপ্লেক্স রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তার। আর নতুন ভবনের চতুর্থ তলা পর্যন্ত থাকবে মার্কেট। ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় হবে  গেস্ট হাউজ।

সরেজমিন দেখা গেছে, এখনো যে দুটো সিনেমা হল টিকে আছে প্রায় সবগুলো হল নোংরা পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। এসব হলের আসবাবপত্র এখনো মান্ধাতা আমলেরই রয়ে গেছে। হলের অধিকাংশ সিট ভাঙা ও ছারপোকার বাসায় পরিণত হয়েছে। হলের টয়লেটগুলো অত্যন্ত অপরিষ্কার ও নোংরা। হলে দর্শকদের তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। সিনেমা হলগুলোর নোংরা পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে দর্শকদের প্রচুর অভিযোগ থাকলেও এদিকে হল কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি নেই বললেই চলে। কেননা এসব সিনেমা হলের দর্শকদের বেশিরভাগই গ্রাম ও শহরের নিম্নআয়ের মানুষ।

লিখন সিনেমা হলের সাবেক কর্মকর্তা আফজাল হোসেন বলেন, নানাবিধ কারণে জেলার অন্য উপজেলার সিনেমা হলগুলোর চিত্র একই ধরনের। নালিতাবাড়ী উপজেলায় অন্তরা, মা ও রূপালী নামে তিনটি সিনেমা হল ছিল। বর্তমানে চালু রয়েছে অন্তরা নামে সিনেমা হলটি। ঝিনাইগাতী উপজেলায় দুটি সিনেমা হলের মধ্যে ঝংকার চালু থাকলেও বন্ধ হয়ে গেছে অবকাশ সিনেমা হলটি। নকলা উপজেলায় চালু রয়েছে ঝুমুর আর বন্ধ হয়ে গেছে কল্পনা সিনেমা হলটি। শ্রীবরদী উপজেলায় বর্তমানে কোন সিনেমা হল চালু নেই। পালকি নামে যে সিনেমা হলটি চালু ছিল তা অব্যাহত লোকসানের ফলে মালিকপক্ষ তা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করেছেন।

সাংস্কৃতিক কর্মী আশিক ও রবিউল ইসলাম বলেন, হলগুলো যেন এখন উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের বিনোদনের কেন্দ্রস্থল হয়ে  গেছে। এখানে পারিবারিক আবহে সিনেমা দেখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে এখন আর বেদের মেয়ে জোসনা, সাত ভাই চম্পা বা ওরা নয়জন এমন গল্পের কাহিনী নির্ভর সিনেমা নেই। তাই দর্শক হলবিমুখ।

রূপকথা সিনেমা হল মালিক শুভ্র সাহা বলেন, কিছু করার নেই। বাপ-দাদারা এ ব্যবসা করেছিলেন বলেই এখনো করছি। বনেদি ব্যবসা তাই আজও  টিকিয়ে রাখছি, জানি না কত দিন টিকিয়ে রাখতে পারব।

এ সস্পর্কে জানতে চাইলে জেলা তথ্য কর্মকর্তা তাহালিমা জান্নাত লিমা বলেন, প্রথমত ভালো গল্প না থাকায় দর্শককে সিনেমা হলমুখী করা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, একজন মানুষ ঘরে বসে যে ধরনের পারিবারিক আবহে সিনেমা দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সেই ধরনের পরিবেশ এখন আর হলগুলোয় নেই। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যেন হলে যেতে পারে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, তবেই দর্শক হলে যাবে।

শিগগিরই সিনেমা হলের এ দুর্দশা না কাটলে ও দর্শনার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি না হলে অনতিবিলম্বে যে হলগুলো চালু আছে তাও বন্ধ হয়ে যাবে অদূর ভবিষ্যতে। তাই দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকার এ বিষয়টিকে অধিক গুরুত্বসহ বিবেচনা করবে- এমনটাই প্রত্যাশা এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সাধারণ জনগণের।

(ঢাকাটাইমস/২২জুলাই/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত