রাজশাহী-৪: আ.লীগে মনোনয়ন যুদ্ধ, নিষ্ক্রিয় বিএনপি

ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
 | প্রকাশিত : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০৮:০৭

একসময়ে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে বহুল আলোচিত বাগমারা সেই দুর্নাম ঘুচিয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। বিশাল আয়তনের এই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪ আসনে প্রধান দুই দলেরই একাধিক মনোনয়ন-প্রত্যাশী। তবে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে তুমুল মনোনয়ন-যুদ্ধ চললেও প্রায় নিষ্ক্রিয় বিএনপির নেতারা।

আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের যে মনোনয়ন-যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে, সেটি আসলে মনোনয়ন-দ্বন্দ্ব। বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের সঙ্গে তুমুল দ্বন্দ্ব অন্য দুই মনোনয়ন-প্রত্যাশীর, যারা বর্তমানে দলের কোনো পদে নেই।

রাজশাহীর সবচেয়ে বড় উপজেলা ৩৬৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বাগমারায় ইউনিয়ন রয়েছে ১৬টি। এই আসনে ১৯৭০, ’৭৩ ও ’৮৬ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে এবং ’৮৮ ও ’৯১ সালে জাতীয় পার্টির টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন প্রয়াত সরদার আমজাদ হোসেন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির টিকেটে এমপি হন সাবেক সচিব আবু হেনা। বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতার বক্তব্য দিয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সেখানে মনোনয়ন পান জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল গফুর। এ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এমপি নির্বাচিত হন দেশের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হন।

এনামুলের সমর্থকদের দাবি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বর্তমান এমপি এনামুল হকের বিকল্প নেই। মাঠপর্যায়ে রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এলাকার হাজার হাজার গরিব অসহায় মানুষকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে বাগমারার মানুষের কাছে বড় একটি জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ফলে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের কাছে এমপি এনামুল এখন অনেক জনপ্রিয় নেতা বলেই পরিচিত।

এ আসনে এবার এনামুল হক ছাড়া আরও দুজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি দলীয় পদ থেকে বরখাস্ত হওয়ায় তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাদের একজন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম সান্টু ও তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদ। সান্টু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আজাদ তাহেরপুর পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

মনোনয়নে এনামুল হকের এগিয়ে থাকার বিষয়ে বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মতিউর রহমান টুকু বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ আসনে যারা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তাদের সবার চেয়ে জনপ্রিয় এনামুল হক। এমপি এনামুলের নেতৃত্বে সাংগঠনিক দিক থেকে বাগমারা আওয়ামী লীগ এখন মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এনামুল হক প্রতি বছর সালেহা ইমরাত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা, ঈদ-পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাজার হাজার গরিব-অসহায় মানুষকে সহায়তা দেয়া, এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ও ভালো ফলাফল করা কলেজগুলোর শিক্ষকদের সংবর্ধনা দেয়া ছাড়াও নানাভাবে সাধারণ মানুষের পাশে থাকেন বলে জানান টুকু। এ আসনে জয়ের ধারা ধরে রাখতে এনামুল  হকের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।

ক্ষমতাসীন দলের অপর দুই মনোনয়ন-প্রত্যাশী সান্টু ও আজাদ বাগমারায় এমপি এনামুলবিরোধী একটি বলয় তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন জানিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, কিন্তু সেটি থেমে গেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ওই দুজনসহ ৯ জন দলীয় পদ হারান। এতে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। কিছুদিন আগেও তৃণমূলের যেসব নেতাকর্মী সান্টু-আজাদের পক্ষে ছিলেন তারা এখন এমপি এনামুলের পক্ষে কাজ করছেন।

তবে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দুর্বল হওয়ার তথ্য নাকচ করে মেয়র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ভোটারদের পাশে আছি। রাজনীতিতে আমার ত্যাগ ও অবদান বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেবেন বলে আমি আশাবাদী।’

আজাদ বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করায় জেএমবির বাংলা ভাই এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের লোকজন বারবার আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’

উপজেলা চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম সান্টু দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হিসেবেই আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চান বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। তবে দলের প্রয়োজনে নৌকা প্রতীক যাকেই দেওয়া হোক না কেন, তার হয়েই আমরা কাজ করব।’
দলে নেতাদের মনোনয়ন-যুদ্ধকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন এমপি এনামুল হক। বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মতো বড় দলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বা যেকোনো নির্বাচনে একাধিক নেতা প্রার্থী হতে চাইবেন- এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি যেন না হয় সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।’

এনামুল বলেন, ‘দল যাকে নৌকা প্রতীক দেবে সবাইকে তার পক্ষেই থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলে এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ এখন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকলেও ভোটের আগে সবাই একত্র হয়ে কাজ করবেন বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপি

আওয়ামী লীগে নির্বাচনী মনোনয়ন নিয়ে যখন লড়াই চলছে, তখন বাগমারায় বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা নেই বললেই চলে। কেউ কেউ অবশ্য দলের মনোনয়নের আশায় নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায়ে মাঠে রয়েছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছেন তারা। তাদের মধ্যে কে মনোনয়ন পেতে পারেন এ নিয়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

এ আসনে সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল গফুর এবং সাবেক এমপি আবু হেনা ছাড়াও মনোনয়ন চাইতে পারেন জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু, জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ডা. জাহিদ দেওয়ান শামীম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মকলেছুর রহমান মন্ডল, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক প্রামাণিক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডি এম জিয়াউর রহমান জিয়া এবং ড্যাব নেতা ডা. আশফাকুর রহমান শেলি।

তাদের মধ্যে সাবেক এমপি আবু হেনা বিএনপি থেকে বহিষ্কারের পর এলাকায় তেমন আসেন না। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও নেই। তিনি ঢাকায় থাকেন। জেলা সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু রাজশাহী নগরীর বাসিন্দা। তিনিও বাগমারায় সেভাবে যান না। আর আমেরিকা প্রবাসী ডা. জাহিদ দেওয়ান শামীমেরও এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ কম। তবে এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন আবদুল গফুর, ডিএম জিয়া ও ডা. আশফাকুর রহমান শেলী।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডি এম জিয়া বলেন, ‘বাগমারা বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নতুন মুখ চায়। তাদের চাওয়া থেকে এবার সংসদীয় আসনে মনোনয়ন চাইব। জনপ্রিয়তা বিবেচনায় দল মনোনয়ন দিলে এবার আমি মনোনয়ন পাব। তা হলে এ আসনটি আবার বিএনপির কাছে ফিরে আসবে বলে আশা করছি।’

বাগমারায় বহিরাগতরা এসে সুবিধা করতে পারবেন না বলে মনে করেন আব্দুল গফুর। নিজের জন্ম, বাড়ি সবই বাগমারায় উল্লেøখ করে তিনি বলেন, ‘আশা করি আমি মনোনয়ন পাব। এখানে বহিরাগতরা এসে সুবিধা করতে পারবে না। আর আবু হেনা দলের বহিষ্কৃত নেতা। এরই মধ্যে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে দৌড়াচ্ছিলেন।’

বিএনপির আরেক মনোনয়ন-প্রত্যাশী অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। আমি সাধারণ মানুষের সঙ্গেও ওঠাবসা করি। কাজেই দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচনে জয়ী হব। সে লক্ষ্যে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।’

বাগমারায় দলের অবস্থান ভালো বলে জানান জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু। ভোট হলে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। তপু বলেন, এখানে দলের বাইরে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সুযোগ নেই।

(ঢাকাটাইমস/১২আগস্ট/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত