দায়বদ্ধতা থেকে ব্যাংকে বঙ্গবন্ধু কর্নার করেছি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৮, ১৬:৪১ | প্রকাশিত : ১৬ আগস্ট ২০১৮, ০৮:২৪

‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি বঙ্গে/এইখানে কিছুক্ষণ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বড় ছবিতে লেখা এ পঙ্‌ক্তিটি শব্দ করে পড়ছেন হাবিবুর রহমান।তিনি এসেছেন আগ্রণী ব্যাংকে একটা কাজে। তাকে বসতে দেয়া হয়েছে যে জায়গায়, সেখানটা দেখে তিনি অবাক! তার চারদিকে ঘিরে রাখা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই। রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য।

হাবিবুর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এত বই পেয়ে অপেক্ষার প্রহরটা মধুর হয়ে উঠছে।

আগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ষষ্ঠ তলায় ব্যাংকের বোর্ডরুম, চেয়ারম্যান ও এমডির ফ্লোরে এই ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ১১৭ কেজি ওজনের আবক্ষ ভাস্কর্য‌্য। রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা প্রায় ৪০০ বই। বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত টাকা। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় ছবি।

এই বঙ্গবন্ধু কর্নারের উদ্যোক্তা অগ্রণী ব্যাংকের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু কর্নার প্রতিষ্ঠার ভাবনা থেকে শুরু আদ্যোপান্ত। কথা বলেছেন ঢাকাটাইমসের নিজস্ব প্রতিবেদক জহির রায়হান। ছবি তুলেছেন শেখ সাইফ।

ঢাকাটাইমস: বঙ্গবন্ধু কর্নার করার চিন্তা কীভাবে এল আপনার মনে?

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: আমি অগ্রণী ব্যাংকের জিএম (মহাব্যবস্থাপক) থাকা অবস্থায় আমাকে সিলেট ডিভিশনে দেয়া হলো সার্কেলটা দেখার জন্য। সেখানে তিনটি জোন ছিল- সিলেট ইস্ট, সিলেট ওয়েস্ট ও মৌলভীবাজর জোন। মৌলভীবাজার যখন গেলাম তখন দেখলাম জোনাল অফিসের জায়গাটা অনেক বড়। আমি বললাম, এত জায়গা। এখানে একটা লাইব্রেরির মতো করি। বঙ্গবন্ধুর ওপর যত বই আছে এখানে থাকবে। আমি একটা বুকসেলফ দেব। আর কিছু বই। তোমরাও কিছু সংগ্রহ করো। এটা হবে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’।

আমি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বললাম, বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। আর এর জন্য তার সম্পর্কে লেখা বই পড়তে হবে। তখন আমি একটা সেলফ দিলাম। ইসলামি ফাউন্ডেশন ও বাংলা একাডেমি থেকে বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা কিছু বই কিনে ওখানে ডোনেট করলাম। সেটা ছিল ২০০৯-২০১০ সময়।

আবার ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১তম শাহাদাত বার্ষিকীতে স্মরণসভা ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সন্তানদের মাঝে বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’-এর উদ্বোধন করা হয়। ব্যাংকের প্রধান কার‌্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নার করা হয়। সে সময় আমি এ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলাম।

ঢাকাটাইমস: এ কাজ করতে গিয়ে কোনো বাধার মুখে পড়েছেন কি না?

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: আমি যখন বঙ্গবন্ধু কর্নার করলাম অনেকেই এর সমালোচনা করেছে। অনেকে বলেছে, সরকার পরিবর্তন হলে তখন কী হবে? আমি তাদের বলেছি আমি তো কোনো রাজনৈতিক কাজ করিনি। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা। তাকে আমরা একটা শ্রদ্ধা জানাব  না!

এরপর যখন আমি অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হলাম, তখন মনে হলো এটা নিয়ে আরও কাজ করার সময় এসেছে। অগ্রণী ব্যাংক পাকিস্তান আমলে হাবিব ব্যাংক ছিল। হাবিব ব্যাংক থাকলে হয়তো আমি জিএম পর‌্যন্ত হতে পারতাম। এমডি তো প্রশ্নই ওঠে না। সে ক্ষেত্রে আমি এই স্টেজে এসেছি যার জন্য, তার জন্য কিছু করতে হবে। আমার আবেগ থেকে শ্রদ্ধাবোধ থেকে এটা করা। বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানানোর জন্যই এটা করা। আমরা তো সালাম করে তার কাছে দোয়া নিতে পারব না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তো ছড়িয়ে দিতে পারব।

আমি আর্কিটেককে আগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আনলাম। তাকে বললাম, এখান একটি ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ করা হবে। এরপর ১১৭ কেজি ওজনের ব্রোঞ্জ নির্মিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য‌্য স্থাপন করা হয়। এটা আজীবন থাকবে এখানে।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার এটা দায়বদ্ধতা ছিল। আমার শ্রদ্ধাবোধ ছিল, সেটার সুযোগ আমি নিয়েছি। এখানে আমি কোনো ধরনের প্রাপ্তি চাই না।

ঢাকাটাইমস: আর কোনো ব্যাংকে এমন বঙ্গবন্ধু কর্নার করা হয়েছে কি?

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি করেছে পরে এমডি হলো রাকাবের (রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক)। তিনি রাকাবে একটা করেছেন। আইসিবিতে একটা করেছে, রূপালি ব্যাংকে শুনলাম বঙ্গবন্ধু কর্নার করছে। গত বছর ১২ এপ্রিল আমাদের ৫০০তম বোর্ড সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। তারা এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

অগ্রণী ব্যাংকের পক্ষ থেকে গত বছর ১২ জুন আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ত্রাণের চেক দিতে যাওয়ার সময় সাহস করে দুটি ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল আমি যে এটা করেছি সেটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাব। আমার মনে হলো এটা কি আমার ঠিক হচ্ছে? ভয়ে দুরু দুরু বুকে প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, ‘স্যার, আমি এ বঙ্গবন্ধু কর্নার করেছি। সেখান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা অনেক বই আছে।’ একটি ছবি দেখালাম। তিনি ছবি দেখলেন। সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন ‘গুড আইডিয়া’। দেখলাম তিনি তো (প্রধানমন্ত্রী) প্রশংসা করেছেন। তখন আরেকটা ছবি বের করলাম। বললাম, ‘স্যার, আমি আনসার বিডিপি ব্যাংকে থাকার সময় ওখানেও একটা এমন বঙ্গবন্ধু কর্নার করেছি।’ দুটো ছবিই উনি দেখলেন। ছবি দুটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাখলেন।

ঢাকাটাইমস: আরও ব্যাংকের শাখায় বঙ্গবন্ধু কর্নার করার চিন্তা আছে নিশ্চয়?

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: আমাকে একজন বলল বঙ্গবন্ধুর নামে কিছু করলে তো বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি না নিয়ে তো বঙ্গবন্ধুর নামে কিছু করা যায় না। আমি দেখলাম আসলেই তো, আমি তাদের জানাইনি। আমি সরকারি চাকরি করি, আমার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। কোনো সমস্যা হলো কি না। আমি কি সীমা লঙ্ঘন করলাম? এরপর বঙ্গবন্ধু কর্নার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের কাছে একটি চিঠি দিলাম দ্রুত। প্রধানমন্ত্রীকে এ সম্পর্কে জানানো হয়েছে সেটা বললাম। এটার জন্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি আগ্রণী ব্যাংকের বঙ্গবন্ধু কর্নারের। আমরা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময় তিনজনকে সিলেক্ট করেছি যারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করেছেন- ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, এইচ টি ইমাম এবং ড. মশিউর রহমান। আমরা বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের অনুমতির অপেক্ষা করছি। অনুমতি পেলে চিন্তা আছে সব শাখায় ছড়িয়ে দেয়ার।

ঢাকাটাইমস: সম্প্রতি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: পত্রিকায় দেখলাম যে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ করা হবে সব স্কুলে। আমার খুব খুশি লেগেছে এতে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আদর্শ শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে জানতে পারবে। আমি এত দিন যে চিন্তাটা করেছি, সেটার একটা স্বীকৃতি মিলল। এটা আমার একটা বড় পাওয়া। আমি সামান্যতম একটা প্রচেষ্টা নিয়েছি, সেটা এখন জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। মনে হলো এখন আমি বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে দ্রুত অনুমতি পেয়ে যাব।

অনেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক সংগঠন করে। আমি তাদের সঙ্গে দেখা হলে বলি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আগে বই পড়ো। বঙ্গবন্ধু যে কত বিশাল সেটা সম্পর্কে জানো। তাদের বলি বঙ্গবন্ধু কত বিশাল ওনাকে আবিষ্কার না করতে পারলে তুমি তো ফলোয়ার হতে পারবে না। আজ হয়তো কেউ এখানে এল কোনো কাজে, এসে বঙ্গবন্ধু কর্নারে রাখা বই নিয়ে জাতির জনক সম্পর্কে কিছু জানল, সেটাই আমার সার্থকতা।

ঢাকাটাইমস: অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কর্নারের সম্পর্কটা আপনার কেমন লাগে?

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: এটা হয়ে গেছে। এর কৃতিত্ব অগ্রণী ব্যাংকের। আমি অগ্রণী ব্যাংকের জিএম ছিলাম বলেই এটা করতে পেরেছি। স্বাধীনতার পর হাবিব ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংক দুটি ব্যাংক মিলিয়ে আগ্রণী ব্যাংক করা হলো। অগ্রণী ব্যাংক জাতির জনকের দেয়া নাম। অগ্রণী ব্যাংক নাম দিয়েছিলেন অগ্রে থাকবে মনে করে। নামের সার্থকতা আমরা প্রমাণের চেষ্টা করছি। রেমিট্যান্স ও ডিজিটালাইজেশনে আমরা অগ্রে আছি। আর এই উদ্ভাবনী (বঙ্গবন্ধু কর্নার) চিন্তায়ও মনে হয়ে আমরা অগ্রে আছি।

ঢাকাটাইমস: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম: আপনাকে ও ঢাকাটাইমসকেও ধন্যবাদ।

(ঢাকাটাইমস/১৬আগস্ট/জেআর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত