গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হচ্ছে না এই আগস্টেও

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৩৫ | প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৩২

১৪ বছর ধরে চলা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আশা অনুযায়ী হামলার মাস আগস্টে আসছে না বহুল প্রতীক্ষিত এই রায়। যদিও আগামী মাসেই রায় পাওয়ার আশা করছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান।

মামলার সর্বশেষ আসামি হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন চলছে। এরপর আইনি যুক্তি দেবে রাষ্ট্রপক্ষ। আর এরপর ঘোষণা হবে রায়ের তারিখ।

গত ১৪ আগস্ট বাবরের পক্ষে পঞ্চম দিনের মতো যুক্তি উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী নজরুল ইসলাম। আগামী ২৭, ২৮ ও ২৯ আগস্ট দিন আবার যুক্তি উপস্থাপনের জন্য সময় দেয়া আছে।

এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম এ মাসে রায়ের জন্য দিন ধার্য হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী তা হয়নি।…এর কারণ আসামির আইনজীবীদের অপকৌশল। তারা অযথা সময়ক্ষেপণ করছে। একই বিষয় বারবার টেনে আনছে।’

এখন আইনি আর কী প্রক্রিয়া বাকি আছে-জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, ‘এখন বাবরের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করছেন তার আইনজীবী নজরুল ইসলাম। আরও একজন সিনিয়র আইনজীবী আইনি যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। এরপর রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করবেন বিচারক।’

পুরান ঢাকায় অস্থায়ী ১নং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নুর-উদ্দিনের আদালতে এ মামলার বিচার কাজ চলছে। গত বছরের ২৩ অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয় এ মামলায়। গত ১ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর শুরু হয় আসামি পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন।

এই মামলায় সব মিলিয়ে ৫২ জন আসামি ছিলেন। এদের মধ্যে জামায়াত নেতা মুজাহিদ ছাড়াও হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং শরীফ সাইদুল আলম বিপুলের ফাঁসি হয়েছে অন্য মামলায়। পলাতক চারজনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ আইনজীবী নিয়োগ দেয়নি।

এই মামলায় এখন অবধি ১০৯ দিন যুক্তি উপস্থাপন হয়েছে। শেষ হয়েছে ৪৪ আসামির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন। আর বাবরের পক্ষে যুক্তি দিলে শেষ হবে ৪৫ জনের।

মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। আসামিপক্ষে ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে হত্যা ও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার আগে ঢাকায় ১০টি বৈঠক হয়৷ ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠকগুলো তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, মুজাহিদ, আবদুস সালাম পিন্টু, হারিস চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন৷’

‘টাকা এবং গ্রেনেড আসে পাকিস্তান থেকে৷ পকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন-এর আব্দুল মজিদ ভাট এই কাজে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল৷ বাংলাদেশে হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ-এর সদস্যরা।’

‘সেই সময়ে গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের কয়েকজন এই ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়৷ তারা মামলার আলামত নষ্ট, মামলা না নেয়া এবং হামলার গেয়েন্দা তথ্য থাকার পরও শেখ হাসনার নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি৷ এমনকি মামলাটির তদন্ত তারা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল৷

নজিরবিহীন হামলা

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্য জনসভায় নজিরবিহীন হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ নেতা-কর্মী আহত হন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সে সময়কার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ছোড়া গ্রেনেড থেকে নেতারা তাকে রক্ষা করেন মানববর্ম বানিয়ে। নেত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দেন তার একজন দেহরক্ষী।

ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)।

এরপর থেকে হামলায় নিহতদের স্বজন ও আহতরা আওয়ামী লীগের অগুণতি কর্মী সমর্থক রায়ের জন্য ১৪ বছর ধরে অপেক্ষা করে আসছে।

তদন্তের শুরুতে জোট সরকারের অপচেষ্টা

শুরু থেকেই এই হামলার জন্য সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ওই আমলে সরকার মামলাটি ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তখন সরকারের বিরুদ্ধে মামলার আলামত ইচ্ছা করেই নষ্ট করার অভিযোগ উঠে। সে সময়ের জোট সরকার যুক্তরাজ্যের তদন্ত সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানালেও তারা সরকারের অসহযোগিতায় বিরক্তি প্রকাশ করে চলে যায়।

পরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তদন্তের জট খুলতে শুরু করে। সে সময় জজ মিয়া নামে নিরীহ একজনকে আসামি সাজিয়ে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা ফাঁস হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে।

২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি। এতে শেষে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুর সালাম মিণ্টু ও তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনকে আসামি করা হয়।

ওই বছর ২৯ অক্টোবর ২২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।

অধিকতর তদন্তে আসামি তারেক

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ।

২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

২০১২ সালের ১৮ মার্চ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নতুন তালিকাভুক্ত ৩০ আসামির অভিযোগ গঠন করে ফের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

অর্থাৎ প্রকাশ্যে ঘটা এই ঘটনার বিচার শুরু হতেই লেগে যায় প্রায় চার বছর। আর আরও সাড়ে নয় বছর শুনানি চলার পর শুরু হয় যুক্তি উপস্থাপন।

তবে যুক্তি উপস্থাপন শুরু হওয়ার পর বেশ গতি পেয়েছে মামলাটি।

তারেকসহ সবার মৃত্যুদণ্ড দাবি

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রেজাউর রহমান বলেন, ‘আমরা আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।’

যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক সহযোগিতার তথ্য-প্রমাণ পেশ করে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় বনানীর হাওয়া ভবন, বিএনপি-জামায়াত সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সরকারি বাসভবনসহ ষড়যন্ত্রমূলক সভার স্থানসমূহ তথ্য-প্রমাণের আলোকে তুলে ধরা হয়।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ২২৫ জন সাক্ষী (পিডব্লিউ) ও আসামিপক্ষে ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য (ডিডব্লিউ) পর্যালোচনা করে আদালতে যুক্তিতর্ক পেশ করে।

তারেক রহমানসহ পলাতক ১৮ আসামির পক্ষে এই মামলায় যুক্তি উপস্থাপন করেছেন সরকার নিযুক্ত আইনজীবী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন আইনজীবী আবুল কালাম মো. আকতার। তিনি তারেকের খালাস দাবি করেছেন।

পলাতক যারা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল এটিএম আমিন আহমদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ, পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান পলাতক রয়েছেন।

এছাড়াও জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা তাজ উদ্দিন, মাওলানা মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন ওরফে মুরসালিন, মোহাম্মদ খলিল, জাহাঙ্গির আলম বদর, ইকবাল, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ লোকমান হাওলাদার, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের, মুফতি শফিকুর রহমান, রাতুল আহমেদ বাবু ওরফে রাতুল বাবুকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি।

এদের মধ্যে দুই আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মুত্তাকিন ভারতের তিহার কারাগারে আটক রয়েছেন।

কারাগারে যারা

গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এরর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, বিএনপি নেতা লুৎফজ্জমান বাবর ও  বিএনপি নেতা  আবদুলস সালাম পিন্টু বিচার শুরুর আগে থেকেই কারাগারে।

জঙ্গি সদস্য শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, শেখ আবদুস সালাম, আবদুল মাজেদ ভাট, ইউছুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা ওরফে জিএম, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর ওরফে আবু হুমাইয়া ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিব উল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সায়ীদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গির আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামীম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আবিদ হাসান সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামীম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জল ওরফে রতন ও হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়াও বন্দী আছেন।

যারা জামিনে

এই মামলায় জামিনে আছেন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক আইজিপি খোদাবক্স, সিআইডির সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ ও ঢাকা মহানগরীর ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ।

ঢাকাটাইমস/১৮আগস্ট/এমএবি/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

আদালত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত