সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসুক হিজড়ারা

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান
 | প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৩৮
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে প্রায় এক লাখ হিজড়ার বসবাস। সঙ্গে যোগ হয়েছে পুরুষ থেকে হিজড়াতে রূপান্তরিত হওয়া হিজড়ার সংখ্যাও। বেসরকারি হিসাবে হিজড়ার সংখ্যা আরো বেশি। সমাজের মূল স্রোতে না থাকায় হিজড়ারা দেশের সবচেয়ে অবহেলিত সম্প্রদায়ের একটি। জীবিকার ব্যবস্থা না থাকায় তারা নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাই বড় বড় শহর কিংবা জেলা শহরে হিজড়ারা আজ একটি উপদ্রবের নাম। তাদেরকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন ও সরকারি উদ্যোগ।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে হিজড়ারা আরাভানি, আরুভানি ও জাগুপ্পা নামেও পরিচিত। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে হিজড়ারা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন পাসপোর্ট কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রে হিজড়াদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা সেকশন। সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও হিজড়ারা এখনো সমাজের মূল স্রোতে আনা যায়নি। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজের মা-বাবার মধ্যেও রয়েছে ভুল ধারণা।

দেখা যায়, সন্তান হিজড়া হওয়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে, তাদেরকে মা-বা বন্দী করে রাখেন। আর সন্তান হিজড়া, এই বিষয়টি সামাজিক লোক-লজ্জার ভয়ে মা-বাবা স্বীকার করতে চান না। তারাও চান তাদের সন্তান বাড়ি থেকে বের হয়ে যাক।

হিজড়াদের নিয়ে একটি গবেষণার কাজ করতে গিয়ে শুনেছি জীবনের শুরুতে কীভাবে তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তাদেরই মা-বাবা। নিরুপায় হয়ে তারা আশ্রয় নেয় শহরের এক প্রান্তে কিংবা নিম্ন আয়ের এলাকার হিজড়া পল্লীতে, যার প্রধান একজন গুরু মা। তারা নিজেরা যা আয়-উপার্জন করে তার ভাগ পায় তাদের গুরু মা। একটি আদর্শিক জায়গা থেকেও হিজড়াদের এই জীবনপ্রণালি থাকলেও, বর্তমানে তা একটি জটিল ও অনৈতিক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীতে গড়ে উঠেছে হিজড়াদের আন্ডারওয়ার্ল্ড। তাদের মধ্যে চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ হচ্ছে। খুনের ঘটনাও ঘটছে। রাজধানীতে এমন দুইজন হিজড়ার নাম বলা যায় যাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। চাঁদার বিলি-বণ্টন নিয়ে গত কয়েক বছরে একাধিক হিজড়া খুন হয়েছে। রাজধানী ঢাকাকে চাঁদাবাজির জন্য একাধিক ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। যেখান থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকা চাঁদা উঠে।

কিন্তু হিজড়াদের নিয়ে সমাজের নাক উঁচু মনোভাব, মূলস্রোতে আনতে না পারার কারণেই হিজড়া নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করছে তাদের কর্মসংস্থানের অভাব।

এই বিষয়টি চিন্তায় রেখে সমাজের নানা সংগঠন এগিয়ে আসছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তরণ ফাউন্ডেশন। পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমানের এই প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে হিজড়াদের জন্য সেলাই, ব্লক, বাটিক, রান্না ও বিউটি পার্লারের কাজ শেখানো হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রাজধানীর নানা স্কুলের পোশাক তৈরি করছে হিজড়ারা। যাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। তাদের একটি অংশ ফিরে আসছে নানা ধরণের অনৈতিক পেশা থেকে। তবে সারা দেশের এক লাখ হিজড়াকে পথে ফেরানোর জন্য দরকার আরো অনেক হাবিবুর রহমান। ব্যক্তি উদ্যোগের সাথে সরকারি পদক্ষেপের সমন্বয় করলে হিজড়াদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে। 

লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত