কোটাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের জামানতহীন সংসদ নির্বাচন

হুমায়ুন কবির ভূইয়া
| আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ২১:৩২ | প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৯:৪০

লেখাটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীর উদ্দেশে। আপনারা আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিবাদন গ্রহণ করুন। এ শোকের মাসে আমি স্মরণ করছি স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যাকে সপরিবারে হত্যা করেছিল খুনিরা। রক্তক্ষরণের এই দিনে আমি আপনাদের কাছে তুলে ধরতে চাই মুজিব-সৈনিক মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু হৃদয়-ব্যথার কথা।

স্বাধীনতা সংগ্রামে গাজীপুরের ঐতিহাসিক অবদান আছে। এ অবদানে বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আপনার নামও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। আপনি আপনার কর্মফলের যথাযোগ্য মর্যাদা পেয়েছেন। তাতে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমিও আনন্দিত। কিন্তু  দুঃখজনক হলেও সত্য আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের মন্ত্রী হয়েও তাদের ঐক্যবদ্ধ করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি আজও। দীর্ঘ সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সম্মেলন করেননি। এটা আমাকে ব্যথিত করে।

তবে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী এ ব্যাপারে নিস্পৃহ হলেও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দায়িত্বের কথা ভোলেননি। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান বেড়েছে অনেকাংশে।

পাকিস্তানি হানাদার লুটেরাদের হাত থেকে দেশমাতৃকার মুক্তি ও স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। পৃথিবীর সব দেশেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মান দেয়া হয় এবং সে হিসেবে সম্মানিত করা হয় তাদের। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া বা দেয়ার মতো কোনো সংগতি ছিল না যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির। তবে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের যোগ্যতামতো চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। অনেকে চাকরি নিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পরাজিত শক্তি যখন ক্ষমতা দখল করে, মুক্তিযোদ্ধাদের তখন মাথা নত করে চলতে হতো। দীর্ঘদিন পর বঙ্গবন্ধু-কন্যার ক্ষমতারোহণের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা চালু করেন, যা বেড়ে বেড়ে বর্তমানে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে এটুকুর মধ্য দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মানের উচ্চতা ধারণ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।

আন্তর্জাতিক মান না ধরেও যদি দেশের বর্তমান বাজারের হিসাব গণনায় আনি, তার তুলনায় বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক মূল্যায়ন অত্যন্ত নগণ্য। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যদি ১৯৭২ সালে  ৫০ (পঞ্চাশ) টাকা ভাতাও প্রচলন হতো, তা আজকে বেড়ে ৫০-৬০ হাজারে উন্নীত হতো নিশ্চয়।

সাম্প্রতিক কালে শোনা গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এককালীন ১০ লাখ টাকা সুদবিহীন ঋণ দেয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে ৭ শতাংশ সুদে। এ ছাড়া বিগত সময়ে মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রীর বরাতে দুটি খবর বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়। বর্তমান বাজেট থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া হবে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও নববর্ষের ভাতা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানা গেল আগামী বাজেট থেকে দেয়া হবে এই ভাতা।

১০ লাখ টাকা ঋণ কিংবা দিবসীয় ভাতা কোনোটাই মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনে এখনো বাস্তবায়িত হলো না। কিন্তু যেখানেই যাই, মানুষের কাছে শুনতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের বেশি বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাজেটে টাকা নেই, সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৩০ লাখ টাকা সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা হচ্ছে।

বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ্যই বলুন আর বাজেটই বলুন- সবই আমলানির্ভর। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি বা ওই সময়ে ছাত্র ছিলেন তারা এখন মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ্য নির্ধারণ করছেন। দু-তিন বছর আগেও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে চরম নাজেহাল হতেন মুক্তিযোদ্ধারা। একজন সচিব (নাম উল্লেখ করছি না) মুক্তিযোদ্ধাদের দরখাস্তে শুধু ‘কুয়েরি’ অর্থাৎ ‘তদন্ত করুন’ লিখে দিতেন। ‘মুক্তি বার্তা’য় তার বিশ্বাস ছিল না।

স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষকের সন্তান অংশ নিয়েছিল। গ্রামবাংলার হাজার হাজার সাহসী যুবক শহীদ হন। তাদের নাম অভিজাত পরিবারের সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমির মতো আলোচিত হয় না সংবাদমাধ্যমে। মাতৃভূমির জন্য প্রাণ দেয়া হাজার তরুণ-যুবক ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের হারিয়ে অকূল পাথারে পড়ে পরিবার। কী করুণ একেকটা দিন গেছে ওই সব পরিবারের ওপর দিয়ে।

গ্রামের এই মুক্তিযোদ্ধারা সম্মান কিংবা আর্থিক সুবিধা, সেসব না পেলেও আর একটি অংশ সব ধরনের সুবিধাই পেয়েছেন, নিয়েছেন, নিচ্ছেন।  সুবিধাভোগী এই মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, পদ-পদবিতে অলঙ্কৃত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা ও সম্পদ লুটপাটের অভিযোগও মাঝে মাঝে গুঞ্জন তুলেছে মিডিয়ায়।  বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন কেউ কেউ। তারা কৃষক-শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কথা ভাবেননি, ভাবছেন না।

মাস কয়েক আগে মুনতাসীর উদ্দীন খান মামুন (ইতিহাসবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) দেশের বহুল প্রচারিত একটি পত্রিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে একটি ‘নেতিবাচক’ বিবৃতি দিয়েছিলেন। ওই বিবৃতি পড়ে আমার মনে হয়েছিল তিনি হয়তো কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি। পরবর্তী সময়ে আর একটি পত্রিকায় ফারমার ব্যাংক কেলেঙ্কারি ঘটনা প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায় ওই ইতিহাসবিদ শিক্ষক ব্যাংকটির উদ্যোক্তাদের একজন। তাদের সঙ্গে আছেন মাহবুবুল আলম চিশতী নামের একজন (বর্তমানে জেলে), যার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধের মামলা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের দুঃখ কোথায় রাখবে!

মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করা ও কথা বলার জন্য গঠিত হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এটি অকার্যকর করে এর দায়দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমলাদের ওপর। প্রতি বছর অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রণয়নের আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার কথা শুনিনি (হয়তো হয়, আমি জানি না)।

সরকার সব সময় বলে আসছে দেশ পরিচালিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। শুনে ভালো লাগে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলে গেছেন সেটি কি আমরা পাচ্ছি? পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, ৯০ শতাংশ মানুষের স¤পদ মাত্র ১০ ভাগ মানুষের হাতে। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সামরিক প্রশাসকরা সংবিধানের মৌলিক ধারাগুলোতে পরিবর্তন এনে বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বদলে বাজার অর্থনীতি চালুর পর থেকেই এই ধারার শুরু হয়।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মনে করি, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তিকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীর উদ্দেশে আমি কয়েকটি প্রস্তাব রাখতে চাই:

১. বর্তমান বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোনো সম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। জাতীয় সংসদে আইন পাস করে মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধাগুলো আইনে পরিণত করুন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব আছে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব নেই, সেটি বিবেচনা করে দেখতে হবে।

২. নির্বাচনের আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় সম্মেলন করে তাদের জন্য গৃহীত ব্যবস্থা জানানো হোক।

৩. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে দেশের কিছুটা হলেও দায় শোধ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি। ব্যাংক লুট, সরকারি স¤পত্তি আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারকারী ইত্যাদির সঙ্গে জড়িতরাও দেশের শত্রু, তাদেরও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করার ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

৪. আগামী নির্বাচনের আগেই জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সৃষ্টি এবং নির্বাচনে মুক্তিযোদ্ধাদের জামানতবিহীন অংশ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি  করতে হবে।

৫. মুক্তি বার্তার অন্তর্ভুক্ত জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেয়া হোক।

৬. অবিলম্বে নির্বাচন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠন করুন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কথা বলা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্পণ করুন।

এ বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে মুক্তিযোদ্ধারা ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির প্রার্থীর হয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক, শিক্ষাবিদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত