ভারতে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা কোথাকার?

দিদার মালেকী
| আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ২০:৩৫ | প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ২০:২০

এককালে অখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশে নানা অঞ্চলের মানুষ কোনও না কোনও কারণে স্থানচ্যূত হতেন। দেশভাগের আগে এমনকি পরেও নেপাল ও ভুটান থেকে লাখ লাখ মানুষ পরিবার নিয়ে ভারতে এসে থাকেন। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে শ্রীলঙ্কার তামিল সম্প্রদায়ের অগণিত লোক এসেছেন। লেখা বাহুল্য, এখনও আসেন।

কিন্তু এযাবতকালে তাদের বেলায় অনুপ্রবেশ নিয়ে কোনও কথাই উঠেনি। কথা হয় শুধু ভারতে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে। আর এসব কথা বলেন ভারতীয় রাজনীতিবিদরা। মাঝেমধ্যে তাদের কেউ কেউ এমনও হুমকি দেন— যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষ বসবাসের নিমিত্তে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে—একথা ধোপে টিকে না। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সূচক ভারতের চেয়ে কম কিছু নয়। সীমান্ত সন্নিহিত কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া বাংলাদেশিরা বসবাস করতে ভারতে যাবেন— এটা বাস্তবতাবর্জিত। অথচ দেশটির রাজনীতিবিদরা কারণে-অকারণে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের বক্তব্য দিয়ে বিতর্ক উস্কে দেন।

বস্তুত বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র ভারতের কর্তাব্যক্তিদের অনেকের এমনতর কান্ডজ্ঞানহীন বক্তব্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাই। ভারতের অপরাপর রাজ্যগুলিতে তারা যে নানাভাবে পীড়নের শিকার হন— সেটা তো প্রমাণিত সত্যই। এর পেছনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদদেরও দায় কম কিছু নয়।

ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ, এই তিন দেশের ভূ-ভাগ বহু যুগ ধরে একটাই দেশ হিসেবে ছিল। ফলে যুগ যুগ ধরে মানুষ দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে জীবন ও জীবিকার জন্য যাতায়াত করেছেন অনায়াসে। যেমন এখন পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির মানুষ কাজের জন্য চেন্নাই গিয়ে বা হরিয়ানার মানুষ হালিশহরে গিয়ে থাকেন। কিংবা বিহারের মানুষ দলবেঁধে কলকাতায় আসেন জীবিকার সন্ধানে।

এর ফলে যাতায়াতের অভ্যাস গড়ে ওঠে একাধিক সম্প্রদায় ও জাতির মধ্যে। ঠিক যেমন পাশাপাশি দুই প্রতিবেশী বাড়ির মধ্যে হরদম যাতায়াত, খাবার-দাবার, জামা-কাপড় দেওয়া-নেওয়া চলে। হুট করে যদি কেউ এসে দুটো বাড়ির মধ্যে সীমানা টেনে দেয়, তাহলে বাড়ি দুটোর মানুষগুলো পড়ে যায় মহাবিপদে।

কেননা এতদিনের অভ্যাস, এতদিনের যাতায়াত, মেলামেশা সেসব তো সীমানা দিয়ে আটকে ফেলা যায় না। শুরুর থেকে যদি ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ আলাদা দেশ হত, যদি শুরুর থেকেই এখানকার মানুষদের মধ্যে যাতায়াত ও মেলামেশার আদান-প্রদান গড়ে না উঠত, তাহলে এই সমস্যা হতো না।

ফলে যাতায়াত, মেলামেশা (যাকে অনুপ্রবেশ বলা হচ্ছে) সেটা এই জায়গার মানুষের দীর্ঘ যুগের স্বাভাবিক অভ্যাস। এ চিত্রটা শুধু এখানকার নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা যায়। কৃত্রিম হলো— এই সীমারেখা টেনে দেওয়া। কৃত্রিম হলো— রাজনীতির সুবিধার জন্য মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার রাস্তায় পাঁচিল তুলে দেওয়া।

ভারতে যাদের আজ অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে, আর যারা সেটা বলছেন, অর্থাৎ ভারতের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী— তারা কি আদৌ সেখানকার? ভারতের ইতিহাস তো বলছে আর্যরাও বহিরাগত। আদি নিবাসী একমাত্র সাঁওতাল, কোল, ভীল, মুণ্ডা, ওরাওঁ—  এরকম হাজারো পশ্চাদপদ হয়ে পড়া আদিবাসীরা।

ভারতের সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সেখানকার যেসব নাগরিকও কথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে সোচ্চার, তাদের ভাবতে হবে— একজন কাশ্মীরি পন্ডিত ব্রাহ্মণ, একজন তামিল ব্রাহ্মণ আর একজন বাঙালি ব্রাহ্মণের মধ্যে ভাষা, রুচি, খাবার, সংস্কৃতি কিছুরই মিল নেই।

মানে একই দেশের অধিবাসী হয়েও তাদের ভাষা-সংস্কৃতির অমিল যোজন যোজন। এক জাতির সঙ্গে অন্যের পোষাক মিলে না। রুচি মিলে না। খাদ্যাভ্যাস মিলে না।

বরং যাদের সঙ্গে ভাষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতি সবেতেই মিল, যাদের সঙ্গে হাজার বছর একসঙ্গে থাকা হয়েছে, তাদের মধ্যে সব ধরণের আদান-প্রদানও বেশিই হবে। যেমন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের। তাদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে আত্মীয়তার ধারাও বহমান থাকবে। বসবাসের জন্য না হলেও তাদের মধ্যে আনাগোনাও থাকবে।

এভাবেই তো এগিয়েছে মানবেতিহাস। কেবল অপরাজনীতি দিয়ে তা কি করে থামিয়ে দেওয়া যেতে পারে?

লেখক: কবি, সাংবাদিক, গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত