প্রকল্পের কাজ না পেলেই পত্রিকায় লেখালেখি: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০১ | প্রকাশিত : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৩:২৮

পত্রিকায় অযাচিত লেখালেখিতে সরকারি নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, কাজ না পেয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পত্রিকায় লেখেন। আর কিছু কিছু পত্রিকা উন্মুখ হয়ে বসে থাকে সেগুলো ছাপানোর জন্য। এতে জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রকল্প অকারণে পিছিয়ে যায়।

রাজধানীর পূর্বাংশে আধুনিক পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেয়া দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাতিরঝিল, গুলশান, বনানী, বারিধারা, সেনানিবাস এবং সংসদ ভবন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যার যেমন সমাধান হবে তেমনি বাসিন্দারা একটি উন্নত পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থার সুবিধা পাবে।

প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রকল্প নিতে গেলে সময়ক্ষেপণের বিষয়টি তুলে ধরে এই প্রকল্পকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। বলেন, ‘এখানে কাজ করতে গেলে নানা ঝামেলা। এমনকি পাইপে আধা ইঞ্চির সমস্যা নিয়ে আমাদের অনেক দিন সময় নষ্ট হয়ে গেল।’

এসব বিতর্ক কেন তোলা হয়, তা বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারণটা আমি জানি। কারণটা আর কিছুই না, কাজটা কে পেল না পেল। কেউ যদি না পেল, ওমনি দিল একখানা পত্রিকায় লিখে। আর কিছু পত্রিকা তো উন্মুখ হয়ে বসে থাকে, ওটা লিখবেই। তারপর সেটা নিয়ে আবার নানা জল্পনা কল্পনা, তারপর আবার মাপামাপি, তার ওপর আবার রিপোর্ট দেন। অনেক ঝক্কি ঝামেলা, খামাখা সময়টা নষ্ট।’

‘অথচ হাতিরঝিল করেছি, হাতিরঝিলের পানি প্রায়ই পচে যায়। এই ট্রিটম্যান্ট প্লান্টটা যদি আমরা না করি, তাহলে হাতিরঝিলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না, এটা হলো বাস্তবতা। কিন্তু সেটা না করে কোখায় পাইপের আধ ইঞ্চির ব্যাস কম…’।

‘তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমরা সায়েদাবাদ-১ করেছি, তারপর করেছি সায়েদাবাদ-২। এখন সায়েদাবাদ-৩ করার জন্য প্ল্যান নিয়ে আগাচ্ছি, তারপর অন্যান্য যে ওয়াটার ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট এবং স্যুয়ারেজ প্লান্ট আমরা করেছি, সেখানে কত ব্যাসার্ধের পাইপ ব্যবহার করেছিলাম, সেটার রিপোর্ট আনো।’

‘সেটা দেখে অনেক কিছু করে অবশেষে আজকে সেটা কার্যকর হচ্ছে।’

২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে আধুনিক পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটি মহাপরিকল্পনা করে কাজ চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আজকের দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ পরিকল্পনা তারই একটা অংশ।’

দাসেরকান্দি প্রকল্পটি ছাড়াও ঢাকায় রুট নিয়ে বিতর্কে বহুল আলোচিত মেট্রোরেল প্রকল্প পিছিয়েছে কয়েক বছর। সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে রুটের পরিকল্পনা ঠেকাতে নাগরিক সমাজের একটি অংশ নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। আর কিছু গণমাধ্যম সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে।

এসব বিতর্কে বছর তিনেক পেছানোর পর ২০১৬ সালের ২৬ জুন উদ্বোধন হয় মেট্রোরেলের কাজ। ২০২১ সালের মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাত্রী বহন শুরু হবে। অথচ এ নিয়ে বিতর্ক না হলে এরই মধ্যে কাজ প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারত।

স্বপ্নের পদ্মাসেতু প্রকল্পও পিছিয়েছে দুর্নীতি চেষ্টার ভুয়া অভিযোগের কারণে। যে সেতু দিয়ে এখন যান চলাচলের কথা, সেটি চালু হতে হতে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময় লেগে যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এই বাধাগুলো মাথায় রাখার পরামর্শ দেন। বলেন, ‘এই ধরনের সামান্য ব্যাপার নিয়ে যারা ঝামেলাটা তৈরি করে, এদের ব্যাপারে একটু সচেতন থাকার জন্য আমি আহ্বা্ন জানাব।’

দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর বিশেষ করে যারা পস এলাকায় থাকেন, বারিধারা, গুলশান, বনানী বসুন্ধরা, সংসদ ভবন থেকে শুরু করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে শুরু করে সমস্ত এলাকার জলাবদ্ধতা বা দূষণ যেমন বন্ধ হয়ে যাবে, এসব এলাকার পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থাপনা আরও সুন্দরভাবে হবে।’

‘পুরো ঢাকা শহরের সমস্ত এলাকার মানুষ যেন এই সুবিধাটা পায়, সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।’

সরকার ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন নতুন খাল খনন করছে জানিয়ে সেখানেও নানা বাধার কথা তুলে ধরেন তিনি।

মফস্বলেও পানি ও পয়ঃসেবা নিশ্চিত হবে

রাজধানীর পাশাপাশি জেলা, উপজেলা শহর এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও পানি ও পয়ঃসেবা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হওয়ারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আমাদের সুপেয় পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এই তিন পদক্ষেপ নিতে হবে এই কারণ যে, আমরা প্রত্যেকটা গ্রামকে শহরে উন্নীত করতে চাই, গ্রামের মানুষ যেন শহরের মতো একটা উপযোগী ব্যবস্থা পায়।’

‘এখন থেকে যদি আমরা ব্যবস্থা নেই, তাহলে ভবিষ্যতে কাজ করতে সমস্যা হবে না। কারণ, এখন কাজ করতে গেলে এখানে জায়গা নাই, ওখানে জায়গা নাই, নানা সমস্যা। কিন্তু আমরা যদি এখন থেকে পরিকল্পনা নেই, সেই সমস্যাটা আর ভোগ করতে হবে না।’

পুকুর ভরাট করা চলবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী, সব ধরনের জলাধার সংস্কার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের তাগিদ দেন। ঢাকার পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়ায় আক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন। বলেন, ‘আমাদের বহু পুকুরগুলোতে বিশাল বিশাল দালান উঠে গেছে। ঢাকায় এখন হাতে গোনা কয়েকটা পুকুর। এই পুকুরগুলো সব সংরক্ষণ যেমন করতে হবে।’

সব বক্স কালভার্ট ভেঙে ফেলব

রাজধানীর যেসব খালে বক্স কালভার্ট তৈরি করে ওপর দিয়ে রাস্তা করা হয়েছে, আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী।

‘কতগুলো খাল ছিল, ধোলাই খাল, শান্তিনগর খাল, সেগুনবাগিচা খালসহ অগুণতি খালে ভরা এই শহরটা। ঢাকা শহরের চার দিকে পাঁচটা নদী। … শহরের ভেতরে খালগুলো ছিল শিরা উপশিরার মতো। সেগুনবাগিচা খালে বক্স কালভার্ট করা হলো, আজকে পান্থপথ, এটা কিন্তু খাল। সেখানেও বক্স কালভার্ট। শান্তিনগর খাল, সেখানেও বক্স কালভার্ট। সেজন্য জলাবদ্ধতা আর নানা সমস্যা।’

‘যদি আগামীতে আসতে পারি, আমার একটা লক্ষ্য থাকবে প্রত্যেকটা বক্স কালভার্ড ভেঙে ফেলে দেব আমি। আশা করি যথেষ্ট টাকা পয়সা হবে আমাদের। আর ওই খালগুলো উন্মুক্ত করে দেব আর খালের ওপর দিয়ে এলিভেটেড রাস্তা করে দেব।’

বুড়িগঙ্গা পুরোপুরি দূষণমুক্ত হবে

রাজধানীর প্রধান নদী বুড়িগঙ্গার তলদেশে থাকা বর্জ্য অপসারণ, বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করে নদীটিতে পুরোপুরি দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘বুড়িগঙ্গা তো প্রায় পচে দুর্গন্ধ। প্রচুর ময়লা দেখান থেকে বের করতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও এখনও সেভাবে হয়নি। ওখানেও কতগুলো স্যুয়ারেজ সিস্টেম তৈরি করতে হবে।’

‘ওখানে নানা ধরনের বর্জ্য আছে। কিছু আছে বসতবাড়ির বর্জ্য, কিছু আছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্য। কাজেই সেখানে দুই ধরনের ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট তৈরি করা দরকার। ইতিমধ্যে আমরা সেখানে একটি কমিটি করে দিয়েছি এলজিআরডি মন্ত্রীকে দিয়ে এবং একটা ধারণাও দিয়েছি।’

‘তাছাড়া যমুনা নদী থেকে পংলী নদী ড্রেজিং করে তুরাগ নদী হয়ে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত যদি ড্রেজিং করে দিতে পারি, এভাবে পানির ধারাটা যদি অব্যাহত রাখতে পারি, তাহলে এই বুড়িগঙ্গা নদীতে আর দূষণ থাকবে না।’

পাশাপাশি বালু, তুরাগ, ধলেশ্বরীও ড্রেজিং করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নদী ড্রেজিং করলে প্রচুর জমি আমরা উত্তোলন করতে পারি। কোথাও আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করব, কোথাও আমরা চাষের উপযোগী জমি ব্যবহার করব, কোথাও আমরা শহর গড়ে তুলব।’

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব জাফর আহমেদ খান প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে প্রকল্প এলাকার একটি রেপ্লিকা দেখানো হয়।

ঢাকাটাইমস/১৯আগস্ট/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত